২৬টি অ্যাটলের প্রায় ১২শ দ্বীপ মিলে ভারত মহাসাগরের একটি দেশ- মালদ্বীপ। এখানে বার মাসই গ্রীষ্মকাল। দিনের বেলা সূর্যের তাপ একেবারে শরীরে এসে বিঁধে। অথচ এই খরতাপেও থেমে নেই ফুটবল নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের উন্মাদনা। মালের বিভিন্ন স্থানে বসানো আছে মিনি টার্ফ। বাইরের দ্বীপগুলোতেও আছে খেলার ব্যবস্থা। করোনার বিস্তারের আগেও এই মিনি টার্ফগুলোতে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা বিরামহীন খেলা চলত। করোনার কারণে কিছুটা কমলেও প্রায় সারা দিনই টার্ফগুলোতে ছুটে বেড়াতে দেখা যায় নানা বয়সের ফুটবলারদের। মাঠ চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলেই সরকারি-বেসরকারি ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলো ফি সপ্তাহ মাত্র দু’টি সেশন পরিচালনার সুযোগ পায় একেকটি টার্ফে। মাঠের সীমাবদ্ধতা আছে, ফুটবলারদের অর্থের আধিক্য নেই। তবে তাদের আছে খেলাটির প্রতি ভালোবাসা। আর আছেন একজন আলী আশফাক। মালদ্বীপের হাজারো কিশোরের চোখে তাই আলী আশফাক হওয়ার স্বপ্ন।
আশফাককে আদর করে ডাকা হয় লৌহমানব। পায়ের শৈল্পিক কারুকাজে এই অঞ্চলের মানুষকে বুঁদ করে রেখেছেন দীর্ঘদিন। বয়স এখন ছত্রিশ। অথচ এখনো কী ক্ষিপ্রতা। প্রতিপক্ষের রক্ষণ দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার সে কী ইচ্ছা! মোহনীয় ফুটবলে মাত করে এই দ্বীপবাসীদের কাছে আশফাক মেসি-রোনালদোর চেয়েও বড় তারকা, স্বপ্নদ্রষ্টাও। মালের ফ্রেন্ডস ফুটবল ফ্যামিলি অ্যাকাডেমিতে ১২ থেকে ১৪ বছরের ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৪০ জন। অ্যাকাডেমিটি রবিবার ছুটির দিনে ব্যস্ত টার্ফের বরাদ্দ পেয়েছে ভরদুপুরে। স্কুলপড়ুয়াদের তাতে কোনো অভিযোগ নেই। কারণ তারা জানে, এতটুকু কষ্ট না করলে যে আশফাকের মতো বড় ফুটবলার হওয়া যাবে না। তাদের কোচ শরীফ আহমেদের কথায়, ‘এখানে সবার একটাই স্বপ্ন- আলী আশফাকের মতো ফুটবলার হবে। এক আশফাক আমাদের সবার ভাবনায় পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।’
মালদ্বীপ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের টেকনিক্যাল ডাইরেক্টর আহমেদ শরীফ। ‘দুঙ্গা’ নামেই বেশি পরিচিতি তিনি। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় ঘুরেফিরেই এসেছে আশফাক প্রসঙ্গ, ‘আশফাক আমাদের জীবন্ত কিংবদন্তি। ওর কারণেই মালদ্বীপের মানুষ ফুটবল বলতে অজ্ঞান।’ ‘দুঙ্গা’ দেখেন হাজারো আশফাকের স্বপ্ন, ‘বছর পাঁচেক আগে মনে হতো আরেকজন আশফাকের দেখা আর আমরা পাব না। এখন সেই বিশ্বাস বদলেছে। আশফাকের মতো অনেক প্রতিভার খোঁজ পেয়েছি। তাদের গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
একটা সময় দক্ষিণ এশিয়া ফুটবলে মালদ্বীপের অবস্থান ছিল তলানিতে। সেটা বদলে এখন তারা অন্যতম পরাশক্তি। দুঙ্গা জানান, ফুটবলের প্রশ্নে সবাই বিভেদ ভুলে এক হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও ফুটবল তাদের এক সুতোয় বেঁধেছে। ফুটবল ফেডারেশন চাইলেই সরকার বাড়িয়ে দেয় সহায়তার হাত। ক্লাবগুলোও সঠিক পথে হেঁটে রাখছে অবদান। দুঙ্গা বলেন, ‘এখানে আমরা সবাই হাতে হাত ধরে ফুটবল উন্নয়নে কাজ করি। সরকার অনেক সহায়তা করে। জাতীয় দলের ফুটবলারদের নিয়মিত বেতন দেয়। একটা সময় ফুটবলটা মালেকেন্দ্রিক ছিল। ফেডারেশনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট (বাসাম আদিল জলিল) এসে চোখ রেখেছেন অন্য দ্বীপগুলোতে। সেখানে অভিজ্ঞ কোচরা গিয়ে প্রতিভাবান ফুটবলার বাছাই করছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, স্কুলগুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি বয়সভিত্তিক আসর হয় প্রতি বছর। স্কুল ও অ্যাকাডেমির ছাত্ররা বছরজুড়ে কমপক্ষে ৫২টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। বর্তমান মালদ্বীপ দলের ২৩ খেলোয়াড়ের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো স্কুল থেকে উঠে আসা।’
মালের পাশের দ্বীপ হুলহুমালেতে স্থাপিত হয়েছে জাতীয় ফুটবল স্কুল। যেটা কর্মকান্ড শুরুর অপেক্ষায়। এছাড়া পুরো মালদ্বীপে ২০টি অ্যাকাডেমি পরিচালনা করছে ফেডারেশন। ব্যক্তিগতভাবে রয়েছে অসংখ্য অ্যাকাডেমি। শীর্ষ লিগে খেলা আট দলের অ্যাকাডেমি পরিচালনা বাধ্যতামূলক। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এসব অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে বছরে হয় তিনটি বয়সভিত্তিক লিগ। ২০২৬ এশিয়ান কাপের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মালদ্বীপ। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা খুঁজে পেয়েছে সঠিক পথের দিশা। তাই তারা গড়ে তুলতে চাইছে অসংখ্য আলী আশফাক।