কেটে যাচ্ছে করোনার ভয়

দেশে করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় কাটছে। সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হওয়ায় এক ধরনের স্বস্তিভাব লক্ষ করা যাচ্ছে সবার মধ্যে। গত বছর মার্চে করোনার মহামারী দেখা দেওয়ার ১০ মাস পর এ বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে আসে। করোনার ভয় কাটিয়ে তখন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষকে। গত এক মাস ধরে সংক্রমণের নিম্নমুখী অবস্থায় আবারও মানুষ আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে শুরু করেছে।

গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে করোনা সংক্রমণ ক্রমেই কমছে। শনাক্ত হার, মৃত্যু ও রোগীর সংখ্যাসহ সংক্রমণের সব সূচকেই বেশ উন্নতি হয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভাইরাসের রি-প্রডাকশন রেট বা আরনট অনেক কমেছে।

এমন পরিস্থিতিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ‘স্বস্তিকর’ বলছে। তবে স্বস্তির পাশাপাশি সতর্ক থাকার ওপর বেশ জোর দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আইইডিসিআরের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় কাটা ভালো। তবে অসতর্ক হলে আবার বিপদে পড়তে হবে।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ হার ৫ শতাংশের নিচে। সুতরাং আগামী আরও দুই সপ্তাহ আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ পৃথিবীর অনেক দেশে দেখা গেছে, সংক্রমণ হার দুই-তিন সপ্তাহ ২-৫ শতাংশ ছিল। তারপর আবার বেড়ে গেছে।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে ভয় কাটা ভালো, তবে অসতর্ক হওয়া ভালো নয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতি সবকিছুর জন্যই ভালো, দরকারও। কিন্তু অসতর্ক হলে বিপদ বাড়বে। এখনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। জ্বর-সর্দি-কাশি হলে অবজ্ঞা না করে করোনা পরীক্ষা করতে হবে।’

একইভাবে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি “স্বস্তিকর” হলেও সতর্ক থাকতেই হবে। কারণ বিশ্বব্যাপী রোগটির মহামারী এখনো চলছে। পৃথিবীতে এখনো প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, পাঁচ লাখ করে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। পৃথিবীর বহু দেশ এখনো টিকার আশপাশেও যেতে পারেনি, মাত্র ১-২ শতাংশ মানুষকে টিকা দিয়েছে। সুতরাং সংক্রমণ যদি বেশি থাকে, তাহলে ভাইরাসের মিউটেশনের সম্ভাবনাও বেশি থাকে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ভাইরাসটির মিউটেশন বা পরিবর্তন হলে, সারা পৃথিবীতেই পরিবর্তন হয়ে যাবে।’

১৬ দিন ধরে শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে : দেশে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রথম শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে নামে। সেদিন শনাক্ত হার ছিল ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং রোগী শনাক্ত হয় ১ হাজার ৫৬২ ও মারা যান ২৬ জন। এরপর গত ১৬ দিন ধরে শনাক্ত হার কমতে কমতে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ দশমিক ৮৮ শতাংশে পৌঁছায় এবং এ সময় রোগী শনাক্ত হন ৭০৩ ও মারা যান ২১ জন। এই ১৬ দিনের মধ্যে ৫ অক্টোবর সর্বনিম্ন শনাক্ত হার ছিল ২ দশমিক ৭২ শতাংশ।

এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর শনাক্ত হার ১০ শতাংশের নিচে নামে। সেদিন শনাক্ত হার ছিল ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ, রোগী শনাক্ত হন ১ হাজার ৭৪৩ ও মারা যান ৬১ জন। পরের ১৬ দিন ধরে শনাক্ত হার ১০ শতাংশে নিচে ও ৫ শতাংশের ওপরে ছিল।

গত ১৬ দিনে তার আগের ১৬ দিনের তুলনায় দেশে দৈনিক শনাক্ত হার কমেছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ সময় মৃত্যু কমেছে অর্ধেক। শেষ ১৬ দিনে যেখানে দৈনিক রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯৯৫, দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ২৪ জন; সেখানে তার আগের ১৬ দিনে দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ৪৮ ও গড় রোগী ছিল ১ হাজার ৯৯৭ জন।

জানুয়ারিতেও সংক্রমণ কমেছিল, পরে বেড়েছে : দেশে এ বছরে ১৯ জানুয়ারি পরীক্ষা অনুপাতে মোট শনাক্তের হার ছিল ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর পরদিন থেকেই শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ ১৯ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ২৪ দিন বা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশে করোনা সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে ছিল। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসেও শনাক্ত হার ২-৩ শতাংশের ঘরেই ছিল। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনাক্ত হার ছিল ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এমনকি মার্চের প্রথম সপ্তাহেও শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে ছিল। অর্থাৎ ১৯ জানুয়ারি থেকে ৮ মার্চ সাত সপ্তাহ শনাক্ত হার ৫ শতাংশের নিচে ছিল। সে সময় মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। মানুষ অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে। কিন্তু মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে। ৯ মার্চ প্রথম শনাক্ত হার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে তা আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে জুন-জুলাই মাসে শনাক্ত হার সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশে ওঠে ও সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়। বাধ্য হয়ে সরকার আবার বিধিনিষেধ জারি করে। মানুষ আবার ঘরে ঢুকতে বাধ্য হয় ও সীমিত জীবনযাপনে ফিরে যায়।

আরনট অনেক কমেছে : ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ‘দেশে আরনট অনেক কমেছে। বর্তমানে আরনট রেট দশমিক ৪ শতাংশের মতো। অর্থাৎ এখন পাঁচজন সংক্রমিত হলে তারা দুজনের মধ্যে রোগটি ছড়াতে পারছে। আগে এই রেট ছিল অনেক বেশি।’

সংক্রমণের হার এখন সর্বনিম্ন : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সংক্রমণের এখন যে পরিস্থিতি, তা থেকে বাড়বে তো অবশ্যই। তবে টিকা যদি ঠিকমতো দিতে পারি, তাহলে মৃত্যু কমবে। বাড়ার আশঙ্কা আছে। কারণ এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে টিকার প্রচন্ড বৈষম্য আছে। তাছাড়া করোনার যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট, সেটা টিকাও মানে না। ডেল্টাসহ করোনার যে তিন ধরন সেগুলো টিকা দিলেও মৃদু লক্ষণযুক্ত উপসর্গ নিয়ে সংক্রমিত করতে পারে। যদি টিকা নিয়ে থাকি, তাহলে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যু ওই পরিমাণ বাড়বে না। যেমন জুলাই ও আগস্ট থেকে ব্রিটেনে সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু মৃত্যুটা আগের মতো বাড়েনি।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশে দুই ডোজ টিকা ১০ শতাংশ মানুষকে দিতে পেরেছি, প্রথম ডোজ এর চেয়েও বেশি। কাজেই সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা আছে। আর যদি ভ্যারিয়েন্ট উদ্ভব হয়, তাহলে দ্রুতই বাড়বে। আর যদি নতুন ভ্যারিয়েন্ট না হয়, তাহলে সংক্রমণ আবার বাড়তে বেশ কিছু সময় লাগবে। খুব নিকটেই বাড়বে না, তবে বাড়বে। কারণ আমাদের সমাজে মেলামেশা অনেক বাড়ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান করছি। শীতের সময় আরও বেশি অনুষ্ঠান হবে। স্কুল-কলেজ খুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে। কমিউনিটিতে যে হারে বাড়ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সে হারে বাড়ছে, হয়তো চোখে পড়ছে না। তবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে সংক্রমণের হার এখনো নিম্নগামীই আছে। কিন্তু সামাজিক মেলামেশা বাড়লে, সংক্রমণ বাড়বে।’

এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘সংক্রমণের হার এখন সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের ঘরেই আছে। তবে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ বলা যাবে না। নিয়ন্ত্রণ বলতে হলে গোটা বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সারা বিশ্বে সংক্রমণ যখন নিয়ন্ত্রণ হবে, তখন আমরা নিশ্চিন্ত হব। দেশের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না তার প্রমাণ ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া। সেসব দেশে অনেক কমেও আবার অনেক বেড়ে গেছে।’

সে ক্ষেত্রে কবে নাগাদ করোনা নিয়ন্ত্রণ আশা করা যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক লম্বা সময় লাগবে। সারা বিশ্বের মানুষ সর্বোচ্চ মাত্রায় টিকা পেলে, তখন করোনার সংক্রমণ হয়তো এপিডেমিক (মহামারী) থেকে এন্ডিমেক (স্থানীয় রোগ, যেমন ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা) পর্যায়ে চলে যাবে। বিশ্বেও শনাক্ত হার নিম্নগামী। মৃত্যুও কমছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে যদি টিকা সবাই ভালোভাবে পায়, তাহলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ সংক্রমণের প্রকোপ কিছুটা বাড়লেও সংক্রমণ ধর্তব্যের মধ্যে পড়বে না। এখন তো ইনফ্লুয়েঞ্জায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়, কিন্তু মৃত্যু অত না। করোনার ক্ষেত্রেও সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হবে।’

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সংক্রমণ এখন নিচে আছে। এটা ধরে রাখতে পারলে ভালো। ইনকিউবেশন দুটি পার হচ্ছে (৭ দিন হিসেবে ১৪ দিন)। সে ক্ষেত্রে শনাক্তের নিম্নহার এখন স্থিতিশীল পর্যায়ে বলা যেতে পারে। এখন আমাদের সার্ভিলেন্সটা খুবই শক্তিশালী করতে হবে ও তীক্ষন নজর রাখতে হবে। করোনার লক্ষণ দেখা গেলেই তাদের টেস্ট করা, তাদের আলাদা রাখতে সাহায্য করা, তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং করে তাদের আবার টেস্ট করা। আইইডিসিআর প্রথম ২০০ রোগীর ক্ষেত্রে যেমনটা করেছিল, সেভাবেই রোগী দেখলেই ছুটে যাওয়া, তাদের চিকিৎসার খবর নেওয়া, এসব করা উচিত এবং সেটা সম্ভব। তাহলে যেখানে সংক্রমণ বেড়ে যাবে, সেটা দ্রুতই চোখে পড়বে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’

করোনা পরিস্থিতি স্বস্তিকর, তবে সতর্ক থাকতে হবে : ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ‘দেশে আমরা সাড়ে তিন কোটি মানুষকে টিকা দিয়েছি। এটা সংক্রমণ কমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কিন্তু টিকা নিলেই হবে না। টিকার সঙ্গে এখনো স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এটাই বাস্তবতা। সুতরাং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে থাকলেই হবে না। নিজের সুরক্ষা নিজেকেই ব্যবস্থা করতে হবে। নিজের সুরক্ষার জন্য নিজেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। ব্যক্তি সুরক্ষিত থাকলে তার পরিবার সুরক্ষিত থাকবে।’

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, দুই-তিন সপ্তাহ যদি সংক্রমণ এমন ৫ শতাংশের নিচে স্থিতিশীল থাকে, তাহলে একটা স্বস্তিকর অবস্থা হবে। কিন্তু সে কথাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ একটা মহামারী এখনো বিদ্যমান। পৃথিবীর যেকোনো দেশে ভাইরাসের পরিবর্তন হলে, ভাইরাস অন্য দেশেও ছড়াবে। সুতরাং সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।’

স্থানীয়ভাবে কোনো দেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলতে পারে না বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব মহামারীর নিয়ম হচ্ছে, মহামারী ঘোষণা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মহামারী শেষ হয়েছে, এই কথাটাও বলবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। স্থানীয়ভাবে মহামারী নিয়ন্ত্রণে বলার কোনো সুযোগ নেই।’