পোড়া মাটির গন্ধ শিশু জয়ের কান্না

২৪ অক্টোবর, রবিবার। কার্তিকের সকাল। গত ১৭ অক্টোবর রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড় করিমপুর (কসবা), উত্তরপাড়ার মাঝিপাড়ায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের সাত দিন পেরিয়েছে। মাঝিপাড়ায় গিয়ে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮০। একতলা পাকা মন্দির ভবনের কলাপসিবল গেট খোলা। ভেতরে চোখ পড়তেই দেখা গেল ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের পোড়া বাঁশ, ভাঙা টিন, ছেঁড়া পলিথিন আর জমিয়ে রাখা ছাই। মন্দিরের সামনে একপাশে শামিয়ানা টানানো। শামিয়ানা ঘেঁষেই রয়েছে একটি টিউবওয়েল। তার পাশে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি আমগাছ ও একটি মেহগনিগাছ। মাথা উঁচু করে গাছের সর্বোচ্চ ওপরে যতটুকু দেখা যায় সবই পুড়ে যাওয়া ডালপাতা দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালের মতো। শামিয়ানার নিচে বেশকিছু প্লাস্টিকের চেয়ার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একপাশে ডেকোরেটরের একটি কাঠের টেবিল ঘিরে সাত-আটজন আর্ম পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য বসে আছেন। তাদের চোখেমুখে রাত জাগার চিহ্ন সুস্পষ্ট। মাঝিপাড়ায় হামলার মধ্যরাত থেকে এখানে পালা করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এপিবিএন সদস্যরা। শামিয়ানার বাইরে মন্দির থেকে অল্প কিছু দূরে বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন নারী-পুরুষ জটলা করে আছে। নারী-পুরুষের জটলার দিকে এগিয়ে যেতেই একজন চেয়ার থেকে উঠে বসার জায়গা করে দিল। সবচেয়ে যিনি প্রবীণ তার কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরলে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন। রতন দাস (৭০) জানালেন, ১৭ অক্টোবর হামলার দিন দুপুরে মারা গিয়েছিলেন ভবতরণী দেবী। বার্ধক্যজণিত কারণে মৃত্যু হলেও তার মৃত্যু-পরবর্তী ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান আর করা সম্ভব হয়নি হামলা-অগ্নিসংযোগের কারণে। এখন মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা মিলে বসে সব ঠিক করছেন, কীভাবে তা সম্পন্ন করা যায়। তার সঙ্গে কথা বলার এক ফাঁকেই দেখা গেল দূরে দুটি শিশু পাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তার সামনে হাত মেলে দাঁড়িয়েছে। দুজনেরই শরীর খালি। কার্তিকের সকালে উত্তরবঙ্গের শীত থেকে রেহাই পেতে বাচ্চা দুটি আগুন জ্বালিয়েছে। বাচ্চাদের আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মধ্যবয়স্ক এক নারী বললেন ‘এ আগুনে পুড়েই সব হারাইলো হামাকের ছাওয়ালরা!’

বৃদ্ধ রতন দাস জানালেন, মন্দিরের সামনে যেখানে শামিয়ানা টানানো হয়েছে সেখানে একটি দোকান ছিল। ওই রাতের আগুনে তা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা এত ভয়াবহ ছিল যে, পাশের দুটি গাছও পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। সেই রাতের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছ দুটি। মন্দিরের সামনে শামিয়ানা কেন টানানো হয়েছে জানতে চাইলে বলা হলো ১৭ অক্টোবর অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর থেকে এখানে জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই এলাকার সংসদ সদস্য), বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে সরকারের ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা এসেছিলেন। তারা সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছেন। বক্তব্য দিয়েছেন, সভা করেছেন। এর জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শামিয়ানা টানানো হয়েছে।

রতন দাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেখা গেল এক যুবক কোলে ছোট্ট এক ছেলেশিশুকে নিয়ে এগিয়ে আসছেন। তাকে দেখেই রতন দাস জানালেন, এই যুবকের নাম রমেন চন্দ্র দাস (৩৫)। মন্দিরের সামনে পুড়ে যাওয়া দোকানের মালিক। রমেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকার মতো মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রতন বিভিন্ন মালামালের ডিলার ছিলেন। এর মধ্যে যেমন ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, লবণ ও গুঁড়োদুধ। আবার সাবান, পাউডার, কয়েল, শ্যাম্পুর মতো পণ্য। তার সব মালামাল দোকানেই রক্ষিত ছিল। আশপাশের দুই-তিন পাড়ায় এখান থেকে মালামাল দেওয়া হতো। সেই রাতের আগুনে সবই তার পুড়ে গেছে। পুড়ে ছাই হয়েছে দোকানে থাকা নগদ অর্থও। রমেন যখন কথা বলছিলেন, তখন তার কোলে থাকা ছোট্ট শিশুটি বারবার বাবাকে তাগাদা দিচ্ছিল। ছেলেটির হাতে একটি মোবাইলের কভার। ছেলে কী চায় জানতেই রমেন জানালেন রাতে যখন হামলাকারীরা তাদের পাড়ার দিকে ধেয়ে আসছিল তিনি তখন দোকানেই ছিলেন। লোকজনের হইচই বেড়ে গেলে দ্রুত দোকান বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ আর পাননি। তার আগেই আশপাশের বাড়িঘরে আগুন এবং ভাঙচুর দেখে রমেন প্রাণ রক্ষার্থে পালিয়ে যান। সেই সময়ে বাড়িতে ছিল তার স্ত্রী মুক্তিরানী (২৬) ও ছেলে জয় (৪)। আর ছিল অসুস্থ বাবা ননী গোপাল (৬৬) ও মা তারামণি (৫২)। আশপাশের বাড়িতে আগুন দেখে মুক্তিরানী প্রথমে ছেলে জয়কে নিয়ে ঘরের মাচার ওপরে উঠেছিলেন। পরে প্রতিবেশী এক কাকি-শাশুড়ির ডাকে নিচে নেমে এসে বাড়ির পাশের ধানক্ষেতে লুকিয়েছেন। সেই সময়ে শুধু পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই ঘর থেকে বের করতে পারেননি। নিজের গায়ের গেঞ্জির দিকে ইঙ্গিত করে রমেন জানালেন, তাদের ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গায়ে দেওয়ার মতো জামাকাপড়ও নেই। অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মাঝিপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ত্রাণ নিয়ে আসা হয়েছিল। তারাই এ গেঞ্জিটি দিয়েছে।

আগুনে পোড়া ঘর দেখতে চাইলে রমেন নিয়ে চলেন তার বাড়িতে। রাধা গোবিন্দ মন্দির থেকে ১০০ গজ দূরেই তাদের বাড়ি। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই পোড়ামাটির ঝাঁজাল গন্ধ নাকে এসে প্রবেশ করে। উঠানের কোণে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ছাই। ছাইয়ের মাঝখান থেকে দেখা যাচ্ছে পুড়ে যাওয়া ভাতের পাতিল, পানির গ্লাস, সিলভারের বদনা। আগুনে পুড়ে সব কালচে লাল হয়ে আছে। রমেন যখন ঘুরে ঘুরে বাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো দেখাচ্ছিলেন তখন দেখা গেল তারামণি একহাতে ঝাড়ু এবং অন্য হাতে একটি আধাপোড়া স্টিলের বালতি নিয়ে ঘরের দেয়াল পরিষ্কার করছেন। পুড়ে যাওয়া ইটের দেয়াল আর মাটির মেঝে দেখে বোঝার উপায় নেই, এ পরিবারটি একসময় মোটামুটি সচ্ছল জীবনযাপন করত। এক রাতের হামলা-আগুনে পুড়ে গেছে তাদের সব সহায়-সম্বল। রমেন জানালেন, আধাপাকা বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা ছাড়াও অন্য ভাই এবং ছোট এক বোনকে নিয়ে তারা বসবাস করতেন। অসুস্থ বাবা ও নিজের ছোট্ট সন্তানের জন্য রাতবিরাতে খাবার গরম করার জন্য ঘরে কিনে এনেছিলেন সিলিন্ডার গ্যাসের চুলা। ১৭ অক্টোবর রাতের হামলায় তার বাড়িতে যখন আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি দূরে বিলের মাঝে ধানক্ষেতে উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে তা দেখছিলেন। এখন রমেন ভাবছেন, গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য তার বাড়িটা হয়তো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার পরক্ষণেই যখন দেখেন পাড়ার অন্য সবার ঘরেরও একই দশা তখন সেই যুক্তি খারিজ করে দেন। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে শুধু এক দীর্ঘশ্বাস।

রমেন যখন নিজের সব হারানোর কথা জানাচ্ছিলেন তখন পাশে এসে দাঁড়ান স্ত্রী মুক্তিরানী। বাবার কোল থেকে মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলে জয়। মায়ের কোলে গিয়ে কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিসিয়ে কী যেন বলে। মুক্তিরানী জানালেন, আগুন লাগার পরদিন সকালে তারা বাড়ি ফিরেছিলেন। সারারাত ছেলেকে নিয়ে ধানক্ষেতেই কেটেছে। এরপর থেকে পাশের গ্রামে নিজের বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকছেন। গত কয়েক দিন ধরে বাড়িঘর পরিষ্কার করার জন্য দিনে এসে এখানে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে ছেলেকে নিয়ে। সন্ধ্যা হলেই ছেলে আর বাড়িতে থাকতে চায় না। ভয়ে কান্না করে। মায়ের কোলেও আর নিরাপদ মনে করতে পারছে না। অন্ধকার হলে তার কান্নাও বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে পাশের গ্রামে বাবার বাড়িতেই গিয়ে থাকতে হয় রাতে। সেই রাতের ভয়াবহতার কথা কিছুতেই ভোলানো যাচ্ছে না ছেলেকে।

ঘটনার রাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন পীরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. খায়রুল ইসলাম। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানালেন সেই রাতের ভয়াবহতার কথা। হামলাকারীদের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্রসহ উপস্থিত সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ লোক সমাগম হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির অবনতি হয়। তাদের চেষ্টায় দক্ষিণপাড়াকে অগ্নিসংযোগ ও হামলা থেকে রক্ষা করা গেলেও উত্তরপাড়াকে আর পারেননি।

পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোদা রানী রায় জানালেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় মাঝিপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। গৃহনির্মাণের জন্য টিন থেকে শুরু করে কাঠ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেই মিস্ত্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুত নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় এনে এসব পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও কাজ শুরু হয়েছে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া, লুটপাট হওয়া পরিবারের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সব ধরনের সাহায্য করা হবে বলে জানিয়েছেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. গোলাম রব্বানী।

সরকারি-বেসরকারি গৃহীত নানা কর্মসূচিতে মাঝিপাড়ার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরগুলোতে নতুন টিনের চাল উঠবে একসময়, পোড়ামাটির গন্ধ হয়তো কমে আসবে, মন্দিরে আবার উৎসবের সজ্জা হবে, তুলশীতলায় শঙ্খ বেজে উঠবে সন্ধ্যাবেলায় কিন্তু যে শিশু নিজের ঘর আগুনে পুড়ে যেতে দেখেছে, মায়ের কোলে বাড়ির পাশে ধানক্ষেতে লুুকিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে সেই শিশু কী আশা নিয়ে বড় হবে? তার মনে যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে তা কী দিয়ে মুছে দেওয়া যাবে?