আমার কোনো আক্ষেপ নেই

দারুণ দর্শকপ্রিয় ছিলেন অভিনেতা ড. ইনামুল হক। পালন করেছেন অভিভাবকের ভূমিকা। দেশের নাট্যাঙ্গনে রয়েছে তার অশেষ অবদান। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারের অপ্রকাশিত অংশ তুলে ধরেছেন মাসিদ রণ  

করোনাকালে কীভাবে সময় কাটছে?

পারতপক্ষে ঘর থেকে বের হই না। তবে ঘরে বসে নানা ধরনের কাজ করি। সবচেয়ে বেশি সময় কাটে লেখালেখিতে। ইতিমধ্যে নাট্যকার স্ট্রিন্ডবার্গের তিনটি বইয়ের বাংলা অনুবাদ করে ফেলেছি। এর মধ্যে রয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র নিয়ে লেখা নাটক ‘এরিক দ্য ফোর্টিন’, একক অভিনেত্রীর বয়ান নিয়ে ‘দ্য স্ট্রংগার’ ও প্রেমের নাটক ‘ক্রেডিটার্স’। এখন আন্তন চেখভের তিনটি বইয়ের অনুবাদের কাজ নিয়ে এগোচ্ছি। বর্তমানে ‘আঙ্কেল ভানিয়া’ নামের একটি বই ধরেছি। বেশিরভাগ বইয়ের ইংরেজি নামই থাকবে। দু-একটিতে যুতসই বাংলা নামও দেব ভেবেছি। ইচ্ছে আছে সামনের বইমেলায় সেখান থেকে এক বা একাধিক বই প্রকাশ করার।

জীবন দর্শনের ক্ষেত্রে আপনি খুব স্পর্শকাতর...

প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে কিছু দর্শন থাকা উচিত। দেশ নিয়ে দর্শন, সমাজ নিয়ে দর্শন, পরিবার নিয়ে দর্শন, এমনকি ব্যক্তিগত দর্শন। বিশেষ করে দেশ নিয়ে যে দর্শন তা আমি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। কারণ, আমাদের দেশটি পেতে অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে। স্বাধীনতার আগে আমরা কী চেয়েছিলাম, এই ৫০ বছরে কতটুকু এগিয়েছি, ভবিষ্যতে আর কতটুকু এগোতে পারি এসব বিষয় আমাকে খুব ভাবায়। আমাদের দেশ যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়েছে তা আমি খুব কম দেশেই দেখতে পাই। অনেক বাধা পেরিয়ে এখানে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনো বিদ্যমান। এটি সত্যিই আশার কথা। কারণ, সাংস্কৃতিক চর্চা একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?

আমরা তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট একটা দেশ। ফলে অনেক রকম সমস্যা থাকবেই। তবে গত ১০ বছরে দেশ কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে, দেশের চেহারার কতটা পরিবর্তন হয়েছে তা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? জানি না, বর্তমান প্রজন্ম এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছে? তবে আমরা তো ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানি আমল ও স্বাধীনতাপরবর্তী আমল দেখছি। কখনো এমন উন্নয়ন দেখিনি। তাই বিষয়টা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি।

আপনি এখন মঞ্চ নাটকে সেভাবে নেই...

এক সময় মঞ্চই ছিল ধ্যান-জ্ঞান। প্রচুর সময় দিয়েছি। এখন সরাসরি মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত নেই। বয়স ৭৫ পেরিয়েছে, তাই মঞ্চে যে এনার্জি নিয়ে কাজ করতে হয় তা খুঁজে পাই না। এখন আমার স্ত্রী লাকী ইনাম, দুই মেয়ে হৃদি হক ও পৈত্রী হক, ছোট মেয়ের স্বামী সাজু খাদেম আমাদের নাগরিক নাট্যাঙ্গনের জন্য নিয়মিত কাজ করছে। বিশেষ করে লাকী আর হৃদির জন্য সুবিধা হলো তারা সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গ যেমন নাচ, গান, অভিনয় সবই শিখে এসেছে। সুতরাং কাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তারা ভালো বোঝে। 

ছেড়ে যাওয়া কোন বন্ধুকে বেশি মনে পড়ে?

হুমায়ূন আহমেদ ও হুমায়ুন ফরীদিকে খুব মনে পড়ে। প্রথমজন আমাকে নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বলেই দর্শক আমাকে বৈচিত্র্যময় অভিনেতা বলে থাকেন। আর দ্বিতীয়জনের আর আমার জন্মদিন একই। ফরীদি আমার লেখা ‘প্রতিধ্বনি প্রতিদিন’ নাটকে অভিনয় করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ব্যতিক্রমী প্রেক্ষাপটে রচিত সে নাটকটি তখন খুব সাড়া ফেলে।

এই পর্যায়ে এসে জীবনকে কীভাবে দেখেন?

নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা, একাগ্রতা-এই জিনিসগুলো যদি নিজের মধ্যে ধারণ করা যায় তাহলে সার্থক একটি জীবন পাওয়া যায়। আমিও অল্প বয়স থেকেই এই জিনিসগুলো মূল্যায়ন করেছি এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করেছি। আমার কোনো আক্ষেপ নেই।