ক্ষতি ভুলে স্বাভাবিক হতে চায় পীরগঞ্জের জেলে পল্লি

স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে রংপুরের পীরগঞ্জের সেই জেলে পল্লির জীবন। আগুনে পুড়ে যাওয়া তাদের ঘরগুলো পেয়েছে নতুন সজ্জা। জেলেরা শুরু করেছেন মাছ ধরা। উপজেলা প্রশাসনের তদারকি এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের ঘরগুলো মেরামতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগত সহযোগিতায় এখন ধীরে ধীরে আগের জীবন ফিরে পেতে শুরু করেছে জেলে পল্লি।

গত ১৭ অক্টোবর রাতে ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তরা উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর কসবার মাঝিপাড়ায় বাড়ি ঘরে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা অনেক ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। বহু পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ওই পল্লিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা হয়েছে। তালিকায় ২৬ পরিবারের বেশি ক্ষতি এবং হালকা ক্ষতি হয়েছে ৪০ পরিবার। এসব পরিবারকে সরকারি-বেসরকারি, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দেওয়া নগদ টাকাসহ অন্যান্য সামগ্রীর তালিকা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২৬ পরিবার ২ লাখ ২০ হাজার করে নগদ টাকা এবং কাপড়, শুকনো খাবার পেয়েছে। যাদের কম ক্ষতি হয়েছে, তারা অর্ধ লক্ষাধিক টাকা করে নগদ সাহায্য পেয়েছেন।

তারা জানায়, স্থানীয় এমপি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া ১০০ বান্ডিল টিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর বেড়া ও ছাউনি মেরামত করায় মাঝিপাড়া এখন চকচক করছে।

মাঝিপাড়ার নিখিল চন্দ্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুন নাগে দি মোর দোকান ঘরটা পুড়ি দিচে। এক দিন পর ইউএনও স্যার, পিআইও স্যার হামার পাড়ার পোড়া-ভাংগা বাড়িগুল্যা ঠিক করার জন্যে মিস্ত্রি নাগে দেয়। মুই এখন মোর নতুন ঘরে দোকান করোচো’।

ক্ষতিগ্রস্ত দেবেন চন্দ্র বলেন, ‘হামার এমপি স্পিকার আপা টিন আর নগদ ট্যাকা দিছে। পিআইও স্যার সেই টিন দিয়া মোর ঘরগুল্যা একদম নতুন করি বানে দিচে। এ জন্য হামরা সবাই খুশী’।

তিনি আরো বলেন, ‘আগুনে মোর দুটা গরু পুড়ি মারা যায়। মোক গরু, নগদ ট্যাকা, শাড়ি, লুঙ্গি, কম্বল, চাল, ডাল সগি দিচে’।

উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, হামলার পরই দ্রুত ক্ষতির পরিমাণসহ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। হামলার পরদিন থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো নির্মাণ শুরু হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিরোদা রানী রায় বলেন, আমরা দ্রুততম সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিয়েছি। তাদের ঘরগুলোও নতুন টিন দিয়ে মেরামত করা হয়েছে। আমরা বাড়ি ঘরে কোনো ক্ষত রাখতে চাই না। কারণ এ ক্ষত থাকলে তাদের মনে আতঙ্ক থাকবে।

এ দিকে জেলে পল্লির কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া আঁখিরা নদীতে মাছ ধরতে দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজনকে। বুধবার সকালে বটের হাট সেতুর নিচে একত্রিত হয়ে মাছের জাল টেনে নিয়ে নদীর কিনারে আনতে দেখা যায় কয়েকজন জেলেকে।

স্থানীয়রা বলেন, মূলত এই নদী তাদের সাঁতার শেখা থেকে শুরু করে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র ভরসা। এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া আঁখিরার বুকে জাল দিয়ে মাছ ধরা তাদের প্রধান পেশা।

ক্ষতিগ্রস্ত এ পল্লির এক শ গজ দূরে বটের হাট বাজারের পাশে সবুজ শ্যামল ধানখেতের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চিরচেনা আঁখিরার কথা।

জেলেরা জানান, বুধবার সকালে তাদের জালে মাছও উঠেছে অনেক। কারণ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে নদীতে কোনো জাল পড়ে নাই।

সুভাস চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামার কাম মাছ ধরা আর হাটত নিয়ে বেচে বাজার করে আনা। আজ এনা মাছ ধরবের আসছি ছোলগুলোক নিয়ে খামু আর হাট করমু’।

আনন্দ চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে জানান, এক সপ্তাহ হলো নিজের ধরা মাছ খাই না তাই বাড়ির কাছাকাছি মাছ ধরছি।