বিশ্ববাজারে নতুন নতুন পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে গবেষণায় গুরুত্ব বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ইচ্ছা করলেই সবকিছুই করতে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধ হিসেবেই গড়ে উঠবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সপ্তাহব্যাপী ‘বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২১’ উদ্বোধনকালে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
এ সম্মেলনে দেশের সম্ভাবনাময় নয়টি খাতকে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সামনে অগ্রাধিকার দিয়ে তুলে ধরার সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত সময়োপযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করেন সরকারপ্রধান। খাতগুলো হলো অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, ফিনটেক (আর্থিক প্রযুক্তি), চামড়া, ওষুধ, স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষুদ্র প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট-বস্ত্র শিল্প, অতি চাহিদাসম্পন্ন ভোগ্যপণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন নতুন পণ্য আরও কী আমরা উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারি সেটাও গবেষণা করে বের করতে হবে। সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে এবং কোন কোন দেশে কী কী পণ্যের চাহিদা রয়েছে সেটা অনুধাবন করে সেই পণ্য আমরা বাংলাদেশে উৎপাদন করতে পারি কি না সেটা আমাদের বিবেচনা করতে হবে।’
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সবাইকে এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের চাহিদা থাকে আর বাংলাদেশ এমন একটা দেশ... আমরা ইচ্ছা করলে পারি, সবকিছুই করতে পারি। এই আত্মবিশ্বাস আমার আছে, যেটা জাতির পিতা বলে গেছেন।’
‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট সামিট’-এর মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নতুন দুয়ার উন্মোচন হবে, রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে এবং কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ সক্ষম হবে বলে শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এ সম্মেলনের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসব খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’
দেশের নৌ, রেল, সড়ক ও আকাশপথের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এয়ারপোর্ট হিসেবে গড়ে তুলছি, যাতে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোও ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। চট্টগ্রাম পোর্টকে উন্নত করছি, মোংলা পোর্ট এবং আমরা নতুন একটা পোর্ট আবার তৈরি করছি পায়রা পোর্ট। এটাও গভীর বন্দর হিসেবেই ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে। তাছাড়া মহেশখালীতেও ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে, অর্থাৎ কক্সবাজারে সেটাও বলতে গেলে সমুদ্রবন্দর হিসেবে তৈরি হচ্ছে। সেভাবে আমরা বিভিন্নভাবে সুযোগ সৃষ্টি করছি।’
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যারা বিনিয়োগ করতে আসবেন, তারা শুধু বাংলাদেশ পাবেন না, আমি বলব দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও তাদের একটা সুযোগ থাকবে, ওই বাজারগুলো ধরার ও রপ্তানি করার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলি যে... প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একটা যোগাযোগের ব্রিজ হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ভবিষ্যতে, যেটা আমাদের দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও প্রসার ঘটতে সহায়তা করবে।’
বেসরকারি খাত যেন আরও আকর্ষণীয় হয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ যাতে আরও বেশি পাওয়া যায়, সেজন্য সরকারের চেষ্টার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এ পর্যন্ত ২১০ জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ২৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। মিরসরাই, সোনাগাজী ও সীতাকুণ্ড উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার একর জমিতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’ গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় সরকার ৭৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হচ্ছে। পিপিপির আওতায় একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, আরও ছয়টি প্রকল্প নির্মাণাধীন।’
বাণিজ্য কূটনীতিতে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বলব, কূটনীতির ক্ষেত্রে ইকোনমিক ডিপ্লোমেসিটাই বেশি কাজ করে। সেদিকে আমরা বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছি এবং আমাদের প্রত্যেকটা দূতাবাসে এভাবেই নির্দেশনা দেওয়া আছে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার যাতে ঘটে।’
আওয়ামী লীগের গত ১৩ বছরের শাসনে প্রতিটি খাতে ‘কাক্সিক্ষত অগ্রগতি’ হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। বাংলাদেশ এসডিজি প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।