সুর নরম করছে তালেবান

তালেবানের ‘ইসলামী আমিরাত’ সবার অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন তালেবানের জাতিসংঘ দূত সুহাইল শাহীন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আফগান সরকারের জন্য পশ্চিমাদের চাপের জবাবে আল জাজিরাকে এই কথা বলেন সুহাইল শাহীন।

তালেবান বলছে, গত মাসে ঘোষিত তাদের মন্ত্রীসভায় জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে এবং পরে নারীদেরও যুক্ত করা হবে।

তবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকারে ‘পুরোনো সরকারের লোকদের’ অন্তর্ভুক্ত করার মার্কিন পরামর্শে তালেবান এখনো রাজি হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে।

জাতিসংঘের জন্য মনোনীত তালেবানের রাষ্ট্রদূত সুহেল শাহীন এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আল জাজিরাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই আফগান জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে’।

গত ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর তালেবানের ‘আফগানিস্তান ইসলামি আমিরাত’ (আইইএ) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমারা বলেছে যে নারী এবং সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণের ভিত্তিতে তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

নারীদের উচ্চ বিদ্যালয় অব্যাহতভাবে বন্ধ রাখা এবং হাজারা জনগণের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানোর কারণে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তালেবানের সমালোচনা করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

 

তালেবান-মার্কিন আলোচনা

তালেবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নেতৃত্বে একটি আফগান প্রতিনিধি দল কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য দোহায় পৌঁছেছেন। তার মধ্যেই সুহাইল শাহীন এই মন্তব্য করলেন।

গত ৩০ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র দপ্তরসহ মার্কিন কর্মকর্তারা তালেবানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে শনিবার। দুই দিনের এই বৈঠক আজ শনিবার থেকে শুরু হয়েছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিধর দেশগুলোর নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও তালেবান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে গুপ্তচর প্রধান মোল্লা আবদুল হক ওয়াসিক, তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী মোল্লা খায়রুল্লাহ খাইরখোয়া এবং শেখ শাহাবুদ্দিন দিলাওয়ার।

মৌলভী দিলাওয়ার দোহা ভিত্তিক তালেবানের শান্তি আলোচনা দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দোহার রাজনৈতিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান মোল্লা মোহাম্মদ ওমরই কাতার পাঠিয়েছিলেন।

এর আগে তালেবানের সিনিয়র নেতা সুহাইল শাহীন বৃহস্পতিবার দোহায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তালেবান জোর দিয়ে বলছিল যে, দোহায় স্বাক্ষরিত ২০২০ চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান দেখানো উচিত এবং তালেবানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলো সরিয়ে নেওয়া উচিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ তালেবানকে দেওয়া উচিত। বর্তমান মন্ত্রীসহ অনেক তালেবান নেতাও এখনো জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত রয়েছে।

আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ ও অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করে রেখেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ তার তহবিলে আফগানিস্তানের প্রবেশাধিকার স্থগিত করেছে যার ফলে দেশটিতে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে।

 

নারীর অধিকার বিষয়ে ছাড়

যুক্তরাষ্ট্র চায় পূর্ববর্তী আফগান সরকারের নেতাদেরও তালেবানের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকারের অংশ করা হোক, নারীদের সমান অধিকার দেওয়া হোক। এছাড়া আইএসআইএল-এর সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠী, যেমন খোরাসান প্রদেশের ইসলামিক স্টেট, আইএসকেপি (আইএস-কে)-র ওপর বিমান হামলা চালানোর সুযোগও চায় যুক্তরাষ্ট্র।

আইএসকেপি শুক্রবার কুন্দুজে শিয়া হাজারাদের একটি মসজিদে হামলার দায় স্বীকার করেছে, যার ফলে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর এটি সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা ছিল। আইএস জঙ্গী গোষ্ঠী তালেবানদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এর আগে, আফগানিস্তানে নিযুক্ত কাতারের বিশেষ দূত মুতলাক আল-কাহতানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ‘তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তিনি গত মাসের শেষের দিকে আল জাজিরাকে বলেছিলেন, ‘আপনি তাদের সাথে একমত নাও হতে পারেন, কিন্তু বিচ্ছিন্নতার নীতি কোনো সমাধান আনতে পারবে না’।

‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা উচিত হবে না। একঘরে করে রাখা রাষ্ট্রগুলো চরমপন্থা এবং সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে’। তিনি আফগানিস্তানকে একঘরে করে রাখার বিপদ ও পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই মন্তব্য করনে।

তিনি বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ আফগান মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানকে তা হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে’।

এদিকে, আফগানিস্তান একটি মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ দেশটির জন্য যে পরিমাণ অর্থ চেয়েছিল তার মাত্র এক তৃতীয়াংশ বিতরণ করা হয়েছে।