সত্তর ও আশির দশকের শুরুতে বিশ্বব্যাপী ‘পেনফ্রেন্ড’ বা ‘পত্রমিতালী’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অর্থাৎ চিঠির মাধ্যমে বন্ধুত্ব করা। সেই সময়ের সে জনপ্রিয়তার ছোঁয়া বাংলাদেশেও লাগে। দেশ-বিদেশে কলমী বন্ধুত্বের মাধ্যমে গড়ে ওঠে হৃদয়ছোঁয়া সম্পর্ক। এভাবে দেশের ভেতরে ও বিদেশে মানুষ বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমেও যে কত গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে তা আমরা দেখেছি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ চলচ্চিত্রে। কিন্তু সে সময় আমাদের দেশের কেউ কেউ চিঠিকে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম না করে টাকা বা কাগজী নোটকে বন্ধুত্ব, প্রেম ভালোবাসার আরও বেশি সহজ ও সুবিধাজনক মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।
কাগজী নোটে নিজের ঠিকানা বা ফোন নম্বর লিখে বন্ধুত্বের আহ্বান জানানো হতো। কেউবা দিতেন প্রেমের প্রস্তাব। ‘যাও চিঠি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’ ইত্যাদি লাইন লিখে। কাব্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতেন অতি উৎসাহী কেউ কেউ। সাতপাঁচ না ভেবে মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখতেন মনে যা আসে তাই। টাকায় লেখা নৈতিক-অনৈতিক, আইনি নাকি বেআইনি, উচিত কি অনুচিত সে ভাবনা হয়তো তাদের মধ্যে থাকে না। ন্যূনতম বোধবুদ্ধির অভাবে এসব মানুষ টাকায় লিখতে থাকে প্রেম-ভালোবাসার কথা। টাকায় বন্ধুত্বের বা প্রেম-ভালোবাসার আহ্বান থাকলেও এক সময় সেখানে কুরুচিপূর্ণ ও রাজনৈতিক মন্তব্যও স্থান করে নেয়।
প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাংক নোট। একটা কাগজী নোট প্রায় ২২টি ধাপ পেরিয়ে বাজারে আসে। একটা ব্যাংক নোট তৈরি করতে প্রায় ১ টাকা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। মূল্যবান সেই টাকা মানুষের হাতে হাতে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত, নষ্ট বা পরিত্যক্ত হচ্ছে। অনেকেই অভ্যাসবশত আঙুলে থুথু লাগিয়ে টাকা গুনে থাকেন। কাজটি ঘাম বা নোংরা পানি দিয়েও কেউ কেউ করেন। এতে খুব সহজে টাকা ময়লা হয়ে যায়। হয়ে পড়ে জীবাণুযুক্ত। টাকার মাধ্যমে অনেক সংক্রামক ব্যাধিও ছড়ায়। করোনাকালীন বলা হয়েছে টাকার মাধ্যমে করোনা ছড়ায়। টাকা গোনার পর হাত ধোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সমাজে শিক্ষিত বলে পরিচিত অনেকের মাঝেই এভাবে টাকা গোনার বদঅভ্যাস রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক কর্মীরা টাকার বান্ডেলে স্বাক্ষর, সিল, নোটের সংখ্যা এবং টাকার পরিমাণ লিখে থাকেন। তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কাজ করে থাকে। ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের হাত থেকেও নিস্তার মিলছে না বাংলাদেশি কাগজী নোটের। টাকা লেনদেনের সময় পুরনো, ছেঁড়া, পিনের কারণে ছেঁড়া টাকা ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই নিতে চান না। টাকার ওপর লেখায় অনেক নোটই আর চালানো যায় না। এতে টাকা মলিন হয়ে যায়। সৌন্দর্য নষ্ট হয়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে আমাদের নাগরিক জীবনে। অনেক সময় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে এমন টাকা নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। এসব ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন।
এ ছাড়া অতি ব্যবহার ও অযতে্নও অনেক নোট এক পর্যায়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২, ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট বেশি নষ্ট হয়। বাহকদের সতর্কতার অভাবে অনেক নোট শ্রীহীন ও নরম হয়ে যায়। আগুনে আংশিক পুড়েও অনেক টাকা অচল হয়ে পড়ে। অনেকের বাড়িতে ছেঁড়া টাকা পড়ে থাকে অযতে্ন-অবহেলায়। সময়-সুযোগ এবং সঠিক তথ্য জানা না থাকায় সে সব টাকা আর বদলানো হয় না। ছোট নোটগুলো পরিবর্তনের জন্য সহজে কেউ ব্যাংকে যান না। আর পরিবর্তনের জন্য গেলেও ব্যাংকগুলোতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক নোটজনিত আর্থিক ক্ষতি তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকেই পোহাতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন লিমিটেড (টাকশাল) সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ টাকা নষ্ট বা অপচয় হচ্ছে অযতে্ন ব্যবহার হওয়ার কারণে। ব্যবহারের-অযোগ্য এসব টাকা পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলতে হয়। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পুরাতন ওই নোটের সমপরিমাণ নতুন নোট ছাপাতে হয়। এতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। আমাদের নোট ছাপানোর কাগজ ও কালির মান পৃথিবীর যে কোনো উন্নত দেশের সমতুল্য। কোনো কোনো নোট অন্যান্য দেশের নোটের মানের চেয়েও ভালো। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের টাকা ব্যবহারের পদ্ধতি ভালো না। বিশেষ করে ছোট নোটগুলো শ্রমজীবী মানুষরা অনেক ক্ষেত্রে সতর্কভাবে ব্যবহার করেন না। এ ছাড়া আমাদের দেশে আর্দ্রতা ও ধুলা বেশি হওয়ার কারণেও ছোট নোটগুলো তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়।
পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের টাকাতে কলমের দাগ, সিল বা পিনের কোনো চিহ্ন সহজে দেখা যায় না। পুরাতন টাকা লেনদেনেও কোনো সমস্যা হয় না। ইংল্যান্ডে ১৯২৮ সালের ব্যাংক নোটস অ্যাক্টে (সেকশন ১২) উল্লেখ আছে, কেউ যদি মুদ্রার ওপর ঘষামাজা, লেখা কিংবা অন্য কোনোভাবে বিকৃত করে তা পুলিশ কেইস হিসেবে বিবেচিত হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ব্যাংক নোট বিষয়ক আইন আছে এবং তার কঠোর প্রয়োগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। টাকা নষ্ট না করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বটে কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে নতুন করে আবারও সতর্কতা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘কাগুজে নোটের ওপর লেখা, স্বাক্ষর, সিল এবং এক হাজার টাকার নোট ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে স্ট্যাপলিং থেকে বিরত থাকতে’ ব্যাংকগুলোকে আবারও নির্দেশনা দিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি প্যাকেটে নোটের সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে প্যাকেট ব্যান্ডিং করার পর সংশ্লিষ্ট শাখার নাম, সিল নোট গণনাকারীর স্বাক্ষর ও তারিখ সংবলিত লেবেল বা ফ্লাইলিফ লাগানোর বিধান রয়েছে। তবে সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, এ নির্দেশনা লংঘন করে সরাসরি টাকার ওপর সংখ্যা ও তারিখ লেখা, শাখার সিল, স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর এবং স্ট্যাপলিং করা হচ্ছে। এতে করে তুলনামুলক কম সময়ে নোটগুলো অপ্রচলনযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিন নোটনীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়, যা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়।’ (দেশ রূপান্তর অনলাইন ডেস্ক, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১)।
টাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। তাই এর ক্ষতি হওয়া মানে বাংলাদেশের জনগণের সম্পত্তির ক্ষতি হওয়া। আর একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অবশ্যই আমাদের সবার দায়িত্ব-কর্তব্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করার এবং তা অক্ষত রাখার। আমাদের অবশ্যই সুনাগরিকতার পরিচয় দিয়ে টাকার ওপর এমন অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। গ্রাহকরা যদি একটু সতর্কভাবে টাকা ব্যবহার করেন তাহলে এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট
hindol_khan@yahoo.com