দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে পুঁজিবাজার

টানা দুই সপ্তাহের পতনে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। হঠাৎ করে বিক্রির চাপ বাড়ায় আরও দরপতনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে, ভীতি ছড়িয়ে পড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এতে দিনের শুরুতে বড় ধরনের উত্থান দেখা দিলেও বিক্রিচাপে পড়ে গতকালও বড় পতন দিয়ে শেষ হয়েছে দিনের লেনদেন। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া প্রায় ৭৭ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৭০ পয়েন্টের বেশি। সূচকটি নেমে এসেছে ৭ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি, যা গত ২ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন।

গত ১১ অক্টোবর থেকে টানা দরপতনের পর গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর প্রধান সূচকটিতে কিছু বাড়তি পয়েন্ট যোগ হয়েছিল। সেদিন বেশিরভাগ শেয়ারের দর না বাড়লেও বেক্সিমকোসহ বড় মূলধনী কিছু কোম্পানির শেয়ার দরবৃদ্ধিতে ভর করে প্রায় ৫৬ পয়েন্ট বাড়ে সূচকটি। এর আগে টানা সাত কার্যদিবসে বিক্রিচাপে পড়ে সূচকটি ৩৪৭ পয়েন্ট হারায়। মূলত বেক্সিমকো লিমিটেডের সুকুক বন্ড কেনার ইস্যুসহ নানামুখী গুজবে অস্থিরতা তৈরি হয় পুঁজিবাজারে। এ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের বড় আকারের শেয়ার বিক্রির কারণে পতন দেখা দেয়। 

পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের দুই সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় গতকাল লেনদেনের শুরুতে কিছুটা উঠানামা দেখা গেলেও বেলা ১১টায় সূচকটি আগের দিনের তুলনায় ৬২ পয়েন্ট বাড়ে। কিন্তু এরপরই শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ থেকে শেয়ারের অব্যাহত বিক্রিচাপ আসায় সূচক নিচে নামতে থাকে। দুপুর ১২টার আগেই সূচকটি আগের কার্যদিবসের অবস্থানে ফিরে আসে। এমন পরিস্থিতিতে আরও দরপতনের আশঙ্কায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশও শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দেন। ফলে সূচকের পতন ত্বরান্বিত হয়। দুপুর ১টায় সূচকটি আগের দিনের চেয়ে প্রায় ৫০ পয়েন্ট কমে যায়। এরপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূচক বড় পতনের দিকে এগিয়ে যায়। লেনদেন শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে সূচকটি ৭ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। তবে দিনশেষে শেয়ার দর সমন্বয় হওয়ায় সূচকটি ৭০০৫ পয়েন্টে দাঁড়ায়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, বর্তমান কমিশনের আমলে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা থাকায় অনেকেই নতুন করে শেয়ার ব্যবসায় যুক্ত হন, যারা এখন মূলধনী মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেছেন। এরমধ্যে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি পাওয়া শেয়ারগুলোই বেশি পরিমাণে দর হারাচ্ছে। যদিও এখন জুন ক্লোজিংয়ের কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। গতকাল বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মা, স্কয়ার ফার্মা, রেনেটাসহ বেশকিছু কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণাসহ নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। তারপরও বাজারে নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৫টি কো¤পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৫৭টির, কমেছে ২৯২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টি কোম্পানির শেয়ার। ডিএসইর খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল বিবিধ ও সিরামিক ছাড়া অন্য সব খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে সেবা ও নির্মাণ খাত, ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া বস্ত্র, সিমেন্ট, কাগজ, ফার্মাসিউটিক্যালস খাত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর হারিয়েছে।

নতুন বিনিয়োগ ও লভ্যাংশ ঘোষণার পরও গতকাল স্কয়ার ফার্মার দর সোয়া ৩ শতাংশ কমেছে। এর প্রভাবে ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে প্রায় ১১ পয়েন্ট। গ্রামীণফোনের দরহ্রাসের কারণেও সূচকটি ১১ পয়েন্ট হারিয়েছে। এছাড়া ওয়ালটন, রবি, বেক্সিমকো ফার্মা, লাফার্জহোলসিম, বিএটি বাংলাদেশ, বিকন ফার্মা ও হাইডেলবার্গ সিমেন্টের দরপতনে সূচকটি আরও ২৫ পয়েন্ট হারিয়েছে।

অবশ্য বড় পতন হলেও ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। গতকাল ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বেক্সিমকো লিমিটেডে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪২ কোটি টাকা। এটি ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৩ শতাংশের বেশি।

গতকাল ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এর বাইরে দর কমার শীর্ষে থাকা কো¤পানি হলোবিবিএস, অ্যাক্টিভ ফাইন, আজিজ পাইপস্, দেশবন্ধু পলিমার, অ্যাপোলো ইস্পাত, রিংসাইন, এএফসি অ্যাগ্রো, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ও দেশ গার্মেন্টস।