সভ্যতার জন্য সুসংবাদ

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী। অন্ধকার যুগ। চারদিকে শিরক-কুফর, অজ্ঞতা-মূর্খতার সয়লাব। মদপান, উন্মাদনা, অসভ্যতা, উৎকোচভোগ, ছিনতাই, রাহাজানি, সম্পদ ও নারী লিপ্সা থেকে শুরু করে কু-প্রবৃত্তির যাবতীয় চাহিদায় মত্ত ছিল কিছু লোক। নির্দয়তা ও আত্মকেন্দ্রিকতা এতটাই প্রবল ছিল যে, নিজ কন্যাকে জীবিত দাফন করত। আর পুত্রকে হত্যা করা হতো এই আশঙ্কায় যে, সে আমার সম্পদের অংশীদার হবে। ওই সময়ে পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি ছিল না, যাদের সার্বিক বিচারে সভ্য বলা যেতে পারে। এমন কোনো সমাজ ব্যবস্থা ছিল না, যাকে নৈতিকতা-উন্নত চরিত্রের বাহন বলা যেতে পারে। এমন কোনো শাসন ব্যবস্থা ছিল না, যা ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন কোনো নেতৃত্ব ছিল না, যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ধারক ছিল। মানবীয় আচার-আচরণের দিকে তাকালে পুরো পৃথিবীতেই বিশৃঙ্খল মনে হতো। তাদের দেখে মনে হতো, এরা পাতালের কোনো কীটপতঙ্গ। মোটকথা, তখন সর্বগ্রাসী তমসায় আচ্ছন্ন ছিল-পুরো পৃথিবী।

আঁধারঘেরা পৃথিবী যখন সুবহে সাদিকের প্রতীক্ষায়, তখন তিনি এলেন আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ হয়ে। সমস্ত পৃথিবী ও মৃতপ্রায় মানবতাকে নতুন জীবন দান করেছে দুনিয়ায় তার আগমন। তিনি এসে আলো-অন্ধকার, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছেন। এই বিভাজনের চেয়ে বড় কোনো বিভাজন নেই। সেই বিভাজন এতটাই দ্রুতগতিতে তিনি টেনে দিয়েছেন যে, মানবেতিহাসে তার কোনো উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আলিফ-লাম-রা। (হে নবী) এটি এমন এক কিতাব, যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর ভেতর নিয়ে আসতে পারো। অর্থাৎ সে সত্তার পথে, যার ক্ষমতা সবার ওপর প্রবল এবং যিনি সমস্ত প্রশংসার উপযুক্ত।’ সুরা ইবরাহিম : ১

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই উম্মতের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসুল পাঠিয়েছেন। যে তাদের সামনে তার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করবে। তাদের পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদের শিক্ষা দেবে কিতাব ও হিকমত। যদিও ইতিপূর্বে তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিপতিত ছিল।’ সুরা জুমুআ : ২

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মানব সমাজের একেকজন সদস্যকে একেকটি মহামূল্যবান সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। মানবতার যে কাঁচামালকে আবর্জনা ভেবে অবহেলা আর অনাদরে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেগুলোকে পরিষ্কার করে কাজে লাগানো ও উপযুক্ত স্থানে ব্যয় করার কথা কারও মনে উঁকিও মারেনি। অজ্ঞতা ও মূর্খতা যাদের বরবাদ করে রেখেছিল। নবী কারিম (সা.) তাদের মধ্যে জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘(হে নবী) আমি আপনাকে বিশ্ব জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ সুরা আম্বিয়া : ১০৭

দাওয়াতের শুরুতেই তিনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও কল্পনাপ্রসূত উপাস্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার শিক্ষা দেন। মানুষের মধ্যে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন, হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা মুখে বলো ও অন্তরে বিশ্বাস করো, আল্লাহ ছাড়া ইবাদত ও আনুগত্যের উপযুক্ত আর দ্বিতীয় কেউ নেই। তবেই তোমরা সফলকাম হবে।

নবী কারিম (সা.)-এর সংস্পর্শ ও শিক্ষার বদৌলতে ধ্বংস প্রায় আরব জাতির মধ্যে এমন আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় যে, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তাদের মধ্যে এমন এমন ব্যক্তিত্ব জন্ম নেন; যারা বিশ্বের ইতিহাসে প্রাতঃস্মরণীয় বিরল ব্যক্তিত্ব ও চির বরণীয় শ্রদ্ধাভাজনের আসন অলংকৃত করেছেন। নবীজি (সা.)-এর আবির্ভাব মানবসভ্যতাকে একটি নতুন জীবন, নতুন জ্যোতি, নতুন শক্তি, নতুন উষ্ণতা, নতুন ইমান-বিশ্বাস, নতুন সংস্কৃতি, নতুন চেতনা ও নতুন জীবনবোধ উপহার দিয়েছেন। ফলস্বরূপ ধ্বংসের প্রস্তুতি নিতে থাকা মানবতা ফিরে পায় তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণ।

অল্প কয়দিন যেতে না যেতেই সভ্য দুনিয়ার সামনে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী মানবসমাজ এসে হাজির হলো। মানব ইতিহাসে যার মতো এমন পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর, সাবলীল ও ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিতীয় আরেকটি সমাজ চোখে পড়ে না। অথচ কিছুকাল পূর্বে এ সমাজের কর্মীরাই নিষ্কর্ম, অথর্ব হিসেবে ভূমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বিস্ময়কর সফলতা পুরো দুনিয়া নিষ্পলক চোখে দেখেছে আর অবাক হয়েছে। সে সময়ে পুরো মানব সমাজকে একটি পরিবারের মতো মনে হতে লাগল। না আরবের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল অনারবের ওপর। না অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল আরবের ওপর। জাহিলিয়াতের নির্ধারিত জাত-পাত, অর্থ, বংশীয় কৌলীন্যের মানদণ্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নতুন একটি মানদণ্ড গড়ে ওঠে, আর তা হচ্ছে তাকওয়া বা আল্লাহ ভীরুতার মানদণ্ড। ইতিহাসের পাতায় মানবতার নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এটাই সেই যুগ, যা ইতিহাসের ললাটে চিরভাস্বর আলোকময় হয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।