পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার

বাজারে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। এতদিন ৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক দিতে হতো। একই সঙ্গে চিনি আমদানিতে থাকা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। গতকাল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি) সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক দিতে হবে না। এছাড়া চিনির উপরও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমানো হয়েছে। আজ (বৃহস্পতিবার) থেকেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।’

এর আগে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন পেঁয়াজ ও চিনির ওপর শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেছিল। পরে পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্য তেলে শুল্ক-কর কমানোর জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে গত সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ভারতের প্রধান প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা নাসিক ও ব্যাঙ্গালোরে অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সম্প্রতি ভারতে পণ্যটির দাম সামান্য বেড়েছে। এ খবরে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম ১৫ দিনের ব্যবধানে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। যদিও গত দুদিন ধরে দাম কমছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পেঁয়াজের আকাশচুম্বী দাম উঠলে এনবিআর পেঁয়াজে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছিল। তখন শুল্ক প্রত্যাহারের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এপ্রিল মাস থেকে আবার পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ পুনর্বহাল করা হয়।

আর এদিকে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি দরে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি কেজি খোলা চিনি ৭৫ টাকা আর প্যাকেটজাত চিনি প্রতি কেজি ৭৬ টাকা দর নির্ধারণ করে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে এ দুটো পণ্যের দাম বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন। এ প্রেক্ষিতে আমদানির মাধ্যম্যে সরবরাহ বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্য দুটো থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করে গত সপ্তাহে এনবিআরে চিঠি পাঠায়। গতকাল বৃহস্পতিবার এনবিআর পেঁয়াজ আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনা শুল্কে পেঁয়াজ আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশে প্রধানত শীতকালীন পেঁয়াজের চাষ হয়। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে লাগানো পেঁয়াজ বাজারে আসে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে। এরপর আরও ছয় মাস বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ থাকে। সেপ্টেম্বর থেকে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক কমে যায়। ফলে দামও কিছুটা বাড়ে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর ৮০ ভাগ স্থানীয় উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হলেও ২০ ভাগ আমদানি করতে হয়। আমদানির সিংহভাগ আসে ভারত থেকে। ফলে ভারতে দাম বাড়লে বা সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়ে এ সময়ে এসে বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে বেশি।

এর আগে পেঁয়াজের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি বাড়িয়েছে। সংস্থাটি সারা দেশে দৈনিক দেড়শ টন পেঁয়াজ ডিলারদের মাধ্যমে প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করেছে। এছাড়া বন্দর থেকে পেঁয়াজ দ্রুত খালাস ও দ্রুত পরিবহনের জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে গত সেপ্টেম্বরে চিনির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে খোলা চিনি প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৭৪ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনি প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৭৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, কোনো ব্যবসায়ী এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে বাজার মনিটরিং কমিটি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা মানেনি। প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা বা তার বেশি দরে বেচাকেনা হচ্ছে। এই পণ্যটির দাম কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করে। তার প্রেক্ষিতে এনবিআর চিনি আমদানিতে থাকা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। এ শুল্ক হার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে।