মসজিদে করণীয়-বর্জনীয়

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদ। আর সর্বনিকৃষ্ট স্থান বাজার। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মুসল্লিরা মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ বিভিন্ন ইবাদতে মগ্ন থাকেন। মসজিদকে মুমিনরা অত্যন্ত ভালোবাসেন, মসজিদের সঙ্গে মুমিনের যেন আত্মার সম্পর্ক। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সাহাবায়ে কেরামরা মসজিদে প্রবেশ করলে অনেক সময় অবস্থান করতেন আর বাজারে গেলে খুব জলদি জলদি ফিরে আসতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে থাকে সে আরশের ছায়ায় স্থান পাবে।’

মসজিদে প্রবেশের আদব : মসজিদে প্রবেশের জন্য যেমন তাকিদ দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি মসজিদের আদব রক্ষা করার জন্যও হাদিসে তাকিদ এসেছে। মসজিদে প্রবেশের সময় প্রথমে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়ে নেওয়া। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পড়া। অতঃপর মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়া আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিক।

প্রবেশের সময় মসজিদে ডান পা আগে রাখা ও মসজিদে প্রবেশ করে ইতিকাফের নিয়ত করা। অজুসহ পাক-পবিত্র অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা সুন্নত। মসজিদে ধীর-স্থিরতার সঙ্গে গমন করা। রাকাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় তাড়াহুড়া করে দৌড়ে যাওয়া ঠিক নয়। হজর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নামাজে অবশ্যই ধীর-স্থিরতার সঙ্গে আসবে। যতটুকু পাবে, আদায় করবে। আর যতটুকু ছুটে যাবে, পূর্ণ করবে।’ সহিহ বোখারি : ৬০৯

মোবাইল নিয়ে সতর্কতা : বর্তমানে মানুষ মসজিদের আদব পালনের ক্ষেত্রে অনেক অমনোযোগী, অধিকাংশ মানুষ মসজিদে প্রায়ই শোরগোল করে, এতে মসজিদের সম্মান ও মর্যাদার বরখেলাপ হয়। নবী করিম (সা.) বলেন, বাজারের হট্টগোল থেকে বেঁচে থাকো এবং মসজিদকে দুনিয়াবি কথাবার্তা দ্বারা বাজারের সাদৃশ্য করো না। বলতে কষ্ট হয়, মসজিদে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখন অসহনীয় ও অমার্জনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নামাজের সময় মোবাইলের রিংটোনের কারণে ইবাদতের পরিবেশ বিঘিœত হয়। অনেক সময় তা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই মসজিদে প্রবেশের আগে মোবাইল ফোন বন্ধ করা উচিত। ভুলবশত যদি মোবাইল খোলা থাকে আর নামাজরত অবস্থায় রিংটোন বেজে ওঠে তাহলে এক হাত ব্যবহার করে বা নিজ নামাজ ছেড়ে দিয়ে হলেও অপর মুসল্লিদের কথা ভেবে হলেও মোবাইল বন্ধ করে দিতে হবে। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘কেউ কোনো ব্যক্তিকে (চিৎকার করে) মসজিদে হারানো বস্তু অনুসন্ধান করতে শুনলে সে যেন বলে, আল্লাহ তোমাকে ওই বস্তু কখনো ফিরিয়ে না দিন। কারণ মসজিদ তো এ কাজের জন্য নির্মাণ করা হয়নি।’ সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৩

বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, মসজিদ আল্লাহর ঘর, ইবাদত-বন্দেগির জায়গা। মুসলমানমাত্রই মসজিদের সম্মান ও পবিত্রতা বজায় রাখবে। মসজিদের শিষ্টাচারকে কলুষিত করে, এমন কোনো কাজ করবে না। সুতরাং মোবাইলের বিষয় অধিকতর সতর্কতা কাম্য।

নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত : নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করা একদমই উচিত নয়। এই সম্পর্কে নবী করিম (সা.)-এর একটি হাদিস আছে যার সারমর্ম এই, তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, যদি তোমরা নামাজ আদায়কারীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার গোনাহ সম্পর্কে জানতে তাহলে ৭০ হাজার বছর অপেক্ষা করতে তার পরও নামাজের সামনে দিয়ে যাতায়াত করতে না। নামাজির সামনে দিয়ে চলাচল করতে হলে সুতরা স্থাপন করে নেবে। নামাজ পড়ার জন্য কোনো বস্তুর আড়ালে দাঁড়ালে তাকে সুতরা বলা হয়।

কেউ যদি অজ্ঞতাবশত নামাজি ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করে তাহলে তাকে হাত দিয়ে কিংবা একটু উচ্চৈঃস্বরে তাসবিহ পড়ে সতর্ক করা যাবে। তবে নামাজি ব্যক্তির জন্য এমন না করাই উত্তম। আল বাহরুর রায়েক : ২/১৮

নিষেধ ও অপছন্দনীয়

কোরআন-হাদিস ও ইসলামের বিধিবিধানের আলোকে মসজিদে নিষেধ ও অপছন্দনীয় কাজগুলো হলো

কাঁচা পেঁয়াজ, রসুন (অনুরূপ দুর্গন্ধজাতীয় জিনিস) খেয়ে মসজিদে যাওয়া। অর্থাৎ মুখে অথবা অন্য কোনোভাবে শরীরে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ না করা। এতে করে অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হয়। সহিহ বোখারি

মসজিদে থুতু ফেলা। সহিহ বোখারি

মসজিদে বসে অহেতুক দুনিয়াবি কথাবার্তায় মশগুল থাকা, যদিও তা বৈধ হয়। বায়হাকি

মসজিদে কবিতা পাঠ করা (তবে শরিয়তসম্মত কবিতার কথা ভিন্ন)। তিরমিজি

মসজিদে বেচাকেনা করা, ব্যবসা-বাণিজ্য করা। ইবনে মাজাহ

জুমার দিনে নামাজের আগে গোল হয়ে বসে চক্র বানানো। তিরমিজি

বিনা প্রয়োজনে অহেতুক মসজিদে ঘুমানো।  মসজিদে হই-চই, ঝগড়া, উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা, অন্যের ধার-প্রাপ্তি চাওয়া। সহিহ বোখারি

নাপাক ও অপবিত্র অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা। ফাতাওয়া শামি

মসজিদের কোনো অংশে কাউকে কবর দেওয়া। কবরস্থানে মসজিদ বানানো। সহিহ বোখারি

মসজিদ নিয়ে পরস্পরে অহংকারে মেতে ওঠা। আবু দাউদ

মসজিদে পশু জবাই করা, কোরবানি করা, প্রস্রাব-পায়খানা করা, গোসল করা ও মৃতকে গোসল দেওয়া। ইবনে তাইমিয়্যাহ

মসজিদে যেকোনো বিদআতি কাজ করা। মসজিদের ভেতরে, দরজায় বা তার কাছে অবস্থান করে এমন কিছু করা যাবে না যা মসজিদে অবস্থানরত মুসল্লির নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ ও তালিমে বিঘœ সৃষ্টি হয়।

মসজিদে কারও জন্য কোনো স্থান বা কামরা নির্দিষ্ট করা জায়েজ নেই। যদি একান্ত প্রয়োজনে কামরা বানাতেই হয়, তাহলে মসজিদের এমন স্থানে তা বানানো উচিত; যেখানে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে না। যেমন সিঁড়ির নিচে, মসজিদসংলগ্ন কোনো স্থানে, বারান্দায় ইত্যাদিতে।

যে মসজিদে আগে উপস্থিত হয়ে মসজিদের যেকোনো অংশে অবস্থান করে নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, তালিম, ইতিকাফ কিংবা অনুরূপ আমল করতে থাকল। এমতাবস্থায় তার আমল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই স্থানে অবস্থানের তিনি হবেন বেশি হকদার, যেহেতু তিনি আগে এসেছেন। তাই কারও জন্য উচিত হবে না, ওই ব্যক্তিকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে বসে যাওয়া। কেননা নবী করিম (সা.) কোনো ব্যক্তিকে তার বসার স্থান থেকে উঠিয়ে দিতে নিষেধ করেছেন। ওই ব্যক্তি যদি অজু করতে যান তাহলেও তিনি ওই স্থানের অধিক হকদার হবেন। কেননা হাদিসে আছে, ‘কোনো ব্যক্তি তার স্থান থেকে উঠে গিয়ে পুনরায় ফিরে এলে সেই হবে ওই স্থানের বেশি হকদার।’

যেসব কাজ বৈধ

নামাজ আদায়, তাসবিহ-তাহলিল, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া-দরুদ ও খুতবা ইত্যাদি। মসজিদ তো এসব কাজের জন্যই নির্মাণ করা হয়।

কোরআন, হাদিস ও প্রয়োজনীয় মাসয়ালাসমূহ শিখা এবং শিক্ষা দেওয়া। ইবনে মাজাহ

হাদিসে এই বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে মসজিদে ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র করা ওয়াজিব। যেমন মক্তব, মাদ্রাসা ইত্যাদি। তবে মসজিদে ছাত্রাবাস করা উচিত নয়। যেমন ছাত্রদের নিয়মিত সেখানে রাত্রিযাপন, ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া, গোসল করা ইত্যাদি। যেমনটি ঘর-বাড়িতে হয়ে থাকে। এরূপ বর্জন করা উচিত। কেউ কেউ বলেছেন, অন্যত্র জায়গা না থাকলে ওজর হিসেবে তা করা যেতে পারে।

দ্বীনি জলসার (তাফসির মাহফিল, তালিম, কোরআন শিক্ষার আসর ইত্যাদি) জন্য একত্র হওয়া, গোল হয়ে বসা। সহিহ বোখারি

কোনো অভাবী ব্যক্তির (বা ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের) জন্য সাহায্য চাওয়া, কাউকে সদকা দেওয়া। আবু দাউদ

মসজিদে পানাহার করা। তবে কখনো কখনো, সর্বদা এরূপ করা অনুচিত। অনুরূপভাবে মসজিদে কারও দাওয়াত গ্রহণ করা, কাউকে খাবারের দাওয়াত দেওয়াও বৈধ। ইবনে মাজাহ

মসজিদে ঘুমানো। যদিও সে যুবক হয় (সহিহ বোখারি)। অধিকাংশ আলেম মসজিদে ঘুমানো জায়েজ বলেছেন। যেহেতু এ ব্যাপারে বহু সহিহ হাদিস রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘুমানোর পক্ষে। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, যার ঘর নেই সে ঘুমাবে, কিন্তু যার থাকার জায়গা আছে সে ঘুমাবে না। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, মুসাফির মসজিদে ঘুমাতে পারবে, এ ছাড়া অন্য কারও প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে না ঘুমানোই উত্তম।

উল্লেখ্য, মসজিদের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা মসজিদে শালীন পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা হলে মুসাফির বা অন্য কাউকে মসজিদে রাত্রিযাপনে অনুমতি না দেওয়া দোষণীয় নয়।

অস্ত্র নিয়ে মসজিদে প্রবেশ বৈধ। তবে খেয়াল রাখতে হবে, অস্ত্রের দ্বারা কোনো মুসলিম যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হন। সহিহ বোখারি

মসজিদে দেনা পরিশোধের জন্য তাগাদা দেওয়া ও চাপ সৃষ্টি করা, কয়েদি বা দেনাদারকে মসজিদের খুঁটিতে বেঁধে রাখা। সহিহ বোখারি

মসজিদে সম্পদ, মালামাল বা কোনো কিছু বণ্টন করা, মসজিদে বিচার-ফায়সালা করাও বৈধ। সহিহ বোখারি

যুদ্ধাহত, রোগী (অন্যত্র জায়গা না থাকলে) ও রমজান মাসে ইতেকাফকারীর জন্য মসজিদে তাঁবু স্থাপন করা, মসজিদে চিত হয়ে পা প্রসারিত করে বা এক পায়ের ওপর আরেক পা রেখে শোয়া জায়েজ। সহিহ বোখারি

মসজিদের জন্য খাদেম নিযুক্ত করা, প্রয়োজনবোধে মসজিদে তালা লাগানো এবং মসজিদে পুরুষদের প্রবেশের দরজা ছাড়াও নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ রাখা জায়েজ। সহিহ বোখারি

মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে শরিয়তের দিকনির্দেশনা দেওয়া, হালাল-হারাম ব্যবসার ঘোষণা, কিংবা মসজিদে এমন কবিতা পাঠ করা, যাতে ইসলামের বড়ত্ব ও কাফেরদের যুক্তিখ-ন নিহিত থাকে। সহিহ বোখারি

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময়

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় প্রথমে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়া। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পড়ে এই দোয়া পড়া আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিনফাদলিক। মসজিদের বাইরে বাম পা আগে রাখা ও অতঃপর প্রথমে ডান পায়ে জুতা পরা। তারপর বাম পায়ে পরা। ইবনে মাজাহ

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় হাত থেকে মাটিতে জুতা আস্তে ফেলা। অনেক মুসল্লিকে দেখা যায়, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় এমন জোরে জুতা ফেলেন কিংবা মসজিদে ঢুকে বাক্সে এমনভাবে জুতা রাখেন, তাতে বিকট শব্দ হয়। এতে নামাজরত মুসল্লিদের নামাজের মনোযোগ নষ্ট হয়। জুতার ময়লা বা ধুলাবালি পাশের মুসল্লির গায়ে গিয়ে লাগে।

এটা ঠিক নয়।