নিষেধাজ্ঞা শেষে দ্বিগুণ ইলিশের আশা

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ মাঝরাত থেকে। রাত ১২টার পর থেকে জাল-নৌকা নিয়ে সাগর-নদীতে নেমে পড়বেন জেলেরা। চাঁদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ দেশে দক্ষিণাঞ্চলের জেলেরা সারছেন শেষ সময়ের প্রস্তুতি। ট্রলার, নৌকা মেরামত রং দিয়ে নতুন করে তুলেছেন কেউ কেউ, কেউ আবার সারাই করছেন জাল, ইঞ্জিন। মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর যত ইলিশ ধরা হয়েছে তার দ্বিগুণ ধরা পড়বে নিষেধাজ্ঞার সময় শেষে।

মা ইলিশ রক্ষায় গত ৪ অক্টোবর থেকে সারা দেশের নদ-নদীতে ২২ দিনের জন্য মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। তবে এর মধ্যেও থেমে থাকেনি ইলিশ শিকার। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে নিষেধাজ্ঞার প্রথম ২০ দিনে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৮৯২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। এই ২০ দিনে অভিযান চালানো হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৮টি। এ কদিনে প্রায় ৮১ কোটি টাকা দামের ৮ কোটি মিটার জাল ধ্বংস করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন ইলিশ।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ সময়ে ৩ হাজার ৭টি মামলায় ৫৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং ২ হাজার ৩৮৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ শাখার উপপ্রধান মাসুদ আরার ভাষ্য, এবারের নিষেধাজ্ঞাকালে পরিচালিত অভিযান ও তৎপরতায় ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যান্য বছরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞারকাল সফল হয়েছে। এবার মৌসুমে এখন পর্যন্ত যত ইলিশ ধরা হয়েছে পরের সময় তা দ্বিগুণ বাড়বে।

এদিকে জেলেরাও আশা করছেন, নিষেধাজ্ঞার পর ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে। জেলেরা বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় আমরা সাগরে মাছ শিকার করিনি। এ বছর ভরা মৌসুমে তেমন মাছ না পড়লেও আমরা অপেক্ষা করেছি।

কুয়াকাটা আলীপুর মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আনছার উদ্দিন মোল্লা বলেন, ২২ দিন জেলেদের কষ্টে কাটছে। তবুও তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকারে যায়নি। এখন জেলেদের কষ্টের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলছে জাল, নৌকা, ইঞ্জিন মেরামতের কাজ।

ওই জেলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এমদাদুল্লাহ জানান, এবার ইলিশ রক্ষা অভিযান শতভাগ সফল হয়েছে। এতে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। ২২ দিনের ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময় বরাদ্দকৃত চাল জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। তবে আজ সোমবার রাত ১২টা পর থেকে জেলেরা সাগর ও নদীতে মাছ শিকারে যেতে পারবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলায় আরেক বছরগুলোর তুলনায় এবার জেলের সচেতন মনে হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর থেকে ২১ দিনে মামলা হয়েছে ১০৮টি। আরও ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যা আগের বছর বেশি ছিল।

গত ৪ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের জন্য বন্ধ হয় জাতীয় এ মাছ শিকার। এ সময়কাল নির্ধারণ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার, যাতে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়।

অভিযান বাস্তবায়নকালে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বাগেরহাট জেলার নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে ইলিশসহ সকল প্রকার মাছ ধরা বন্ধ থাকে। আর নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, জামালপুর, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, কুষ্টিয়া ও নড়াইল জেলার নদ-নদীতে ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ থাকে।

আগে প্রজনন মৌসুমে ১৫ দিন ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ রাখা হলেও গত চার বছর ধরে এ সময় সাত দিন বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়। এ সময়ে সারা দেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত করা, কেনাবেচা ও বিনিময় নিষিদ্ধ করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয়। এরপর মন্ত্রণালয়ের এক সভায় জানানো হয়, ইলিশ ধরা বন্ধের সময় সাগরে পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেরা যাতে অবৈধ মৎস্য শিকার করতে না পারে সেজন্য কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিমানবাহিনী আকাশপথে নজরদারি গত বছরের চেয়ে বাড়ায় এবং রাতের বেলা টহল জোরদার করে। এ সময় জেলেদের সহায়তায় প্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার জেলে পরিবারের জন্য ১১ হাজার মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।