ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথের নাম— ভারত বনাম পাকিস্তান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দিয়ে দীর্ঘদিন পর ফের সাক্ষাৎ হচ্ছে দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বীর। দুবাইতে রবিবারের ম্যাচে শেষ হাসি হাসবে কে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা ও কথার লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ মাঠে গড়ায় না। দুই দলের যা সাক্ষাৎ-লড়াই তা আইসিসির বড় টুর্নামেন্টে।
এর আগে, ওয়ানডে বিশ্বকাপে সাতবারের দেখায় প্রত্যেকবার পাকিস্তানকে হারিয়েছে ভারত। এছাড়া, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সবুজ জার্সিদের বিপক্ষে পাঁচবারের দেখাতেও শেষ হাসি হেসেছে টিম ইন্ডিয়া। দুই দলের শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ইংল্যান্ডে, ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে।
বিশ্বকাপে অনেক স্মরণীয় ম্যাচের জন্ম দিয়েছে ভারত-পাকিস্তান। তার মধ্য থেকে বিবিসি’র বাছাই করা সেরা পাঁচ ম্যাচ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন উপল বড়ুয়া ।
১৯৯৬ বিশ্বকাপ
বেঙ্গালুরুতে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৮৭ রান করে ভারত। নভোজিৎ সিং সিধুর ব্যাট থেকে আসে সর্বোচ্চ ৯৩ রান। ২৫ বলে ৪৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন অজয় জাদেজা।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানকে চমৎকার শুরু এনে দেন আমির সোহেল ও সাঈদ আনোয়ার। ওপেনিং জুটিতেই ১০ ওভারে স্কোরবোর্ডে ৮৪ রান জমা করেন তারা।
এর পরের ঘটনাটিকে ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে ‘আইকনিক’ মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। ইনিংসের ১৪.৫ ওভারে পেসার ভেঙ্কটেশ প্রসাদের বল বাউন্ডারি ছাড়া করেন সোহেল। তারপর ব্যাট দিয়ে বাউন্ডারি দেখিয়ে প্রসাদকে কটাক্ষ করেন তিনি।
প্রতিশোধ নিতে ছাড়েননি ভারতীয় বোলার। পরের বলে সোহেলের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন প্রসাদ। উইকেট উদযাপনে বেঙ্গালুরুর দর্শকও ফেটে পড়ে উত্তেজনায়। ম্যাচটি ৩৯ রানে জিতে পাকিস্তানকে আসর থেকে ছিটকে দেয় ভারত।
২০০৩ বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকার সেঞ্চুরিয়নে হওয়া ভারত-পাকিস্তানের এই লড়াই ব্যাপকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে।
সাঈদ আনোয়ারের সেঞ্চুরিতে ২৭৩ রানের লড়াকু স্কোর পায় পাকিস্তান। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বড় চ্যালেঞ্জের সামনে পড়ে ভারত।
ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস ও শোয়েব আখতারকে নিয়ে গড়া পাকিস্তানের ভীতি জাগানিয়া পেস আক্রমণ সামলে টিম ইন্ডিয়াকে জয়ের ভিত গড়ে দেন শচীন টেন্ডুলকার। মাস্টারক্লাস ব্যাটিংয়ে ১২ চার ও এক ছয়ে ৭৫ বলে ৯৮ রান করেন ‘লিটল মাস্টার’।
পরে যুবরাজ সিং ও রাহুল দ্রাবিড়ের অপরাজিত ইনিংসের ওপর ভর করে ২৬ বল বাকি থাকতে জয় পায় ভারত।
২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল
১৪ বছর আগে, দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম আসরে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ফেবারিট হিসেবে আসর শুরু করেছিল টিম ইন্ডিয়া।
সীমিত ওভারের এই ক্রিকেট আসরে ভারত দলে জায়গা হয়নি শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলি ও রাহুল দ্রাবিড়ের মতো কিংবদন্তি ব্যাটারদের। এদিকে, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হেরে ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের ভরাডুবি হওয়ায় চাপ ছিল ধোনির ওপর। তবে সব সামলে শিরোপা জিতে নেয় টিম ইন্ডিয়া।
ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে ১৫৭ রান করে ভারত। তবে এই ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে ধোনির অধিনায়কত্বের জন্য। শেষ ওভারে যোগিন্দর শর্মার হাতে বল তুলে দেন তিনি। আর সেই অখ্যাত বোলারই লিখলেন রূপকথার গল্প।
১৫৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের জন্য পাকিস্তানের ৬ বলে দরকার ছিল ১৩ রান। প্রথম দুই বলের মধ্যে একটিতে ছক্কা হাঁকিয়ে কাজটি সহজ করে দেন স্ট্রাইকে থাকা মিসবাহ-উল-হক। শেষ চার বলে পাকিস্তানের দরকার হয় ৬ রান। ধোনি শান্ত থাকতে বলেন শর্মাকে।
রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটিতে বাউন্ডারির জন্য মিসবাহ পরের বলে স্কুপ করেন। কিন্তু ধরা পড়েন শ্রীনাথের হাতে। এখানেই ম্যাচ শেষ। পাকিস্তানিদের হৃদয় ভেঙে জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে ভারত।
২০১১ বিশ্বকাপ
ঘরের বিশ্বকাপে ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে হারায় অস্ট্রেলিয়াকে। মোহালির সেমিফাইনালে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় পাকিস্তানকে। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথমবার মুখোমুখি হয় এই দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী। এই হামলায় ১৬৬ জন নাগরিকের মৃত্যুর জন্য পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বাকে দোষারোপ করে ভারত।
একদিকে সেমি, অন্যদিকে দুই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ম্যাচটি নিয়ে আগে থেকে আলোচনার ঝড় শুরু হয়। এই ম্যাচ উপভোগ করতে মোহালিতে তখন উপস্থিত ছিলেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী।
টস জিতে ভারত ব্যাটিংয়ে নামে। দলকে উড়ন্ত সূচনা এনে দুই ওপেনার বীরেন্দ্র শেহবাগ ও শচীন টেন্ডুলকার। শেহবাগ সাজঘরে ফেরেন ষষ্ঠ ওভারে। পাকিস্তানি ফিল্ডারদের ভুলে চারবার জীবন পেয়ে শচীন করেন ৮৫ রান। এরপর সুরেশ রায়নার ৩৬ রানের সুবাদে ২৬১ রানের সংগ্রহ পায় ভারত।
৪৩ রান করে পাকিস্তানকে ভালো শুরু এনে দেন ওপেনার মোহাম্মদ হাফিজ। কিন্তু ভারতের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আক্রমণ ও ফিল্ডিংয়ে চাপে পড়ে তারা। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ম্যাচটি হারে ২৯ রানে। সেবার দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।
২০১৯ বিশ্বকাপ
ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচটিতে টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। ব্যাটিংয়ে নেমে ৫ উইকেটে ৩৩৬ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় ভারত। দুই ওপেনার রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুল ওপেনিং জুটিতে করেন ১৩৬ রান। রাহুল ৫৭ রানে আউট হন।
রোহিত পাকিস্তানি বোলারদের ওপর শাসন জারি রেখে ১১৩ বলে করেন ১৪০ রান। ৬৫ বলে অধিনায়ক বিরাট কোহলি খেলেন ৭৭ রানের ইনিংস।
জবাব দিতে নেমে পাকিস্তানকে লড়াইয়ে রাখেন ফখর জামান ও বাবর আজম। ফখর ৭৫ বলে করেন ৭৫ ও বাবর ৫৭ বলে করেন ৪৮ রান। দুজনকে আউট করে ভারত শিবিরে স্বস্তি ফেরান কুলদীপ যাদব। পরে বৃষ্টির বাগড়ায় ডার্ক লুইস মেথডে ৮৯ রানের সহজ জয় পায় ভারত।