দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর ক্লোন করে প্রতারকরা তাদেরই পরিচিতদের থেকে নানা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগ ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের একাধিক টিম।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পেশাদার রাজনীতিক, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বিশেষ প্রযুক্তির সহায়তায় ক্লোন করে প্রতারকরা। তারপর সেই নম্বর থেকে কল দিয়ে অনৈতিক সুবিধা চায়। বুঝতে না পেরে অনেকে প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছেন। সম্প্রতি চক্রটির সদস্যরা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের অনেক নেতার কাছে আর্থিক সহায়তা চায়। অনেকে সন্দেহজনক মনে করে সরাসরি পরশের সঙ্গে আলাপ করে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারেন। এ ঘটনায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যানের পক্ষে রাজধানীর বনানী থানায় একটি মামলা করেন ব্যারিস্টার রানা তাজ উদ্দীন খান।
বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানা পুলিশের পাশাপাশি আরও একাধিক টিম প্রতারক চক্রটি শনাক্তে কাজ করছে। আশা করছি, শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত ৯ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর বিকেল ৪টা পর্যন্ত অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে বিভিন্ন জেলার যুবলীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। ফোন পাওয়াদের মধ্যে গাইবান্ধা যুবলীগের সভাপতি সরদার মো. শাহীদ হাসান লোটন, নেত্রকোনা যুবলীগের আহ্বায়ক মাসুদ খান জনি, সুনামগঞ্জ যুবলীগের আহ্বায়ক খায়রুল হুদা চপল, সিলেট মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিক জায়গীরদার, পাবনা যুবলীগের আহ্বায়ক সনি বিশ্বাস ছাড়াও বাইরের অনেকে রয়েছেন।
যুবলীগের নেতারা জানান, তাদের প্রত্যেকের কাছেই যুবলীগের এক কর্মীর চিকিৎসার জন্য টাকা চাওয়া হয়। তবে টাকা না দিয়ে তারা যোগাযোগ করে প্রতারকদের কারসাজির বিষয়ে নিশ্চিত হন।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা যুবলীগের আহ্বায়ক মাসুদ খান জনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যানের নাম যেভাবে ফোনে সেভ করেছি, সে নামেই কল আসে। বলেন, এই জনি ভালো আছো? লাস্ট ২০ ডিজিটের একটি নম্বর থেকে তোমাকে ফোন দেবে, তাকে হেল্প করো। এ কথা বলেই ফোন কেটে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর ওই ডিজিটের ফোন নম্বর থেকে আরেকজন ফোন করে বলেন, যুবলীগের দুঃসময়ের এক কর্মীকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠাতে হবে। আর্থিকভাবে যতটুকু পারেন টাকা পাঠান।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলে ওঠেনÑ কেন, চেয়ারম্যান আপনাকে জানাননি? আমি বললাম, হ্যাঁ জাানিয়েছেন। তবে আপনার পরিচয়টা কী? তিনি পরিচয় দিতে অস্বীকার করলে আমার সন্দেহ হয়। তারপর সরাসরি চেয়ারম্যানকে ফোন করলে তিনি জানান, একই ঘটনা আরও ঘটেছে।’
খুলনায় এ চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ক্লোনের মাধ্যমে ফোন করে টাকা চেয়েছে। গত ৯ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে গাইবান্ধা জেলা যুবলীগের সভাপতি সরদার মো. শাহীদ হাসান লোটনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে ফোন করে। তারপর আরেকটি নম্বর থেকে ফোন করে টাকা পাঠানোর জন্য একটি রকেট নম্বর দেয়। আবার কাউকে কাউকে রকেটের পাশাপাশি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জ যুবলীগের আহ্বায়ক খায়রুল হুদা চপল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যানের ফোন পেয়েই আমি সালাম দিই। তারপর উনি বললেন, তুমি কোথায়? ঢাকা না এলাকায়? এরপর বললেন, যুবলীগের একজন কর্মী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবে। তুমি যা পারো হেল্প করো। এরপর তিনি নিজেই একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে ফোন করেন। তারপর বলেন, তার রকেট নম্বরও আছে। এসব কথা শোনার পর সন্দেহ হয়। তারপর চেয়ারম্যানকে আমি নিজেই ফোন করি। মিটিংয়ে থাকায় তিনি রিসিভ করেননি। পরে আমাদের আইটি নিয়ে কাজ করেন জয়দেব নন্দী, তাকে ফোন করে জানাই।’ তিনি বলেন, ‘শুধু আমাকেই নয়, সিলেট মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদককেও একইভাবে ফোন করা হয় ওই নম্বর থেকে।’ সিলেট মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিক জায়গীরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যানের ফোন পেয়ে রিসিভ করি। কিন্তু তিনি যেভাবে সহায়তার কথা বলেছেন, তাতেই সন্দেহ হয়। পরে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠদের ফোন করে এসব কারসাজি বলে নিশ্চিত হই।’
সতর্ক থাকতে বললেন শেখ পরশ : এদিকে অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশের ভেরিফাইড ফেইসবুকে এ বিষয়ে সতর্ক করে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুবলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সবাইকে এই মর্মে সতর্ক করা যাচ্ছে যে, যুবলীগের চেয়য়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের মোবাইল নম্বর ক্লোনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে ফোন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টাসহ নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে প্রতারক চক্র। দয়া করে কেউ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দেবেন না।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির একটি মোবাইল ফোন নম্বর হুবহু ক্লোন করা যায় না। প্রতারকরা বিভিন্ন ডায়ালার অ্যাপসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নম্বরের কাছাকাছি কোনো নম্বর তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওই নম্বর দিয়ে ফোন করা হলে যে নামে সংরক্ষণ করা হয়, সেটিই দেখাবে। থানা পুলিশের পাশাপাশি আমরাও এই চক্রটি শনাক্তের চেষ্টা করছি।’