হারিয়ে যাওয়া সামাজিক পার্বণ

আশ্বিনে রাঁধে, কার্তিকে খায়

যেই বর মাগে, সেই বর পায়

শৈশবে যে কয়টা সামাজিক পার্বণের জন্য উন্মুখ থাকতাম এর মধ্যে ‘আশ্বিনে রাঁধে, কার্তিকে খায়’ পার্বণটি অন্যতম। এই পার্বণটি জীবন থেকে কখন হারিয়ে গেছে একটুও টের পাইনি। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বাংলার গাঁও-গেরামে ছয় ঋতু ছয় ভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। গ্রীষ্মের খরতাপে চৌচির হয়ে পড়ে মাঠ, পোড়ে জমির ফসল, শরীর থেকে দরদর করে বের হয় ঘাম। সবকিছু ধুয়েমুছে দিতে গুড়ুম গুড়ুম দেয়ার ডাকসহ ধুমধাম করে হাজির হয় বর্ষা। ছিপ-বড়শি নিয়ে মাছ ধরা, বর্ষার টলটলে পানিতে আনন্দে গা ভাসায় গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা। ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ প্রবচনটি বর্ষায় গ্রামবাংলার মাছের প্রাচুর্য থেকেই জন্ম হয়েছিল।

আকাশে যত্রতত্র মেঘের আনাগোনাসহ গুমট উষ্ণতা নিয়ে আসে শরৎ। কৃষকের মাঠের জমাটবাঁধা ধানক্ষেত আশ্বিনের ঝড়ে ভাসিয়ে নেওয়ার আতঙ্কের কাল শরৎ। তারপরেও, মাঠ-ঘাট আনাচে-কানাচে কাশফুল আর কাশফুল। দেখে মনে হয়, আকাশের সাদা মেঘ যেন ভূতলে গড়াচ্ছে।

গরিবের কষ্টসহ কলেরা-বসন্ত ইত্যাদি মহামারী রোগের সঙ্গে মোকাবিলার ঋতু শীতকাল। অস্বস্তিকর শরৎ ও শীতকাল। এই দুই ঋতুর মধ্যে সুখ-স্বস্তির কাল হেমন্ত। স্বস্তিসহ চোখের সামনে স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে হাজির হওয়ার সময় হেমন্তকাল। একদিকে কৃষকের সারা বছরের সঞ্চিত খোরাক ফুরিয়ে আসে, অপরদিকে আমনের ক্ষেতে ধানের শীষে ধরতে শুরু করে সোনালি রং। কৃষকদের ধানের গোলা মেরামতসহ বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুতের উপযুক্ত সময়ও হেমন্তকাল। আশ্বিনের শেষদিন রান্না শেষ করেই হেমন্তের সকালকে সুপ্রভাত জানানোর জন্য প্রহর গুনতে শুরু করে।

আশ্বিনে রেঁধে কার্তিকে খাওয়ার প্রচলন মূলত সনাতন ধর্মের পার্বণ। সনাতন ধর্মের মতে, স্বর্গের চিকিৎসক অশ্বিনী কুমারদ্বয় সূর্যদেব ও সংজ্ঞার পুত্র। অভিশাপগ্রস্ত সংজ্ঞা জগজ্জননী পার্বতীর কাছে নিজের দুর্দশা থেকে মুক্তি চাইলে পার্বতী এক মুষ্টি চাল দিয়ে তাকে বলেছিলেন আশ্বিন মাসের শেষ তারিখ শেষ সময়ে রান্না করে কার্তিক মাসের ১ম দিবসে সেই অন্ন ভক্ষণ করলেই মনোবাসনা পূর্ণ হবে। সে নিয়ম মেনে অভিশাপমুক্ত হয়েছিল সংজ্ঞা।

সংজ্ঞার অভিশাপমুক্তির ধারাবাহিকতায় রোগ থেকে আরোগ্যলাভসহ ফসলেরও নিরাপত্তা চায় কৃষক। ফসলের বালা-মুসিবতসহ রোগবালাই থেকে আরোগ্য কামনায় সনাতন ধর্মের বেশ কিছু সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে।

সন্তানের কল্যাণ ও ফসলের সুরক্ষার জন্য মুসলমানরাও দিনটি পালন করতে শুরু করেন। দিনটি গারুইদিন বলে সম্মান করতে দেখেছি আমার মা-দাদিকেও। কেউ কেউ চর্মরোগ থেকে সুরক্ষার জন্য আশ্বিনের রাতে নিমপাতার সঙ্গে হলুদ বেটে কার্তিকের ভোরে শরীরে মাখতেন। গৃহস্থ ঘরের বউয়েরা সকালে নদীতে গোসল করে পিতলের বদনি মেজে পানি ভর্তি বদনি দরজার সামনে পিঁড়ার ওপর রেখে দিতেন। বদনির পানিতে গুঁজে রাখতেন কচি পাতাসহ গাছের ডাল। লাঙল জোয়ালে ছিটাতেন সোনারুপোর পানি।

আমাদের ‘আশ্বিনের রান্না’ সূর্যদেবের স্ত্রী সংজ্ঞা দেবীর সংজ্ঞায় না পড়লেও ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নসহ স্বস্তির ঋতু হেমন্তকালকে স্বাগত জানানোর জন্য আয়োজন কম ছিল না।

চড়ুইভাতির আদলে আশ্বিনের রান্নাকে আমরা বলতাম ‘জোলাভাতি’। এক সপ্তাহ আগে থেকেই চলত জোলাভাতির আয়োজন। ভাত রান্নার সঙ্গে প্রধান তরকারি ছিল কচুশাক, শাপলা, গুঁড়োমাছের চচ্চরি, টক, পাঁচমিশালি সবজি ইত্যাদি। মাছ এবং শাক-সবজি সংগ্রহের দায়িত্বে থাকতাম আমরা আর রান্নার দায়িত্বে থাকত বাড়ির মেয়েরা। ছোট ছোট মেয়েরা পাকা গিন্নির কর্তৃত্ব নিয়ে আমাদের আদেশ-নির্দেশ করত আর আমরা বাধ্য কর্তার মতো সে আদেশ পালন করতাম।

বাড়ির আনাচে-কানাচে গজিয়ে থাকত কচুর ঝোপঝাড়। সেখান থেকে কেটে মাথায় করে কচু নিয়ে আসতাম। শুকনো লাকড়ির সন্ধানে বেরিয়ে পড়তো কেউ কেউ। জালি ও ওঁছা নিয়ে আমরা ছুটতাম মাছের সন্ধানে। শরতের শেষে খাল, বিল, ডোবা-নালা ভর্তি মাছ আর মাছ। বিলের হাঁটু বা কোমর জলে জালি ঠেললেই ঝলঝলে ইচারগুঁড়ো (ছোট চিংড়ি)। দেড়-দুই ঘণ্টা জালি ঠেললে পাতিল ভরে যেত।

গুঁড়োমাছ ধরতাম ঝিম টেনে। বর্ষার শেষে খাল-বিলের অগভীর পানির ঝারিদাম ও জলজ উদ্ভিদের আড়ালে লুকিয়ে থাকে খলিশা, বইচা, পুঁটি, বজুরি, টেংরা, গুতুম ইত্যাদি গুঁড়ো মাছ। কয়েকটি ওঁছা পাশাপাশি বসিয়ে রেখে দূর থেকে পানির তলা দিয়ে ঝিম (লম্বা দড়ি) টেনে ওঁছার দিকে আনতে হয়।

ঝারিদামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গুঁড়োমাছ বের হয়ে ঝিমের আগে আগে ওঁছার দিকে আসতে থাকে। ঝিম ওঁছার কাছে আসতেই মাছ আশ্রয় নেয় ওঁছার ভেতর। পানি নাড়া দিয়ে ওঁছা তুলতেই উঠে আসে ঝলঝলে গুঁড়োমাছ। বারো রকমের গুঁড়োমাছ দিয়ে রান্না করা হয় কয়েক রকমের তরকারি।

প্রায় প্রত্যেক বাড়ির উঠানে ২০-২৫ জন শিশু-কিশোরীদের একজনও অবসর নেই। বাটনা বাটা, পেঁয়াজ, মরিচ ও রসুন বাছাই করা, মাছ কাটা, তরকারি পরিষ্কার করা, পানি তোলা, চাল ধোয়া, চুলায় আগুন জ্বালানো একেকজন একেক কাজে নিয়োজিত। দুই বছরের শিশুটিও কোনো না কোনো কাজে হাত লাগায়।

খোলা আকাশের নিচে মাটির চুলা আগেই প্রস্তুত করা থাকে। শিশুরা দূর থেকে মা-চাচিদের পরামর্শ নিলেও রান্নার কাজে তাদের হাত লাগাতে দেয় না কেউ। ভবিষ্যৎ সুগৃহিণী হওয়ার প্রথম হাতেখড়ি আশ্বিনের রান্না দিয়েই শুরু। তাজা মাছ, মাটির চুলা, খড়ির আগুন দিয়ে নিজ হাতের রান্নায় পেটের ক্ষুধা বেড়ে যেত কয়েক গুণ।

রান্নার আয়োজিত এলাকার চারদিকে বাড়ির মুরব্বি নারী-পুরুষ ভিড় করে নিজ নিজ সন্তানের রান্না করার কলাকৌশল উপভোগ করতেন। শিশুদের কেউ কেউ সানকি বাসন হাতে খাওয়ার জন্য ঘুরঘুর শুরু করত রান্না শেষ হওয়ার আগেই। খোলা উঠানেই মাদুর, বিছানা, চট ও পিঁড়ি পেতে শুরু হয় খাওয়ার পালা। ফাইভস্টার হোটেলের ব্যুফেসহ জীবনে যত খাবারই খেয়েছি আশ্বিনের শেষে নিজেদের রান্না করা খাবারের স্বাদ আর কোথাও পাওয়া যায়নি।লেখক

আইনজীবী ও লেখক

adv zainulabedin@gmail