সন্তানের নিরাপত্তায় ৫ আমল

প্রত্যেক পিতা-মাতাই নিজ নিজ সন্তানের সুস্থতা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এ চিন্তা অমূলক নয়, কারণ সন্তানাদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানতস্বরূপ। এই আমানত রক্ষায় শুধু তাদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক চাহিদা পূরণ করেই দায়িত্ব শেষ হয় না বরং একই সঙ্গে পিতা-মাতার উচিত তাদের সব প্রকার বিপদ-আপদ ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, এটা একটি মৌলিক দায়িত্বও বটে।

হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা সবাই রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার রাখালি (দায়িত্ব পালন) প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যিনি জনগণের নেতা তাকে তার রাখালি (দায়িত্ব) বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের রাখাল (অভিভাবক)। তাদের ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সংসারের রাখাল (ব্যবস্থাপক)। তাকে এর ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে। গোলাম তার মনিবের সম্পদের রাখাল (পাহারাদার)। তাকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হবে। অতএব, সাবধান! তোমরা সবাই রাখাল এবং তোমাদের সবাইকে নিজ নিজ রাখালি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে।’ সুনানে আবু দাউদ : ২৬০০

এ ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন হাদিসে সব প্রকার বিপদ থেকে সন্তানদের রক্ষার জন্য আল্লাহর রাসুল (সা.) উম্মতকে উপদেশ দিয়েছেন। এখানে সন্তানদের বিপদ থেকে রক্ষায় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পাঁচটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলো

দোয়া

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায়শই হজরত হাসান (রা.) এবং হজরত হোসাইন (রা.)-এর নিরাপত্তার জন্য নিম্নের দোয়াটি করতেন।

উচ্চারণ : উয়িজুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি, মিন কুল্লি শায়ত্বানিও ওয়া হাম্মাতি, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।

অর্থ : আমি তোমার জন্য আল্লাহর কালিমার সাহায্যে আশ্রয় চাচ্ছি সব প্রকার শয়তান, হিংস্র প্রাণী এবং বদনজরের বিপদ থেকে। সহিহ্ বোখারি

কোরআনের শেষ তিন সুরা ও আয়াতুল কুরসি

কোরআনে কারিমের সর্বশেষ তিনটি সুরা যথা সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সুরা। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে এই তিন সুরা পাঠ করে ঘুমাতে যেতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন রাতে ঘুমাতে যেতেন, তখন তিনি তার হাতকে মুঠো করে তাতে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস তিন বার করে পাঠ করে তাতে ফুঁ দিতেন। তারপর তিনি তার সারা শরীরের হাত বোলাতেন।Ñ সহিহ্ বোখারি

একইভাবে সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত তথা আয়াতুল কুরসি একই উদ্দেশ্যে পড়া যেতে পারে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, ঘটনাক্রমে একবার শয়তানের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার পর শয়তান তাকে বলে, আয়াতুল কুরসি পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার জন্য একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করেন এবং কোনো শয়তানই তার কাছে আসতে পারে না। পরে তিনি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে এই বিষয় সম্পর্কে বললে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদিও সে নিজে পাকা মিথ্যাবাদী, তথাপি সে তোমাকে সত্য বলেছে। সহিহ্ বোখারি

সুরা বাকারা তেলাওয়াত

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে বাড়িতে সুরা বাকারা তেলাওয়াত করা হয়, সেই বাড়ি থেকে শয়তান দূরে থাকে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের বাড়ি-ঘরকে কবরে পরিণত করো না। যে বাড়িতে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়, শয়তান সেই বাড়ি থেকে পালায়।’ সহিহ্ মুসলিম

টয়লেটের শিষ্টাচার

টয়লেট একটি নোংরা স্থান এবং নোংরা হওয়ার কারণে এখানে শয়তান অবস্থান করে। সুতরাং টয়লেটে মানুষের ওপর শয়তানের নোংরা আক্রমণ ও প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ রয়েছে। টয়লেটে মানুষের প্রয়োজন পূরণের সময় শয়তানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিরাপদে থাকার জন্য তাই হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে যথার্থ শিষ্টাচারের শিক্ষা দিয়েছেন। টয়লেটে প্রবেশের আগে পড়া উচিতÑ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খবাইছ।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে যাবতীয় পুরুষ ও নারী শয়তানদের থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

প্রয়োজন পূরণের পর টয়লেট থেকে বের হওয়ার সময় বলতে হবে

উচ্চারণ : গোফরানাকা আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আজহাবা আন্নিল আজা ওয়া আফানি।

অর্থ : (হে আল্লাহ!) আপনার কাছে ক্ষমা চাই। সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য; যিনি ক্ষতি ও কষ্টকর জিনিস থেকে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন।

সন্তানদের শৈশব থেকেই এই দোয়াসহ আরও বিভিন্ন দোয়া শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি তারা যাতে ভুলে না যায়, সে জন্য নিত্যদিনের দোয়া ঘরের বিভিন্ন স্থানে টানিয়ে রাখা যেতে পারে।

মাগরিবের সময় সতর্কতা

মাগরিবের সময় সন্তানদের ঘরের বাইরে যেতে দিতে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরুৎসাহিত করেছেন। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রাত ঘনিয়ে আসে, তোমাদের শিশুদের ঘরের ভেতর রাখো। কেননা শয়তান এ সময় বেরিয়ে আসে। রাতের কিছু সময় পার হওয়ার পর তোমরা তাদের ছাড়তে পারো।’ সহিহ্ বোখারি

সুতরাং এ সময়ও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে শয়তান সন্তানদের কোনো প্রকার ক্ষতি করতে না পারে।