১৯৭৫ সালে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, প্রফেসর কাজী মোতাহার হোসেন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে বাংলাদেশের প্রথম তিন জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেওয়া হয়।
প্রফেসর রাজ্জাকের (১৯১৪-১৯৯৯) জন্ম ঢাকার নবাবগঞ্জে। ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করার পর ১৯৩১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করে রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৫ পর্যন্ত তিনি অধ্যাপনা অব্যাহত রাখেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস-এ তিনি হ্যারল্ড লাস্কির ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যাপক তিনি। তার ছাত্র এবং ২০১১ সালে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সমাদৃত সরদার ফজলুল করিম ১৯৭৬ সালে তার যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তা সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এবং পরে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রফেসর রাজ্জাকের মতো এত খোলামেলা ও বিস্তৃতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাহিনী এবং সমাজচিত্র অন্য কেউ তুলে ধরেননি। তিনি ইংরেজি ও বাংলার মিশেলে, কখনো প্রমিত, কখনো কথ্যভাষায় তার বিবরণী দিয়েছেন। তিনি যে ভাষায় কথা বললেন সরদার ফজলুল করিম তা-ই ১৪৩ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থে ধারণ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে তার বিবরণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কৌতূহলোদ্দীপক কিছু বিষয় সহজ ভাষায় উপস্থাপনা করা হচ্ছে : স্কুলে তিনি অ্যাডিশনাল ম্যাথমেটিক্স পড়েছেন, ফার্সি পড়েননি, কারণ এটা তার মনে তখন কাজ করেছিল যে আরবি-ফার্সি পড়া- এসব তো মোল্লাগিরি। অথচ তিনি মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্র। সেখানে বাধ্যতামূলক স্কুল ড্রেস ছিল পাজামা-টুপি। বাসুদেব সাহা ছাড়া শিক্ষকদের আর সবাই ছিলেন মুসলমান। সে সময় জন্মাষ্টমী, মহররমের মিছিল, মসজিদের সামনে মাইক বাজানো এসব অজুহাত থেকে দাঙ্গা সৃষ্টি হতো। তিনি মনে করেন দাঙ্গার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত না। মুসলমান ছাত্রদের একটি সমস্যা তিনি দেখিয়েছেন। ভালো হিন্দু ছাত্রদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শিক্ষকদের যে সামাজিক সম্পর্ক মুসলমান ছাত্রদের সঙ্গে তা ছিল না। আর্থিক শ্রেণিগত পার্থক্যের ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন যে আর্থিক শ্রেণি থেকে শিক্ষক আসতেন, মুসলমান ছাত্র কদাচিৎ সে শ্রেণির হতেন। তবে মুসলমান ছাত্রের কৃতিত্ব স্বীকার করতেন ‘হরিদাস বাবু মানে হরিদাস ভট্টাচার্য দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। তার কম্যুনাল পরিচিতি ছিল। টিকিধারী ব্রাহ্মণ। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রদের বিদ্যার বিচারে কখনো তিনি কম্যুনাল হননি।’ তবে মুসলমান ছাত্রদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন, অনেক সময়ই তা যুক্তিযুক্ত ছিল না। ‘মযহার সাহেবের কথা আমি জানি। মযহার সাহেব (অধ্যাপক মযহারুল হক) ৩ নম্বরের জন্য ফার্স্টক্লাস পাননি।’
১৯৩৫ সালে তিনি এমএ পরীক্ষায় ভাইভাতে হাজির হননি। দ্বিতীয়বার ১৯৩৬ সালে তিনিই প্রথম স্থান অধিকার করেন কিন্তু ফার্স্টক্লাস পাননি। শিক্ষক হওয়ার পর প্রথম ছ’মাস তিনি ক্লাস নিতে পারতেন না। তারই ভাষ্য ‘পাঁচ-দশ মিনিটের বেশি ক্লাসে থাকতাম না। পড়া একেবারে মুখস্থ কইরা যাইতাম। তবু ক্লাসে যাইয়া মনে থাকত না। চেষ্টা করতাম। কিন্তু মোটের ওপর একেবারেই বক্তৃতা দিতে পারতাম না।’ এটা রটেছিল যে এই ব্যর্থতার কারণে তার বেতন কমিয়ে দেওয়ার জন্য বিভাগীয় প্রধানকে লিখেছিলেন। একবার তিনি লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করছিলেন, এমন সময় গম্ভীর শিক্ষক অজিত সেন এসে তার পাশে বসলেন। এক মিনিট চুপ করে থেকে বললেন : ‘রাজ্জাক তোমার নাকি ক্লাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে?’ আমি বললাম, হ্যাঁ স্যার, আমি ক্লাস নিবার পারি না। একথা শুনে তিনি খুব কনসার্নড হয়ে বললেন, কেন ক্লাসে কয়েকটি মেয়ে আছে সেজন্য? তখন মাত্র নতুন মেয়েরা পড়তে আসছে। হিন্দু মেয়েরা। আমি বললাম, না স্যার, মেয়ে ছাড়া যে ক্লাসগুলো সেগুলোও আমি নিতে পারি না। শুনে হেসে বললেন : ও কিচ্ছু না, ও তোমার ঠিক হয়ে যাবে। প্রফেসর রাজ্জাক মনে করেন তিনি অত্যন্ত ভাগ্যবান। অধ্যাপকরা তাকে স্নেহ করতেন। ‘আর এই স্নেহ না পেলে আমি মাস্টারির চাকরি করতে পারতাম না। আমার দ্বারা কুলাত না।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গোবেচারা তরুণ শিক্ষক নিখিল রঞ্জন রায় ক্লাস সামলাতে পারতেন না। তিনিও প্রফেসর রাজ্জাকের সঙ্গে একই সময় চাকরি পান। সরদার ফজলুল করিমও তাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন। নিখিল বাবু ইংরেজিতে লেকচার দিচ্ছেন। ছেলেরা বলে উঠল, স্যার বুঝি না, বাংলায় কন। ছাত্রদের অসুবিধের কথা ভেবে তিনি যখন বাংলায় বলতে শুরু করলেন, ছাত্ররা সমস্বরে বলে উঠল, সংস্কৃত চালান স্যার, সংস্কৃত।
প্রফেসর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নের বিরোধিতার কথা বললেন, অধিকাংশ হিন্দু মধ্যবিত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাদের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ও রয়েছেন। কারণ দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হলে তার ‘জমিদারি’ খাটো হয়ে যাবে। সূচনাকালের তরুণতম অধ্যাপক রসায়নের জ্ঞান ঘোষের কথা বললেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরির শর্ত ছিল চাকরি ছাড়লে তার গবেষণার জন্য খরচ করা অর্থ ফেরত দিতে হবে। এটা মাফ করে দেওয়ার মতো উদারতা স্যার আশুতোষ দেখাননি। জ্ঞান ঘোষকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার মাশুল গুনতে হলো। স্যার আশুতোষ তাকে পুরো দশ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। বিজ্ঞানী সত্যেন বোস রিডার হিসেবে যোগ দিলেও জ্ঞান ঘোষকে সরাসরি অধ্যাপক পদে নেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিককার বিখ্যাত অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো স্ট্যাটুটরি গ্র্যান্ট না থাকায় তার মনে হয়েছে সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয় উঠিয়েও দিতে পারে। ঢাকায় তিন বছর কাটানোর পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে বললেন, এ বয়সে নতুন চাকরি শুরু করার সুযোগ কম, তবে এক বছরের ছুটি পেলে কলকাতা বারে নিজের ভাগ্যটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট নরেশচন্দ্র ছুটি পেয়ে বারে যোগ দিলে ইংরেজি স্টেটসম্যান পত্রিকায় খবর বের হলো‘বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অধ্যাপকের ওকালতিতে যোগদান।’ খবরটি ভাইস চ্যান্সেলর ফিলিপ হারটগকে ভীষণ অসন্তুষ্ট করল এটা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত। তিনি নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে কৈফিয়ত দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময় তিনি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ার চিঠি দিলেও হারটগ সাহেব সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। নরেশ সেনগুপ্ত শিক্ষক হিসেবেও অসাধারণ মানের ছিলেন, ডাকসাইটে সাহিত্যিকও।
কলকাতা ফ্যাক্টর
কলকাতা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের টানটা ছিল প্রায় অনতিক্রম্য ঢাকা, রাজশাহী কিংবা চাটগাঁ নয়। প্রফেসর রাজ্জাক বলছেন : গভর্নমেন্ট ও রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টিও কলকাতার ওপর। এটা ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাজেট এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের বাজেট তুলনা করলেই বোঝা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের চেয়ে বেশি ছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের বাজেট। কাজেই যদি মুসলমানদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত হয়েই থাকে সাহায্যের পরিমাণটা তেমন বিবেচনাযোগ্য ছিল না।
প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রস্তুতির দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অর্জন তাতে গড়পড়তা ফলাফলে খুব ভালো করেছিল। সমস্ত বাংলার বেস্ট কিংবা ব্রিলিয়ান্ট ছেলে তখন প্রেসিডেন্সি কলেজেই পাওয়া যেত।... তবে গড়পড়তা ফলাফলে ঢাকার অবস্থান প্রেসিডেন্সির অনেক ওপরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র কম ছিল এবং টিউটোরিয়াল পদ্ধতিটা বেশ সাফল্য লাভ করেছিল। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে টিউটোরিয়াল করানো হতো বলে ছাত্ররা এটাতে উপকৃত হতো। সে সময় ‘নোট’ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই ছিল না। প্রফেসর রাজ্জাকের সময়ে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট হওয়া মুসলমান ছাত্র জালালউদ্দিন সিকদারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আকৃষ্ট করতে পারেনি। তিনি কলকাতায় চলে যান।
এক্সটেনশন
বয়স্ক অধ্যাপক নগেন ঘোষকে যখন এর ডিন করে আনা হয় তখন তাকে মৌখিকভাবে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, তাকে তিন বা পাঁচ বছরের একটি এক্সটেনশন দেওয়া হবে। বিধান অনুযায়ী, যেকোনো চুক্তিভিত্তিক চাকুরের বেলায় সময় ফুরোনোর আগেই চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো অমুক তারিখে আপনার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় যাদের অব্যাহত সেবা চাইত তাদের কাছে ভিসির চিঠি পৌঁছাত আপনি যদি এক্সটেনশন গ্রহণ করতে চান তাহলে জানান। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে পাঠানো হবে এবং স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার সক্ষমতার সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে। নগেন ঘোষ জানালেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে এক্সটেনশন না দিয়ে যদি এটাকে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের আলোচনার বিষয়ে পরিণত করা হয় তাহলে আমার এক্সটেনশনের প্রয়োজন নেই।
সূচনাকালের শিক্ষক
অনুচ্ছেদটির কথাগুলা প্রফেসর রাজ্জাকের। ইংরেজি ও বাংলার মিশেলে তৈরি বাক্যগুলো কেবল বাংলায় লেখা হচ্ছে : সত্যেন বোস রিডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু জ্ঞান ঘোষ যখন আসেন তিনি সরাসরি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পদার্থ বিজ্ঞানে একজন অধ্যাপক ছিলেন জেঙ্কিনস সাহেব। তিনি আইইএস অর্থাৎ ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসের লোক। তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজে, সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। জেঙ্কিনস সাহেব এসেছিলেন চুক্তির ভিত্তিতে। তার সরকারি চাকরি বহাল ছিল। তিন বছরের কন্ট্রাক্টে এসেছিলেন। অনেক দর-কষাকষি করেছিলেন মায়না (বেতন) নিয়ে। সিনিয়রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর-কষাকষি তিনিই করেছিলেন। জেঙ্কিনস সাহেব চলে যাওয়ার পর পদার্থ বিজ্ঞানের প্রফেসর নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। জেঙ্কিনসের চলে যাওয়াটা বোধ হয় স্বাভাবিক ছিল না। ছাত্রদের কোনো অভিযোগ ছিল না তার বিরুদ্ধে। তিনি তখন বলেছিলেন, তিনি সরকারি চাকরিতে ফিরে যেতে চান। এর মধ্যে সত্যেন বোস জার্মানি গিয়েছিলেন। বোসের আসল কাজ ছিল স্ট্যাটিসটিক্স-এর ওপর। জার্মানিতে আইনস্টাইনের সঙ্গেও কিছু কাজ করেছিলেন। ফিরে আসার পর যখন অধ্যাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় তিনি দরখাস্ত করেন। তখন নির্বাচন কমিটি অধ্যাপক পদের জন্য তাকে মনোনয়ন দেয়নি। মনোনয়ন দিয়েছে ডিএম বোসকে। কিন্তু ডিএম বোস বোধ হয় যোগদান করেননি। তখন সত্যেন বোসকে প্রফেসর করা হয়। প্রফেসর পদের জন্য সম্ভবত বোসই অন্য সব প্রার্থীর চেয়ে বেশি যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তার ফাইলে দেখা যায় তিনি প্রথমে মনোনয়ন পাননি। (আগামীকাল সমাপ্য)
লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট
momen98765@gmail.com