বোন ও ভাগনির লাশের খোঁজে তুরাগের তীরে পড়ে আছেন মনির

দিনমজুর মো. মনির হোসেন (৩০)। নিজের স্ত্রী-সন্তান, বৃদ্ধ মা, দুই বোন এবং তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে পেটের তাগিদে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানার গজারিয়া গ্রাম থেকে মাত্র দেড় মাস আগেই জীবিকার সন্ধানে আসেন রাজধানীতে। পরবর্তীতে সাভারের আমিনবাজার এলাকার বড়দেশী পূর্বপাড়া মহল্লার আব্দুল মালেকের বাড়িতে ভাড়া থেকে কয়লা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

জানা গেছে, মনির ও তার স্ত্রী মিলে সারা দিনে কয়লার কাজ করে পাঁচ-ছয়’শ টাকা আয় করতেন। তা থেকে মাসে আড়াই হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে বাকি টাকা দিয়ে কোনো মতে চালিয়ে নিচ্ছিলেন অভাবের সংসার। এরই মাঝে শনিবার সকালে তাদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দুই বোন, তাদের ছেলে-মেয়ে ও স্বামীসহ একই পরিবারের ১১ জন মিলে আরও দিনমজুরদের সঙ্গে নৌকাযোগে কাজে যাওয়ার সময় বালু বহনকারী একটি কার্গো তাদের নৌকার ওপর দিয়ে উঠিয়ে দেয়।

এ ঘটনায় মনির তার দুই বোন এবং তাদের ছেলে-মেয়েসহ পাঁচজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তারপরও বোন এবং ভাগনির লাশের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তুরাগ নদীর দুই ধারে।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত শনিবার ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে সাভারের আমিনবাজার কেবলারচর এলাকা থেকে ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা যোগে একই পরিবারের ১১ জনসহ ১৮ জন লোক তুরাগ নদী পার হয়ে দিন মজুরের কাজ করার জন্য পার্শ্ববর্তী দ্বীপনগর এলাকায় যাচ্ছিলেন। নৌকাটি তুরাগ নদীর মাঝে চলে গেলে একটি বালু বহনকারী কার্গো সেটির ওপর দিয়ে উঠিয়ে দিলে ডুবে যায়।

এর মধ্যে সাঁতরে ১১ জন তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ হয় নারী ও শিশুসহ ৭ জন। পরবর্তীতে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যরা এক নারী ও চার শিশুসহ ৫ জনের লাশ উদ্ধার করেন। কিন্তু আলোক স্বল্পতার জন্য দুজনকে উদ্ধার না করেই অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

উদ্ধার লাশগুলোর মধ্যে রয়েছে মনির হোসেনের ছোট বোন সোয়েলা (২০), তার ছেলে এমরান (৩), ভাগনে আরমান (৭) এবং প্রতিবেশী রুপেনা ও মো. হোসাইন দম্পতির দুই মেয়ে আলমিনা (৮) এবং ফারহা মনি (৫)। তবে নৌকা ডুবির ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছে মনিরের বড় বোন রূপায়ন (৩২) ও তার মেয়ে জেসমিন (২)

এদিকে রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিখোঁজ রূপায়ন ও তার মেয়ের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ফায়ার সার্ভিস। একপর্যায়ে দুপুরে নৌকা ডুবির ৩৩ ঘণ্টার পর কাউকে খুঁজে না পেয়ে উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

তবে নিখোঁজ মা রূপায়ন ও মেয়ে জেসমিনের সন্ধানে তুরাগ নদীতে টহল অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। রবিবার দুপুর দেড় টায় সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করে বিআইডব্লিউটিএ এর সহকারী পরিচালক শেখ রবিউল ইসলাম।

ঘোষণার পর তুরাগ নদীতে নৌকাডুবির ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী ডুবুরি দলের সদস্যরা চলে যায়। তবে ঘটনাস্থলের ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে নিখোঁজ মা-মেয়ের সন্ধানে টহল অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়। এ ছাড়া নিহতের প্রত্যেক জনের পরিবারকে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তহবিল থেকে ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।

অন্যদিকে দুদিন অতিবাহিত হলেও নৌ পুলিশ ঘাতক বালু বহনকারী কার্গোটি চিহ্নিত করতে না পারায় মামলাও হয়নি। এ ছাড়া ইঞ্জিন চালিত নৌকার মাঝিও ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে। তার বিস্তারিত পরিচয় জানা না গেলেও নৌকাটির মালিক রানা বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

প্রসঙ্গত, গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে আমিনবাজার তুরাগ নদী বাল্কহেডে ধাক্কায় শ্রমিকবাহি নৌকা ১৮ জনসহ ডুবে যায়। তীরে ১১ উঠতে পারলেও নিখোঁজ হয় ৭ জন। এদের মধ্যে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নিখোঁজ রয়েছে আরও দুজন।