জাঙ্ক শেয়ার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও গত এক বছরে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার। গত এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শেয়ার দর বৃদ্ধি পাওয়া শীর্ষ ২০ কোম্পানির মধ্যে ১৭টি ‘এ’ ক্যাটাগরির, যেগুলো সাধারণত মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অস্বাভাবিক হারে দর বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌলভিত্তির এসব কোম্পানির শেয়ার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, হয়ে পড়েছে অতিমূল্যায়িত। অবশ্য শেয়ার দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিগুলোর আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা গেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে আসা, ব্যাংক আমানতের সুদহার কমে যাওয়াসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নানামুখী উদ্যোগের কারণে পুঁজিবাজারে উল্লম্ফন দেখা দেয়। অধিকাংশ শেয়ারের দর বাড়ায় গত এক বছরে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৪৮৩৯ পয়েন্ট থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৭২৪৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এ সময় ডিএসইর বাজার মূলধনও বেড়েছে ৪৭ শতাংশ বা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর বাজার মূলধন ৫ লাখ ৮০ হাজার ১১২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। যদিও গত সপ্তাহে কিছুটা অস্থিরতার কারণে মূল্যসূচক ও লেনদেন দুটিই কমে যায়।
গত এক বছরের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময় অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফরচুন সুজ। এই কোম্পানির শেয়ার দর এক বছরে বেড়েছে ৫২৫ শতাংশ। দর বৃদ্ধির দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো লিমিটেড। এই কোম্পানির শেয়ার দরও প্রায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে।
দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় থাকা অপর কোম্পানিগুলো হচ্ছে, ম্যাকসন্স স্পিনিং মিলস লিমিটেড, সালভো কেমিক্যালস, আরডি ফুড, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং লিমিটেড, আরমিট সিমেন্ট, জিবিবি পাওয়ার, মেট্রো স্পিনিং মিলস, সাইফ পাওয়ার, বিডি ফাইন্যান্স, জিপিএইচ ইস্পাত, এমারেল্ড অয়েল, ঢাকা ডায়িং, ন্যাশনাল ফিড মিলস, মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং মিলস ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। এর মধ্যে ঢাকা ডায়িং, এমারেল্ড অয়েল ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ‘জেড’ ক্যাটাগরির। তালিকায় থাকা এসব কোম্পানির শেয়ার গত এক বছরে বেড়েছে ১৬২ থেকে ৫২৫ শতাংশ পর্যন্ত।
২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর জুতা উৎপাদনকারী কোম্পানি ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার দর ছিল ১৫ টাকা ৯০ পয়সা। করোনা সংকটের ধকল ঠিকমতো সামলে উঠতে না পারলেও চলতি বছরের জুন থেকে তরতর করে বাড়তে শুরু করে এর শেয়ার দর। গত বৃহস্পতিবার ফরচুন সুজের শেয়ার দর ৯৯ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৫২৫ শতাংশ।
অবশ্য শেয়ার দর কেন বাড়ল তা জানেন না বলে জানিয়েছে ফরচুন সুজের কোম্পানি সচিব রিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল যেসব তথ্য ছিল, তা ইতিমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর ফরচুন সুজ ২০২১ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে, যার মধ্যে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ। এ সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ৫৯ পয়সা। একই দিনে কোম্পানিটি ২০২১-২২ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকেরও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ২৯ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩ পয়সা। শেয়ার দর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা গেছে।
গত এক বছরে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কোম্পানি ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। করোনায় টিকা আমদানি ও সুরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করে দীর্ঘ এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করে একই গ্রুপের কোম্পানি দুটি। ফলে শেয়ার দরও বাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের ১৪ অক্টোবর ডিএসইতে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার দর ছিল ২৩ টাকা ৪০ পয়সা, যা গত বৃহস্পতিবার ১৩৯ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৪৯৬ শতাংশের বেশি। একই সময়ে বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার দরও ১১৬ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য দ্বিগুণ দর বৃদ্ধির পরও বেক্সিমকো ফার্মা দর বৃদ্ধির শীর্ষ ২০ কোম্পানির তালিকায় স্থান পায়নি।
করোনার মধ্যে হঠাৎ করেই ব্যবসায় বড় ধরনের সাফল্য ধরা দেয় ম্যাকসন্স গ্রুপের কোম্পানি ম্যাকসন্স স্পিনিং মিলস ও মেট্রো স্পিনিংয়ে। বিগত বছরগুলোয় নামমাত্র মুনাফা থাকলেও সর্বশেষ হিসাব বছরে অস্বাভাবিক মুনাফা দেখায় এ দুই কোম্পানি। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা দেখায় কোম্পানি দুটি। ফলে শেয়ার দরও অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। গত ১৪ অক্টোবর ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ের শেয়ার দর ছিল সাড়ে ৬ টাকা, যা গত বৃহস্পতিবার ৩১ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়ায়। এ হিসাবে এক বছরে শেয়ারটির দর বাড়ে ৩৭৮ শতাংশ। একই সময়ে মেট্রো স্পিনিংয়ের শেয়ার দরও বাড়ে ২০২ শতাংশ।
এর বাইরে সালভো কেমিক্যালের শেয়ার দর গত এক বছরে বেড়েছে ৩০৭ শতাংশ। এ ছাড়া আরডি ফুডস ৩০০ শতাংশ, প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স ২৯৮ শতাংশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ২৭৮ শতাংশ, বিকন ফার্মা ২৬৫ শতাংশ, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং ২৪৫ শতাংশ, আরমিট সিমেন্ট ২৩৫ শতাংশ, জিবিবি পাওয়ার ২২৪ শতাংশ, সাইফ পাওয়ার ২০১ শতাংশ, ন্যাশনাল ফিড মিলস ১৬৮ শতাংশ ও মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং মিলস ১৬৪ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি এমারেল্ড অয়েল, ঢাকা ডায়িং ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের দর ১৬২ থেকে ১৮১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।