সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াইয়ে নজরুলের শিক্ষা

‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’। মানুষ যদি অন্তরাত্মাকে না চেনে, অন্য ধর্মকে সম্মান করতে না শেখে নিজেকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ প্রমাণের জন্য ব্যস্ত থাকে, তাহলে সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে উঠবে না। কত শত বছর আগে বাঙালি কবি বড়– চন্ডিদাস বলেছিলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। কিন্তু আজকের বাংলার বাস্তবতা উল্টো ‘সবার উপরে ধর্ম সত্য মানুষ সেখানে নাই’! নজরুল এসবের অবসান চেয়েছেন। গড়তে চেয়েছেন একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক সমাজ; শোষণমুক্ত বিশ্ব। নজরুল তার চারটি সন্তানের নাম রেখেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য ও পুরাণের আলোকে। তার সন্তানদের নাম যথাক্রমে কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। অসাম্প্রদায়িক নিদর্শন আর কী হতে পারে! মসজিদে গজল আর ইসলামি সংগীত আর মন্দিরে শ্যামাগীতি; সমানভাবে জনপ্রিয়। ভাবা যায়! বিশ্বের আর কোনো সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে বা আইডলের কাছে এমন হয়নি। ইসলামি সংগীত, হামদ ও নাতগুলো চমৎকার। হিন্দুদের জন্য রচিত শ্যামাসংগীতও দারুণ জনপ্রিয়।

‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া’। মানুষের কল্যাণে ধর্ম সৃষ্টি। কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে শোষণ-ত্রাসন সৃষ্টি করা হয় বলে কবি নজরুল মনে করতেন। বর্তমানেও একই অবস্থা বিরাজমান। কার্ল মার্ক্সের ‘আফিম তত্ত্ব’র মতো নজরুল বললেন, ‘কাটায় উঠেছি ধর্ম-আফিম নেশা,/ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা,/ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ,/ভাঙিয়া গীর্জা গাহি সঙ্গীত-/এক মানবের এক রক্ত মেশা’-(বিংশ শতাব্দী, প্রলয় শিখা)। যেন সত্যেন্দ্রনাথের ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবার সমান রাঙা’র মতো। আর একটা কবিতাংশের কথা উল্লেখ করাই যায়। ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,/আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করোনি প্রভু।/তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,/মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি।’ সাম্যবাদী কাব্যের ‘মানুষ’ কবিতায় স্রষ্টার প্রতি ‘ভুখা মুসাফির’-এর আত্মকথন। কবি নজরুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অত্র অঞ্চলের প্রধান দুটি ধর্মের অনাচার-অসাম্যের প্রতি সমান আঘাত হেনেছেন। মুসলমান ও হিন্দু ধর্মের তথাকথিতদের ওপর আক্রোশ ঝরে পড়েছে কবিতার পরতে পরতে। তার কবিতায় ‘মানুষ’-ই মুখ্য উপজীব্য। অসাম্প্রদায়িক এমন সাহিত্যিক বিশ্বে বিরলই। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় বারাঙ্গনাদের সম্মানিত করেছেন নজরুল। ‘মা’ হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। ‘ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর’। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় ভাঙা-গড়ার খেলা দেখিয়েছেন। আবার ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’ কবিতায় বলেন, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা,/ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর/সৃষ্টি নব পূর্ণিমা।’ হিন্দুদের ঐতিহ্য ব্যবহার করে ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টির প্রার্থনা করেছেন কবি। ‘নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই’ অথবা ‘পীড়িতের নাই জাতি ও ধর্ম, অধীন ভারতময়, তারা পরাধীন, তারা নিপীড়িত, এই এক পরিচয়’ বলে স্বাধীনতা চেয়েছেন। শোষণ-পীড়িতের অবসান চেয়েছেন। ‘একতাই বল’ হিসেবে অগ্রসর হতে বলেছেন। ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো বিভাজন চাননি তিনি। বিভাজন থাকলে স্বাধীনতা বা অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়। কৃষকের চোখে নজরুল বলেছেন, ‘আজ জাগরে কৃষাণ সব ত গেছে, কিসের বা আর ভয়,/এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়’ (কৃষাণের গান)। এমন অভয় বাণী নজরুলের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব।  হাতুড়ি ও শাবল শ্রমিকের প্রতীক। এ দুটির মাধ্যমেই রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়। এ দুটি অনুষঙ্গ নিয়েই শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকের রুখে দাঁড়ানোর মন্ত্র দিলেন নজরুল এভাবে, ‘ওরে ধ্বংস পথের যাত্রীদল!/ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল... মোদের যা ছিল সব দিইছি ফুঁকে,/এইবার শেষ কপাল ঠুকে!/ পড়ব রুখে অত্যাচারীর বুকেরে!/আবার নতুন করে মল্লভূমে/গর্জাবে ভাই দল-মাদল!/ ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল।’ সর্বহারা কাব্যের ‘ধীবরদের গান’ কবিতায় নজরুল বলেন, ‘ও ভাই নিত্য নতুন হুকুম জারি/করছে তাই সব অত্যাচারীরে,/তারা বাজের মতন ছোঁ মেরে খায়/আমরা মৎস্য পেলে।’

নজরুলের ‘সর্বহারা ’ ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। ‘সর্বহারা’ কবিতায় শেষের দিকের কবির আহ্বান: ‘... মাঝিরে তোর নাও ভাসিয়ে/মাটির বুকে চল!/শক্ত মাটির ঘায়ে হউক/রক্ত পদতল।/প্রলয়-পথিক চলবি ফিরি/দলবি পাহাড়-কানন-গিরি;/হাঁকছে বাদল ঘিরি ঘিরি,/নাচছে সিন্ধুজল।/চল রে জলের যাত্রী এবার/মাটির বুকে চল।।’-(সর্বহারা)। শ্রমিকের ঘামে সভ্যতা তৈরি। কিন্তু তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। এ অবস্থা নজরুলের আগে বা তার সময়েও বিদ্যমান ছিল। বর্তমানেও এ বৈষম্য বিদ্যমান। এ ব্যাপারে নজরুলের কঠিন আহ্বান: ‘... আমরা পাতাল খুঁড়ে খনি/আনি ফণীর মাথার মণি,/তাই পেয়ে সব শনি হ’ল ধনী রে।/এবার ফণি-মনসার নাগ-নাগিণী/আয় রে গর্জে মার ছোবল।/ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল...’ (শ্রমিকের গান)। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’এ উপলব্ধিকে প্রতিষ্ঠিত করতে কবি নজরুল কবিতায় লেখেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ জাতি,/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ অথবা বলতে পারি, ‘গাহি সাম্যের গান-/যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’ (সাম্যবাদী কবিতা)। সাম্যবাদী  কাব্যের বারাঙ্গনা, কুলি-মজুর, মানুষ, রাজা-প্রজা, নারী, পাপ, চোর-ডাকাত প্রভৃতি কবিতায় সাম্যবাদী নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। আর উচ্চারণে ছিল অগ্নিবর্ষা। প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসে কুঠারাঘাত করেছেন। আলোচ্য কবিতাংশগুলো তার জ্বলজ্বলে প্রমাণ।  ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’মানুষের কথা, মানবতার জয়গানই মুখ্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। গান, কবিতা ও প্রবন্ধে মানবতা লক্ষ্য করেই রচিত হয়েছে। নারী হিসেবে কাউকে অবমূল্যায়ন করেননি। বরং প্রতিবাদী কণ্ঠেই লিখছেন। সর্বহারা কাব্যের ‘ধীবরদের গান’ কবিতায় নজরুল বলেন, ‘ও ভাই নিত্য নতুন হুকুম জারি/করছে তাই সব অত্যাচারীরে,/তারা বাজের মতন ছোঁ মেরে খায়/আমরা মৎস্য পেলে।’ বিষের বাঁশি  কাব্যগন্থের ‘শিকল-পরার গান’ নামীয় রক্তগরম করার কবিতা ও অসাম্প্রদায়িক কবিতা ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। নজরুল জেলে থাকাকালীন লিখলেন: ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।/এই শিকল প’রেই শিকল তোদের করব রে বিকল।।’ এটি এ কাব্যের ‘শিকল-পরার গান’ কবিতার অংশ। আমরা বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এ কবিতাটি স্লোগান বা গান হিসেবে পরিবেশন করি। এ গানটি একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। শিল্পীদের মুখে বা ছাত্রসমাজের মুখ থেকে ক¤িপত এ গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছে। ইংরেজদের লক্ষ্য করে কবি নজরুল বললেন: ‘তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;/সেই ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়!/ মোরা আপনি ম’রে মরার দেশে আনব বরাভয়,/মোরা ফাঁসি প’রে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল।’ শত্রুর বিপক্ষে এমন সাহসী উচ্চারণ! ভাবা যায়! নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। এমন অনেক সাহসী উচ্চারণ তিনি দেখিয়েছেন। ফলে, বারংবার জেলও খেটেছেন। তার পাঁচটি বই নিষিদ্ধও করেছে ব্রিটিশ শাসকরা।

বাংলা কবিতায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এই কবি বাঙালির চৈতন্যে প্রথম বড় ধরনের ধাক্কা দিলেন; তিনি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। লিখলেন হিন্দু-মুসলমান মিলনের বহু কবিতা ও গান। ‘অসহায় জাতি ডুবিছে মরিয়া, জানে না সন্তরণ/কা-ারি! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি গান।/হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/কান্ডারি! বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র’ (কান্ডারি হুঁশিয়ার)। নজরুল তাই একালেও খুবই প্রাসঙ্গিক। তার জাতীয়তাবোধ, ধর্ম, বর্ণ, জাতিবিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার উদার জীবনদর্শন, নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জরুরি একটি পাঠ হতে পারে। আজকের পৃথিবীতে যখন মানুষ সম্প্রদায় বা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হতে হতে ক্রমশ ছোট হতে বসেছে। শেষ হতে বসেছে সম্প্রীতি, সমানুভাবের মতো বিষয়গুলো। ফলে নতুন করে কাজী নজরুল প্রাসঙ্গিকতা এখনো আছে। সামাজিক এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বা অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে সুস্থ পরিবেশ, দৃঢ় মানসিকতা গঠনের জন্য নজরুলকে সামনে আনা দরকার। স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে আরও বেশি করে নজরুল ইসলামকে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ তার অসাম্প্রদায়িকতার চেতনতার দৃঢ়তা আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

abuafzalsaleh@gmail.com