আমরা লজ্জিত! এই কথাটা ভাঙা প্রতিমা, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, লুট হয়ে যাওয়া দোকানপাটের সামনে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকা, নিহতদের স্বজন কিংবা আহত লাঞ্ছিত মানুষের মনে কি কোনো আলোড়ন তোলে? আপনারা ভয় পাবেন না এই কথাটা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যত উচ্চকণ্ঠে বলুন না কেন, তা কি নিপীড়িত মানুষের মনে ভরসা জাগায়? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এই কথাটা সম্ভবত ইদানীং বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ, যার উপস্থিতি বাস্তবে নেই। অনেকেই বলতে ভালোবাসেন বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। বাস্তবে যা পরিণত হয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বাসীদের জন্য শঙ্কার দেশ।
গত কয়েক দিনের ঘটনায় আতঙ্কিত, অপমানিত, লাঞ্ছিত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, উত্তেজিত মুসলমান সম্প্রদায়ের একটা অংশ আর লজ্জিত গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ। পূজামণ্ডপে পাওয়া গেল কোরআন শরিফ আর তারপর শুরু হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নানামুখী হামলা। কেউ একবার ভাবতেও চাইল না কীভাবে পূজামণ্ডপে এলো কোরআন শরিফ? কেউ নিশ্চয়ই রেখেছিল সেখানে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি এমন যে সনাতন ধর্মের বা হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার সাহস পাবে? অথবা তাদের প্রয়োজনটাই বা কী? এর ফলে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ক্রোধ তৈরি হবে তার পরিণতি কী হতে পারে তা ধারণা করার মতো বিবেচনা তো তাদের আছে? প্রতি পদে পদে কত সতর্ক থাকতে হয় যাদের তারা এই ভুল কি করতে পারেন? অন্যদিকে কোনো সাধারণ মুসলমান কি তাদের পবিত্র কোরআন পূজামণ্ডপে মূর্তির পায়ের কাছে রাখতে পারেন? কিন্তু থানার কর্তা কোরআন শরিফ ছিল বলে দেখিয়েছে। তারপর উত্তেজিত মুসলমানদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যানারে কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মন্দির, বাসাবাড়ি, দোকানপাটে হামলা হলো। সাম্প্রদায়িক হামলায় মৃত্যু এবং হামলা ঠেকাতে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর খবর সবাই জানে।
সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শুরুটা কবে হয়েছিল সে ইতিহাস না হয় নাই বা মনে রাখি, তবে এবারের শুরুটা হয়েছে কুমিল্লার নানুয়ারদিঘির পাড়ের এক পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং শেষ কোথায় হবে জানা নেই। ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ প্রায় ১৩ বছর ধরে। তাদের সম্পর্কে ধারণা তারা নাকি অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু তাদের সময়কালে তো দেখা যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক হামলার বিরাম নেই। প্রতিটি ঘটনার পর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা দৃঢ়কণ্ঠে বলছেন, কঠোর হাতে এসব দমন করা হবে, ছাড় পাবে না কেউ। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে সবাই। ক্ষতি যাদের হয়েছে তারা পাচ্ছে না ভরসা। ভরসা পাবেন কার কাছে। ক্ষমতাসীন দল, পুলিশ প্রশাসন সবার ভূমিকা দেখেছেন তারা। ফলে মামলা করতেও ভয় পাচ্ছেন এবং আতঙ্কে আছেন আরও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার।
যারা হামলা করেছে এবং যাদের ওপর হামলা হয়েছে সবাই চেহারায় মানুষ। আক্রান্তদের নিপীড়িত মানুষ বললেও আক্রমণকারীদের কাজটা কি মানুষের মতো হয়েছে? যেকোনো সাম্প্রদায়িক আক্রমণের পরপরই একটা সাধারণ কথা প্রায় সবাই বলে থাকেন, কোনো প্রকৃত মুসলমান এ ধরনের কাজ করতে পারেন না। কথাটা গভীর বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ কথাটা যত জোর দিয়ে বলা হয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কিন্তু ততটা জোরের সঙ্গে করা হয় না। এখন পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বা কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ মিছিল সমাবেশ করা হয়েছে বলে জানা নেই। অনেকেই কোরআন শরিফ এবং হাদিস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবিক বোধ জাগানোর চেষ্টা করেন। তাদের সব আন্তরিকতা সত্ত্বেও কেন সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ হচ্ছে না সে বিষয়টিও ভাবা উচিত। নিজের ধর্ম ছাড়া বাকি সব ধর্ম নিকৃষ্ট, নিজের সম্প্রদায় ছাড়া বাকি সবাই নিচুস্তরের এ রকম কথা যদি সব সময় শুনতে থাকে তাহলে সে বৈচিত্র্য কিংবা পার্থক্য বুঝবে কীভাবে?
যারা উন্মত্ত আবেগে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করেছেন তারা একবারও কি ভেবেছেন এ ধরনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া শুধু নিজের দেশেই নয় পাশের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক আবেগে আশ্রয় দেওয়া মুসলমান রোহিঙ্গারা এখন দেশের বোঝা। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও তাদের দায় কোনো মুসলিম দেশ তো নেয়নি। মুসলমান বলে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ভাই বলে কি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে? বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন অজুহাত পেয়ে গেলে তা কি ভারতের মুসলমানদের জন্য ভালো কোনো খবর নিয়ে আসবে? সৌদি আক্রমণে প্রতিদিন ইয়েমেনে যারা মৃত্যুবরণ করছেন তারা কি মুসলমান নন? গত দুই জুমায় মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে আফগানিস্তানে যারা মৃত্যুবরণ করলেন তারাও তো মুসলমান। তাদের মারছে কারা? সংখ্যালঘুরা পৃথিবীর সব দেশেই কেন নিপীড়িত। যারা সংখ্যায় বেশি তাদের তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাহলে কি সংখ্যালঘুর সম্পদের ওপর লোভ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়?
এবার কতটা মন্দিরে হামলা হয়েছে, কত দোকানপাট ভাঙা হয়েছে, কত বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এগুলো সংখ্যা দিয়ে বলা যাবে। অতীতের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনাও করা যাবে কিন্তু তাতে নিপীড়িতরা কতটুকু স্বস্তি পাবেন? সংখ্যা দিয়ে সম্মান, মর্যাদা, ভালোবাসা কিংবা ভয়, অপমান কি প্রকাশ করা যায়? কিংবা পরিমাপ করা যায় কি মর্মবেদনা! পুড়িয়ে দেওয়া বসতভিটায় বসে যারা আহাজারি করে বলছেন, ভগবান, আমরা কী দোষ করেছিলাম? কেন আমাদের সব শেষ করে দিল? এখন আমরা কোথায় থাকব, কী করব, কী খাব? পীরগঞ্জের তারা রানির মতো এমন অনেকের মর্মস্পর্শী কান্নার শব্দ বাতাসে ভাসছে, সে কান্না শোনার মনটা কি হারিয়ে গেল? যদি হারিয়ে যায় তাহলে যে হেরে যাচ্ছে মনুষ্যত্ব!
কোরআন শরিফের অবমাননা হয়েছে বলে তার প্রতিকার করতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে অনেকে। কেউ কেউ আবার নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে আগুন দিয়েছে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঘরে। এতে তো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না, শক্তি দেখানো হয় মাত্র। এই সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার আগুনে ভস্মীভূত হয় মানুষের প্রতি মানুষের ভরসা আর ভালোবাসা। হামলায় শুধু মন্দির, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙেনি ভেঙেছে আস্থা ও বিশ্বাস। কে করেছে তা নিয়ে বিতর্ক চলছে, চলবে বহুদিন। এর মধ্যেই আবার নতুন ঘটনা ঘটবে, নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হবে, তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হবে। কোন সরকারের আমলে কতটা হামলা হয়েছে সেই খতিয়ান তুলে ধরা হবে। অমুক সরকারের আমলে হয়েছে, ফলে বর্তমান সরকারের আমলের কথা বলার আগে সেই ঘটনার বিচার হতে হবে। এই পালটাপালটি কথার চাপে চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের কান্না। উদাস চোখে তাকিয়ে মৃদুকণ্ঠে বৃদ্ধা মা যে প্রশ্ন করেছিল, তা কি তার প্রশ্ন নাকি গভীর বেদনার প্রকাশ! সেই বেদনা বা প্রশ্নের উত্তর কি কেউ দিতে পারবেন? তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কি মানুষ নই? আমাদের কি ধর্মীয় অনুভূতি নেই? আমরা কি এ দেশে কেউ নই? আমরা কি থাকতে পারব না? আমাদের চোখের জলের কোনো দাম নেই?
১৯৪৬-এর ক্যালকাটা কিলিং, ১৯৫০-এর দাঙ্গা, ১৯৬৪-এর দাঙ্গাকে পেছনে রেখে দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে নেমেছিলেন সবাই। কথা ছিল দেশ স্বাধীন হলে সবাই নাগরিক হিসেবে সমান মর্যাদা পাবেন। ধর্ম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় কিন্তু রাষ্ট্র হবে সব মানুষের। রাষ্ট্রের একটাই ধর্ম থাকবে তা হলো সবার মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু যে সংবিধান প্রণয়ন করা হলো তা প্রথমে হলো বাঙালির তারপর রাষ্ট্রটাও আর নিরপেক্ষ থাকল না। রাষ্ট্রের ধর্ম হলো ইসলাম। দিনে দিনে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন নাগরিকের চেয়ে ভোটার, জীবনের চেয়ে জমি, সম্মানের চেয়ে সম্পদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রদায়িক হানাহানির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এত আত্মত্যাগ সবকিছু কি ব্যর্থ হতে পারে ক্ষমতার মত্ততায় আর গদির নেশায়! হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে অর্থাৎ হাজার হাজার মানুষ হামলা করেছে। তারা একত্র হলো অথচ পুলিশ প্রশাসন জানতেও পারল না এ কি হতে পারে? প্রশাসনের ব্যর্থতা আর মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া পুলিশের কি কোনো জবাবদিহি হবে না? ভেঙে দেওয়া মন্দির, পুড়িয়ে দেওয়া ঘরের উঠানে বসে মৃদুকণ্ঠের প্রশ্ন আর অসহায় চোখের চাহনি কি মানুষের বুকে বেদনা জাগাবে না। তাদের চেতনায় কি আঘাত দেবে না? উপহাস করবে না কি উন্নয়নের এত গর্বকে? ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মানবিক অস্তিত্বকে যদি বিপন্ন করে তাহলে সে সমাজ কি মানবিক? কান্নারত নারীর আমরা কি মানুষ নই এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন মনের গভীরে কি উঁকি দিয়ে যায় না, যারা সাম্প্রদায়িক হামলা করে এবং যারা নির্বিকার থাকে, তারা কি নিজেদের মানুষ বলে দাবি করতে লজ্জা পাবেন না?
ব্যক্তি মানুষের লজ্জার ব্যাপার থাকতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের আছে ব্যর্থতা। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যখন বলেন তারা ছাড়া দেশে আর কোনো শক্তি নেই তখন তাদের শক্তি দুর্বলকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলো না কেন? না কি সর্ষের মাঝেই ভূত লুকিয়ে আছে? যখন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেন আর উন্নয়নের বড়াই করেন তখন মানুষের সম্মান, সম্ভ্রম রক্ষায় তাদের ব্যর্থতার দায় কে নেবে? নাগরিকদের সম্মান এবং সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র অবহেলা করতে পারে না। তাই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে তোষণ এবং পোষণ করে পরিপুষ্ট করা আবার সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি দেখানো, এই দুদিক থেকে লাভ করার রাজনীতি বন্ধ করা উচিত।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com