পলাশবাড়ীতে অচেনা প্রাণীর আক্রমণে নিহত ১, আতঙ্কে গ্রামবাসী

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের তালুক কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। সেখানকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে বড়রাও হাতে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করেন।

আতঙ্কে সন্তানের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক অভিভাবক। অনেকে আবার সাথে করে নিয়ে যাওয়া-আনা করেন সন্তানকে। শুধু যে এ গ্রামেই এই অবস্থা তা নয়, আতঙ্ক ছড়িয়েছে আশপাশের আরও দুই গ্রামে।

গ্রামবাসী জানান, প্রায় এক মাস আগে শুরু হওয়া এক অচেনা-অজানা প্রাণীর আক্রমণে ইতিমধ্যে একজন মারা গেছেন ও আহত হয়েছেন অন্তত পাঁচজন। এমনকি এই প্রাণীর হাত থেকে রেহাই পায়নি কুকুরও। আক্রমণের শিকার হয়ে দুইটি কুকুরের মৃত্যু হয়েছে।

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে মঙ্গলবার বিকেলে হরিনাথপুর ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার শুরুটা হয় গত মাসের ২৯ সেপ্টেম্বর। এ দিন হরিনাথপুর গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী ফেরদৌস রহমান রুকু নামের এক বৃদ্ধ দুপুরে আক্রমণের শিকার হন অচেনা এই প্রাণীটির। এর কিছু সময় পরপরই অচেনা-অজানা এই প্রাণীটির আক্রমণের শিকার হন প্রতিবেশী আমরুল ইসলাম (৩১) ও সুমি বেগমও (৪০)। একই দিন কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের আফছার আলী (৩৫) ও ব্রাক্ষ্মভিটা গ্রামের হামিদ মিয়াও (৪০) আক্রান্ত হন প্রাণীটি দ্বারা।

গত রবিবার আক্রমণের শিকার হয় তালুক কেঁওয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মো. রাব্বী শেখ (১২)। সর্বশেষ গত সোমবার সন্ধ্যায় হরিনাথপুর গ্রামের মনজিলা বেগমকে (৫০) আক্রমণের সময় স্থানীয়রা ধানখেতে আটক করে একটি প্রাণীকে মেরে ফেলে। স্থানীয়দের কেউ এটিকে বলছেন শিয়াল আবার কেউ বা বলছেন হায়েনা। এর মধ্যে ফেরদৌস রহমান রুকু মারা যান গত ১৮ অক্টোবর।

এই প্রতিবেদক মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যখন তালুক কেঁওয়াবাড়ী গ্রামে পৌঁছান, ঘড়িতে তখন পাঁচটা বেজে ১০ মিনিট। গ্রামে লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় আলী আজম (১০), রিফা মনি (৮), আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ (৭) অনেককে। কিছুক্ষণ পর পাঁচটা ২৭ মিনিটে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। এ সময়ই তালুক কেঁওয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্বপাশে দূরের এক জঙ্গল থেকে হঠাৎ কয়েকবার ডেকে ওঠে কয়েকটি প্রাণী। অনেকটা শিয়ালের ডাকের মতো। উৎসুক এ প্রতিবেদক হাতে লাঠিসহ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলে দেখা মেলেনি কোনো প্রাণীর। হয়তো প্রাণীগুলো ধানখেতের ভেতর বা আবারও জঙ্গলে লুকিয়েছে।

যারা এই প্রাণীটিকে দেখেছেন তারা বলছেন, প্রাণীটি দেখতে কুকুর বা শিয়ালের মতো। মোটা ধরনের প্রাণীটির গায়ের রং লাল, সাদা ও ধূসর। লম্বা লেজ। মুখটাও লম্বাটে।

ফেরদৌস রহমান রুকুর ভাই সাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ে ঘাস কাটতে গেলে আক্রমণের শিকার হন তিনি। তার নাক ও পশ্চাৎদেশের মাংস ছিঁড়ে ফেলে প্রাণীটি। এরপর তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সেলাই শেষে জলাতঙ্ক ও টিটেনাস টিকা দিয়ে ভর্তি না করিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আরও দুই দিন গিয়ে জলাতঙ্কের আরও দুই ডোজ টিকা দিয়ে আনা হয়। দিনদিন অবস্থা অবনতির দিকে গেলে তাকে ১৭ অক্টোবর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঘটনার পর কোন জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কেউ আসেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

প্রাণীটির আক্রমণের শিকার মো. রাব্বী শেখের মা রুমি বেগম (২৭) বলেন, অচেনা এই প্রাণীর আক্রমণে পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। আমার ছেলেও আক্রমণে আহত হয়েছে। এখন আতঙ্কে আছি যদি কিছু হয়ে যায়। একই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন অন্যান্য আহত ব্যক্তিরাও।

তালুক কেঁওয়াবাড়ী গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, প্রাণীটি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলকে আক্রমণ করে না। আক্রমণ করে শুধু নিরীহ মানুষ ও কুকুরকে। আমার বাড়ির দুইটি কুকুরের ঘাড়ে আক্রমণ করে। পরে সে স্থানে ঘা সৃষ্টি হয়। গত ১৫ অক্টোবর কুকুর দুটি মারা যায়। প্রাণীটির ভয়ে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকে। অনেকে আবার সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসছেন, ছুটির পর আবার সাথে করে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। মানুষ দিনের বেলাতেও চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। লাঠি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে হরিণাবাড়ী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. রাকিব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা কোন ধরনের প্রাণী তা বলা মুশকিল। কেননা অনেকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন এটিকে। হয়তো বা কোন শিয়ালের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে এমনটা করছে। আমরা মানুষজনকে সতর্ক থাকতে বলছি। বন্যপ্রাণীর বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার কিছু নেই বলেও জানান তিনি।