কমরেড ফরহাদের অনুপ্রেরণা

১৯৮৭-এর একটি মুহূর্তের দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করছি। বিভিন্নজনের লেখা পড়ে এটি কল্পনা করতে পারছি। সেই দিন এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ, তাদের মধ্যে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পীরা। অগুনতি মানুষ। সবাই শোকাভিভূত। এ দৃশ্য কল্পনা করেই যাচ্ছি। বাংলাদেশের একজন কমিউনিস্ট নেতার জন্য এ ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি গৌরব।

দুই. মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ। বাংলাদেশের একজন একনিষ্ঠ কমরেড। আমৃত্যু বিপ্লবী। ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে মারা যান তিনি। প্রতি বছর এ দিনটি আসে, আবার তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন ৫ জুলাইও আসে। যাওয়া-আসার এ দিনগুলোতে মোহাম্মদ ফরহাদের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণসভা আয়োজন হয়। তাতে আমরা কী করি, ফরহাদ সম্পর্কে কতগুলো স্তুতিবাক্য আওড়াই। এগুলোতে আমরা আমাদের ‘মহান কর্তব্য’ বলে মনে করে যাচ্ছি, আমাদের কথামালায় মোহাম্মদ ফরহাদকে ‘অতিমানব’ হিসেবে তুলে উপস্থাপনে অপলাপ করি। বরং যে কীর্তি তিনি রেখে গেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি এবং যে শ্রদ্ধার আসনটি তিনি অধিকার করেছিলেন, সেই নির্মোহ আলোচনাটুকু প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। প্রয়াণের ৩৪ বছরে জাতিসত্তার বিকাশের নানা প্রয়োজনে মোহাম্মদ ফরহাদ অনুভূত হওয়া প্রাসঙ্গিক। 

তিন. কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ হারিয়ে যাচ্ছেন, যদি বলা হয় ভুল বলা হবে? একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, বোঝা যাবে কথাগুলো সত্য কি না। কীভাবে তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন, সেই আলোচনাটা এ পরিসরে হয়তো করব না। এ আলোচনায় আমার যথেষ্ট আড়ষ্টতা আছে। তার যে লড়াই-সংগ্রাম, কিংবা তার ধ্যানজ্ঞান ও সাধনার প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার জাতীয় নেতা হয়ে ওঠা আলোচনাগুলো তরুণ প্রজন্ম, তৃণমূল পর্যায়ে অধরা থেকে যাচ্ছে। কীভাবে একজন মোহাম্মদ ফরহাদ একজন ‘কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ’ হয়ে উঠেছেন, এ চর্চাগুলো আমাদের মধ্যে নেই। থাকার কথা নয়, চারদিকে এত অনুসারী চর্চার মধ্যে তাদের কাছে মোহাম্মদ ফরহাদ অনেকটাই অচেনা, কিংবা বেমানানও লাগতে পারে। ‘বিপ্লবের জন্য আরও পাঁচটি বছর কাজ করে যাওয়ার’অদম্য ইচ্ছে বা আকাক্সক্ষাগুলো ক্রমশ ম্রিয়মাণ। এ দুঃখ আমরা কোথায় রাখব? কমরেড ফরহাদের সমসাময়িক কিংবা যারা তার সান্নিধ্য পেয়েছেন, ফরহাদের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে এত বছরেও সেই সঠিক দিশা দেখাতে পারেননি, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বিভিন্নভাবে। হয়তো এ কথাতে সৌন্দর্যহানি হবে, মানতে চাইবেন না, কিন্তু বলতেই হয়, তারা কেটে পড়েছেন।  

চার. যে যুবকটি, আজ যারা সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ে শামিল হচ্ছে, তার কাছে প্রশ্ন করে দেখা যেতে পারে, কমরেড ফরহাদ সম্পর্কে কতটুকু জানে সে। মোটের ওপর সে হয়তো বলতে পারবে, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির বড় নেতা ছিলেন। ব্যস, অতটুকুই, এর বাইরে বেশি কিছু বলতে পারবে না। দোষ তার নয়। এ না-জানার দায়টা আমাদেরই নিতে হবে। অবশ্যই তিনি তরুণদের প্রেরণা হয়ে উঠতে পারেন। তার আকর জীবন পুরো একটি তারুণ্য জীবন।

কমরেড ফরহাদের ৫২ বছরের জীবন একটি বিপ্লবী জীবন, পরিপূর্ণ কমিউনিস্টের জীবন। নিজ চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের জোরে বাম বৃত্তের চৌহদ্দি পেরিয়ে নিজেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অন্যতম রূপকার হিসেবে তৈরি করেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে তিনি ছিলেন দুই প্রজন্মের চল্লিশ দশকের পথিকৃৎ কমিউনিস্ট বিপ্লবী মণি সিংহ, বারীণ দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি ও জ্ঞান চক্রবর্তীদের প্রজন্ম এবং সত্তর ও আশির দশকের তরুণ কমিউনিস্ট প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন স্বরূপ। দুই প্রজন্মের মধ্যেই তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত।  

জাতীয় রাজনীতি, একই সঙ্গে ছাত্র, শ্রমিক, নারী, যুব, ক্ষেতমজুর, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা কর্মকা- এবং নাগরিক সমাজের তৎপরতারও পেছনে ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। ঐকবদ্ধ জাতীয় এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলন এবং সংগঠন, অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল সমাজচেতনাভিত্তিক বিস্তার সাধনে অনেকের বিবেচনায় তা তুলনারহিত, এবং তা গড়ে তোলার পেছনেও তার অনুঘটকের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে। তার অকাল প্রয়াণ তার স্বপ্নযাত্রায় অনেকটা শ্লথ হয়ে গেছে। সেটিকে গতিশীল করার জন্য যে দৃষ্টি দেওয়ার দরকার ছিল, কিংবা তাকে অধিকতর চর্চার ভেতর দিয়ে হয়তো এতদিনে এ নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের একটি অন্য চেহারা দেখতে পারত। 

পাঁচ. কমরেড ফরহাদ দেশে একটি শোষণ-বঞ্চনা-ভেদ বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন ছড়িয়েও দিয়েছেন। আবারও এই কথাটাই বলতে হয়, সেই স্বপ্নকে বিকশিত করার যে মহান এবং বলিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করার কথা সেখান থেকে আমরা অনেক দূরে চলে আসছি। অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছি। কমরেড ফরহাদের মতাদর্শ লড়াই, সেই লড়াই থেকে বাইরে চলে যাচ্ছি। ফের অন্তর্মুখী জীবনে তাকাচ্ছি।

কিন্তু কমরেড ফরহাদের কথা বারবার বলতে হবে। পুনরাবৃত্তি করতে হবে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে তার দর্শন, মতাদর্শকে সামনে রাখতে হবে। তাহলে আমরা আরও সুসংহত হব। শক্তি বৃদ্ধি করতে পারব। সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবমুক্তির বিপ্লবের পথে এগিয়ে চলতে আমাদের সেই লক্ষ্য, সেই সাহস, সেই শক্তি অর্জনে মোহাম্মদ ফরহাদের জীবন আমাদের অনুপ্রাণিত করুক।

মোহাম্মদ ফরহাদ একনিষ্ঠ নিরলস কাজের এক অভাবনীয় দুর্লভ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। রাতের পর রাত তিনি জেগে থেকেছেন। কীভাবে সকাল হয় তিনি দেখেছেন। তার দিনমান গেছে রাজনীতি, সংগঠনে। একদিনের জন্যও তিনি থামেননি। বিপ্লবের আকণ্ঠ পিপাসা নিয়েই তার মৃত্যু হলো। সে জন্যই এ জীবন। এ মৃত্যু এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  

চিরঞ্জীব কমরেড ফরহাদ, লাল সালাম!

লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি