পল্লী স্বাস্থ্যসেবা : নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়

করোনাকালে পল্লীবাংলার আর্থসামাজিক পরিবেশ পর্যালোচনায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতির স্বরূপ সন্দর্শনে লক্ষণীয় ছিল যে, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা লাভের অপেক্ষায় থেকে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে নিজেদের তরফে রোগপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। আজ থেকে প্রায় ১৩০ বছর আগে মার্কিন আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১) যথার্থই বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের চিকিৎসক রোগীকে ওষুধ না দিয়ে তাকে শেখাবেন শরীরের যতœ নেওয়া, সঠিক খাদ্য নির্বাচন, রোগের কারণ নির্ণয় ও তা প্রতিরোধের উপায়’। পল্লীতে উচ্চশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক যখন দুর্লভ, শহরে ও গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও সেবা কার্যক্রম যখন বাণিজ্যিকীকরণ মনমানসিকতার হাতে বন্দি, বহুজাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের বেড়াজালে সাশ্রয়ী মূল্যে দেশীয় ওষুধ শিল্প উৎপাদন যখন তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন, চিকিৎসাসেবায় নীতি ও নৈতিকতা যখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তখন আমাদের নিজে নিজের স্বাস্থ্য সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শরণাপন্ন হওয়ার যৌক্তিকতা বেড়ে যায়। বরং করোনাকালে দেখা গিয়েছে পল্লীতে নিজ উদ্যোগে করোনা মোকাবিলা করে, প্রকৃতির প্রতি সদয় সদ্ভাব রেখেই এক ধরনের ইমিউন ক্ষমতা অর্জন করেছে গ্রামের মানুষ।

এডিসন যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা আজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে শরীরের যত্ন, খাদ্যাখাদ্য বিচার ও রোগ ঠেকানোর ব্যাপারে আমাদের আরও যথেষ্ট সচেতন হওয়ার অবকাশ রয়েছে। 

সুস্থ ও সুন্দর জীবন বলতে আমরা প্রকৃতপক্ষে কী বুঝি? একজন মানুষ দৈহিকভাবে (Physically), মানসিকভাবে (Mentally), সামাজিকভাবে (Socially) এবং আত্মিকভাবে (Spiritually) যদি ভালো থাকে বা ভালো বোধ করে তাহলে তাকে পরিপূর্ণ সুস্থ বলা যেতে পারে। তার জীবনযাপন সুন্দর, অর্থবহ, উপভোগ্য, সৃজনশীল, কর্মযোগী হওয়ার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে উপরিউক্ত চারভাবে বা প্রকারে সুস্থ হওয়ার বা থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেউ দৈহিক বা শারীরিকভাবে হয়তো সুঠাম, নীরোগ এবং সুস্থ কিন্তু তার মানসিক অবস্থা, তার পরার্থপরতা, নীতি-নৈতিকতা, ন্যায়নীতি-নির্ভরতা তথা সততা সঞ্জাত সামাজিক অবস্থান বা সুনাম বিতর্কিত তথা প্রশ্নসাপেক্ষ এবং একই সঙ্গে তার আধ্যাত্মিক বা আত্মিক অবস্থা ভালো না হলে ওই ব্যক্তিকে পুরোপুরি সুস্থ বা তার জীবন সুন্দর বলা যাবে না। আবার আধ্যাত্মিকতায় উন্নত, সামাজিকভাবে সুপরিচিত কিংবা মানসিকভাবে শক্তিশালী এমন সুস্থ সবল ব্যক্তি যদি দৈহিক বা  শারীরিকভাবে অসুস্থ অক্ষমতায় আপতিত হয় তাহলে তাকেও সুস্থ বা স্বাস্থ্যবান বিবেচনা করা যাবে না। অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে পুরোপুরি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের অধিকারী হতে হলে দৈহিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিকভাবে সব দিক দিয়ে সবল হতে হবে।

বস্তুত সুস্থ ও সুন্দর জীবনের পূর্বশর্ত হলো দেহ, মন, সামাজিক সুনাম আর আত্মার উৎকর্ষতায় পরিপূর্ণ সুস্থতা। সে জীবন অর্জনের জন্য, সে জীবনযাপনের জন্য সাধনার প্রয়োজন। প্রয়োজন সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের স্বার্থে এ চার পর্ব বা পর্যায়ের প্রতি মনোযোগী হওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। শারীরিক বা দৈহিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে শারীরিক সব অঙ্গের চলৎশক্তি বজায় থাকা এবং কোনো কার্যকলাপ (activities, functions) সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি  না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। শরীর একটি মেশিনের মতো, একে কার্যকর রাখতে প্রয়োজন উপযুক্ত জ্বালানির। এর চলৎশক্তিকে সক্রিয় রাখতে শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যকার পরস্পর প্রযুক্ততায় ও সমন্বয়ে স্বাভাবিক কার্যকারিতা বেগবান রাখতে হবে। অর্থাৎ, শরীরকে সচল রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা  জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১৭-১৯৮৯) প্রায়ই বলতেন, ‘গাড়িকে গতিশীল ও কার্যকর রাখতে বা পেতে এর নিয়মিত সার্ভিসিং দরকার। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য এই যে আমরা গাড়ি খারাপ হলে তারপর গ্যারেজে নিয়ে আসি। নিয়মিত সার্ভিসিং হলে এক ধরনের বেচাইন অবস্থায় মেরামতখানায় নেওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। আমাদের শরীরের অবস্থাও তাই। একে ঠিকমতো যতœ করতে হবে, নিয়মিত চেকআপে রাখতে হবে। শরীরকে রোগবালাইয়ের হাত থেকে অর্থাৎ একে নীরোগ রাখতে সময়মতো এর পরিচর্যা প্রয়োজন।’ মানসিকভাবে সুস্থতার জন্য মনকেও সুরক্ষা দিতে হবে, মনকেও সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে সবার সঙ্গে সহযোগিতা সখ্য সমুন্নত রাখতে হবে, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তার নির্দেশাবলি পালন ও অনুসরণের মাধ্যমে পরমাত্মার প্রতি একাত্ম হতে হবে। সবকিছুই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, একটির অবর্তমানে অপরটি অচল। 

উপযুক্ত ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাস এবং প্রফুল্ল মনই হচ্ছে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি। আসলে আমাদের জীবনে এত দুশ্চিন্তা বা টেনশন থাকে যে, আমরা হাসিখুশি থাকতে পারি না। অথচ কথায় আছে, ক্যানসার যত না কবর ভরেছে তার চেয়ে বেশি ভরেছে টেনশনে। সুতরাং ভালোভাবে বাঁচতে চাইলে মনকে প্রফুল্ল রাখতে হবে। এ জন্য ভালো চিন্তা ও ভালো কাজের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে নিজেকে জড়াতে হবে কোনো সৃজনশীল কাজের সঙ্গে। খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘আপনি যা খান আপনি তা-ই।’

আজকাল অনেক জটিল রোগ আমাদের পিছু নিয়েছে। তার একটা বড় কারণ হলো কৃত্রিম সার ও কীটনাশক বিষ ব্যবহারের এ যুগে খাদ্যের আদি বিশুদ্ধতা অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। তার ওপরে রয়েছে নানা রকম প্রক্রিয়াজাত, ভেজাল মিশ্রিত ও রাসায়নিক উপায়ে সংরক্ষিত খাদ্য যা কোনোভাবেই খাঁটি ও টাটকা খাবারের সমকক্ষ হতে পারে না। ফ্রিজে দীর্ঘদিন রাখা খাদ্যও ক্ষতিকর। সুস্থ জীবকোষের জন্য বিশুদ্ধ রক্ত দরকার যা শুধুমাত্র খাঁটি ও টাটকা খাবার থেকেই তৈরি হয়। এ সমস্ত ভেজাল ও রসায়নমিশ্রিত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে দেশে নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নীতিনির্ধারক মহলে, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো খাবার, অপরিপক্ব খাদ্যকে অসময়ে পাকানোর ব্যবসায়িক দুষ্টবুদ্ধি দ্বারা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য দারুণ ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলছে। অজৈব সার ও রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অধিক পরিমাণে হাইব্রিড খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে ঠিকই, বর্ধিত চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্বাভাবিকভাবে এ জন্য আর্থিকভাবে নমিনাল টার্মে লাভবান হচ্ছে জিডিপি, অর্থনীতি, কিন্তু এসব খাদ্য গ্রহণে যে জটিল রোগের উদ্ভব ঘটছে, ব্যক্তি ও সামষ্টিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে তার শুমার ও তুলনা করলে দেখা যাবে প্রকারান্তরে স্বাস্থ্য বাজেট ব্যয় বৃদ্ধির মাত্রা ও প্রবণতাই  বেশি।  

খাদ্যের একটি গুণগত উপাদান হচ্ছে আঁশ, যা অন্ত্রনালি পরিষ্কার রাখে বলে ক্যানসার প্রতিরোধ সহজ হয়। গমের আটায় আঁশ আছে, ময়দায় নেই। ময়দা একটি প্রক্রিয়াজাত মৃত খাদ্য যা কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্যানসারের সহায়ক। এ রকম আরেকটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য হচ্ছে চিনি যা অনেক মারাত্মক রোগের কারণ। এটি রক্তের ঘনত্ব বাড়ায় এবং হাড় পর্যন্ত ক্ষয় করে। সুতরাং ময়দা ও চিনির তৈরি খাদ্য পুরোপুরি বর্জন করা ভালো। সেই সঙ্গে তেল, লবণ ও মসলা নামমাত্র পরিমাণে ব্যবহার করা উচিত। আমরা চায়ের সঙ্গে দুধ ও চিনি মিশিয়ে চায়ের ঔষধিসুলভ উপকারিতাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হই। চীন ও জাপানে চা-কে ওষুধ জ্ঞানে ভক্তি সহকারে সরাসরি (দুধ-চিনি ছাড়া) পান করা হয়। 

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি কল্যাণমুখী অবয়বে প্রতিষ্ঠা পায়নি। এ অবস্থার পেছনে নানা কারণ রয়েছে, যা দূর করতে সরকারও সচেতন ও সক্রিয়, তবে  জনগণেরও রয়েছে অল্পবিস্তর দায়িত্ব ও রোগপ্রতিরোধ প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা। ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’ কথাটি যেন আমরা ভুলে না যাই। আমরা অনেকে অনেক অসুখে ভুগি। অসুখ জটিল হলে রোজগারি মানুষের রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের অন্য কেউ এ রকম অসুস্থ হলেও অনেকের পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চিত ও অসহায় পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া বিচিত্র নয়।

তবে এ পরিস্থিতি অনিবার্য নয় যদি আমরা সঠিক নিয়ম-নির্ভর হই। যেহেতু প্রকৃতি হচ্ছে এমন নিয়মের রাজ্য যেখানে রোগের সঙ্গে লড়াই করার জন্য প্রতিটি প্রাণীর দেহেই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে, সেহেতু এটিকে ঠিক রাখতে প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। অধিকাংশ অসুখই হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে এ নিয়ম ভাঙার ফল। দেখা গিয়েছে যে, হাজারো রোগের মূল কারণ স্থূলতাকে এড়াতে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, যা মূলত তেল-চর্বি-চিনি-ময়দাযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করে প্রকৃতিজাত সুষম খাবার গ্রহণ; কারণ ভেজালযুক্ত, বিষ মেশানো ও বাসি-পচা-নোংরা খাবারই আমাদের একমাত্র শত্রু নয়, ধূমপান ও অন্যান্য পন্থায় তামাকসহ সব মাদক সেবন পরিত্যাগ, বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম, প্রয়োজনীয় কায়িক পরিশ্রম, অ্যাকিউপ্রেশার এবং নানা রকম লোভ ও দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলার মতো মানসিক শক্তি অর্জনের জন্য মনঃসংযোগ বা ধ্যান অভ্যাস করে ও মনের গভীরে জমে ওঠা দুঃখের কথাগুলো সহানুভূতিশীল ও বিশ্বস্ত কাউকে বলতে পেরে নীরোগ থাকা যায় কিংবা কঠিন অসুখ হলেও চিকিৎসার পাশাপাশি এসব নিয়ম মেনে রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com