শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহনশীলতা

কয়েক দিন আগের কথা। আশ্বিন মাসের শেষ দিন। বেশ গরম আবহাওয়া। দুপুরের ব্যস্ত ঢাকার রাজপথ। হুড়মুড় করে ভিড় ঠেলে এক যুবক উঠলেন বাসে। এসেই বাসে থাকা ফ্যানটি তার দিকে ঘুরিয়ে ধরে থাকলেন একা একা ঠা-া বাতাস উপভোগের জন্য। এদিকে অন্য যাত্রীরাও গরমে হাঁসফাঁস করছেন। সিটে বসা একজন অনেকটা আবদারের সুরেই বললেন, ভাই! ফ্যানটা ঘুরুক। সবাই মিলে বাতাস খাই। কিন্তু দাঁড়ানো যুবকটি নির্বিকার, একটু পর এক কথায়-দুই কথায় বেশ হইচই কারবার।

শুধু এমন দৃশ্য নয়। কখনো কখনো বাসে দুজন যাত্রী জানালার গ্লাস লাগানো কিংবা খোলা নিয়ে নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হন। ঝগড়া করেন- কে বাসে আগে উঠবে তা নিয়ে। এসব ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে মানুষের ভেতরে সহনশীলতার অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। না হলে এসব তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কখনোই ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হতো না। একই পাড়ায় দুজন প্রভাবশালী থাকলে তাদের মধ্যে দেখা যায় বিরোধ। এগুলো হচ্ছে সহনশীলতার অভাবে। সহনশীলতার অভাবে কোনো কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। যে রাজনীতি মানব কল্যাণে হওয়ার কথা তা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছে। রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীরা পরস্পরের প্রতি সহনশীল হলেই কেবল দেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে।

পবিত্র কোরআনের ভাষ্যমতে, মানুষ যখন আল্লাহ থেকে বিমুখ হয়, তখন আল্লাহ তাদের হিতাহিতজ্ঞান লোপ করেন। ফলে তাদের দ্বারা আত্মঘাতী ও হিংসাত্মক কাজ সংঘটিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদের কথাও ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ -সুরা হাশর : ১৯। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয়ো না। নতুবা আল্লাহ তোমাদের এমন কাজের কথা ভুলিয়ে দেবেন, যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ -তাফসিরে ইবনে কাসির

মানুষের যখন হিতাহিতজ্ঞান লোপ পায়, তখন একটি অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! মানুষের সামনে এমন একসময় আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে কী অপরাধে সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে, কী অপরাধে সে নিহত হয়েছে।’ -সহিহ মুসলিম : ২৯০৮

বাহ্যিকভাবে মানুষের মধ্যে যেমন নানা অমিল রয়েছে তেমনি চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। এ কারণে মানুষের একে অপরের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। এ অবস্থায় অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি ও তা বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি সহনশীলতা। সহনশীলতা মানে অন্যের চিন্তা-ভাবনা, রীতিনীতি, চলাফেরা, ধারণা ও সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে শেখা। পৃথিবীতে কোনো একটা কাজ কিংবা কোনো একটা সমস্যার সমাধান বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে এমনকি জীবন সম্পর্কেও মানুষের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্যের মতামতকে মর্যাদা দিতে পারা, সেটা শোনা এবং মেনে নিতে পারাই হলো- সহনশীলতা।

জীবনকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে সহনশীলতা অপরিহার্য। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি ও উন্নতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই। সাধারণত সহনশীলতার অভাবে নানা সমস্যা দেখা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ তৈরি হয়। সহনশীলতার অভাবে পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যেও ঝগড়া-বিবাদ বা হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে, সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। সুস্থ পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহনশীলতার ঘাটতি দেখা দিলে বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও বিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কারও সমস্যাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে না। যেসব পরিবারে সহনশীলতার চর্চা নেই সেসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা সহজেই ঘরের ভেতরের ও বাইরের জীবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তারা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে পড়ে।

পবিত্র ইসলাম ধর্ম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়সহ সব ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। ইসলাম ধর্ম পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেমন স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান ও ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। এ কারণে রাজনৈতিক, আইনগত, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্রে সহনশীলতার পথ অবলম্বন করা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। সহনশীলতা মানুষকে শেখায় কী করে অন্যের মতামত বা আচার-আচরণ সহজভাবে গ্রহণ করতে হয় এবং ভিন্নধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সহানুভূতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।

সামাজিক জীবনে নানা কাজকর্মে বিভিন্ন বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসতেই পারে, সে কাজটি যদি হয় মহৎ, তাহলে সব বাধা ডিঙিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতা সহকারে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কেউ যদি বাধা-বিপত্তির কারণে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে তাহলে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। 

ইসলাম ধর্ম হচ্ছে শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম। ইসলামের সুমহান শিক্ষা হচ্ছে, প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ক্ষমা করা এবং মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া। এ কথা ঠিক যে, সহনশীলতা হচ্ছে- ইসলামের একটি মৌলিক নীতি। তবে ইসলাম ধর্ম অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরোধী। সহনশীলতার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজের মানুষ সহনশীল হলে অপরাধের ঘটনা কমবে।

দুঃখজনকভাবে বর্তমানে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। সহনশীলতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সহকর্মীদের মধ্যে সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, প্রতিশোধ নেওয়ার মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। আর কর্মক্ষেত্রের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক সুস্থ সম্পর্কের ওপর অশুভ প্রভাব ফেলছে। একপর্যায়ে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইসলাম ধর্ম সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করে না।

সব ক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা। সহনশীলতা না থাকলে পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অনুভূতি কাজ করে না। বর্তমানে লক্ষ করা যাচ্ছে, খুবই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বড় ধরনের হানাহানি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু একটু সহনশীল হলেই তা ঠেকানো যেত। সহনশীলতার অভাবে এসব হচ্ছে- যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত, পরস্পরের প্রতি আরও বেশি সহনশীল হওয়া এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখা।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক