কোনো যৌক্তিকতা নেই দীর্ঘদিন মন্দায় থাকা পুঁজিবাজারে গতি ফিরিয়ে আনা বর্তমান এসইসি চেয়ারম্যানের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের পদত্যাগের। তারপরও তার পদত্যাগের গুজব ছড়িয়ে উল্লম্ফনে থাকা পুঁজিবাজারে বড় দরপতন ঘটানো হয়েছে। টানা ছয় কার্যদিবস পর গতকাল সকালে যখন পুঁজিবাজারে স্বস্তির ধারা প্রত্যক্ষ করছিলেন বিনিয়োগকারীরা, দুপুরেই বিভিন্ন মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর বিনিয়োগকারীরাও গুজবের বশবর্তী হয়ে বড় লোকসান এড়াতে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। ফলাফল লেনদেনের শুরুতে ডিএসইর প্রধান সূচকে যে ৮৯ পয়েন্ট যোগ হয়েছিল, দিনশেষে সেখানে উল্টো প্রায় ৭৭ পয়েন্ট হারায়।
অবশ্য পদত্যাগের গুজবে হতাশা প্রকাশ করেছেন এসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত বাজার ভালোই চলছিল। এরপরই আমার পদত্যাগের গুজবে প্যানিক সেল তৈরি হয়, যেটি খুবই অনাকাক্সিক্ষত। বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের আমলে ডিএসইর সূচক প্রায় ৩ হাজার ৪০০ পয়েন্ট বেড়েছে। তাই মাঝেমধ্যে সাময়িক সংশোধন হতেই পারে। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বর্তমান বাজার আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপ বা খাতের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই কেউ চাইলেই দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ক্ষতি করতে পারবে না।
শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একশ্রেণির অসাধু চক্র গত কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। আর এই গুজবের মাধ্যমে দরপতন ঘটিয়ে কম দরে শেয়ার কিনছে চক্রটি। গতকাল বড় পতন হলেও লেনদেন বেশি হয়েছে এই কারণেই। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনের দরপতনে এমনিতেই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের নেতিবাচক সংবাদ বা গুজবে সহজেই প্রভাবিত হচ্ছেন তারা। গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন গুজব ছড়ানোর পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে নিরাপদে থাকতে চাইছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি। গতকাল ডিএসইতে ৬৫ শতাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে। ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে গতকাল দর হারিয়েছে ২৫৪টি, বেড়েছে ৮৭টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৫টির দর। পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল লেনদেন শুরুর ১৫ মিনিটে অধিকাংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে ডিএসইর প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ৮৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সূচকের এই ঊর্ধ্বগতি দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তবে এরপর এসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগের গুজব রটানো হলে বিক্রির চাপ বাড়তে শুরু করে। ক্রয়াদেশও কমে যায়। ফলে দুপুর ১টা থেকে সূচক দ্রুত নিচে নামতে থাকে। দুপুর ২টায় সূচক উল্লম্ফন থেকে বড় পতনে ধাবিত হয়। এ সময় সূচকটি আগের দিনের চেয়ে উল্টো ৮৭ পয়েন্ট কমে যায়। দিনশেষে ৭৬ পয়েন্ট হারিয়ে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৭০২০ পয়েন্টে নেমে আসে। এ নিয়ে টানা সাত কার্যদিবসের পতনে সূচকটি ৩৪৭ পয়েন্ট বা ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হারিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরেই নানামুখী গুজবে বাজারে দরপতন হচ্ছে। এর মধ্যে আইসিবিকে দেওয়া ঋণের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এক্সপোজার লিমিট অতিক্রম করায় তারা শেয়ারবিক্রি করছে, এমন গুজব রয়েছে। এছাড়া নয় কোম্পানির শেয়ার কারসাজি ইস্যুতে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেএমন একটি খবরও বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এসইসির তদন্ত কমিটি নয় কোম্পানির শেয়ার কারসাজির দায়ে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের অনুমোদিত প্রতিনিধিকেও ডেকে পাঠিয়েছে বলেও গুজব রটেছে। তবে এসব গুজবের কোনোটিরই সত্যতা পাওয়া যায়নি। এদিকে পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে এসইসি। ব্যাংকঋণের বাইরে বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, এমন চেষ্টা চালাচ্ছে এসইসি। এ বিষয়ে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বন্ড ইস্যুর সুযোগ দেওয়া হবে, যা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বিনিয়োগ করতে পারবে এবং গ্রাহকদের মার্জিন ঋণ দিতে পারবে। এছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের টাকা দ্রুত বিনিয়োগসহ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের বন্ডে স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে কমিশন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।