সরকারের জ্বালানি তেল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোকে অযৌক্তিক উল্লেখ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। দাম বাড়ানোর পরিবর্তে এ খাতে আরোপিত বিভিন্ন ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করে জ্বালানি তেল আগের দরে ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জ্বালানির দরবৃদ্ধি অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তিসংগত নয়। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবেও এটা কোনো আলোকিত সিদ্ধান্ত না।
গতকাল বুধবার ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কতটুকু প্রয়োজন ছিল?’ শীর্ষক একটি ব্রিফিংয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে এ সুপারিশ এবং অভিমত তুলে ধরা হয়। মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সম্মানীয় ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সিপিডি জানায়, ডিজেল এবং কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এবং মধ্যমেয়াদি উভয় ধরনের প্রভাব ফেলবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন, কৃষি এবং বিদ্যুতের খরচ বাড়বে। এরফলে সমস্ত উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার প্রভাবে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম এমন সময়ে বাড়ানো হয়েছে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। কিন্তু যারা দরিদ্র এবং যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছে, যারা কভিড আক্রান্ত অর্থনীতিতে নতুন করে পুনরুদ্ধারের চেষ্টার মধ্যে রয়েছে, তাদের ওপর প্রভাব পড়বে। আমরা যদি ন্যায্যতার কথা বলি সেই ন্যায্যতার দিক থেকেও এটা একটা অন্যায্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই দাম বাড়ানো হচ্ছে বিপিসির লোকসানের কথা বলে। বিপিসির লোকসানের কারণ কী? আমরা জানি এখানে সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিপিসির তেল সংগ্রহ, বিক্রি, মার্কেটিং সিস্টেমে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অনেক অভিযোগ রয়েছে। সেখানে দুর্নীতির খবরও এসেছে।
ফাহমিদা বলেন, মূল্য নির্ধারণ করার মেকানিজমে আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো মেথড দেখি না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্য কম থাকে তখন সেটার সুফল কেন জনগণ পায় না? যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়, লোকসানের দোহাই দিয়ে তখন দাম বাড়ানো হয়। এই যুক্তিকে কোনো বৈজ্ঞানিক বা সঠিক যুক্তি বলে মনে হয় না। সুতরাং এই প্রাইস মেকানিজমটিকে ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে জ্বালানি তেল আবার আগের দামে ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করে ফাহমিদা বলেন, জ্বালানি তেল একটি কৌশলগত পণ্য। এই পণ্য ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলছি পূর্ববর্তী দামে ফিরে যাওয়া দরকার। ডিজেল এবং কেরোসিনের যে মূল্য বাড়ানো হয়েছে, আমরা এই মূল্য প্রত্যাহার করে আগের মূল্যে ফেরত যাওয়ার সুপারিশ করছি। তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তেলের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক কর রয়েছে। সেখান থেকে কোনো একটি শুল্ক প্রত্যাহার করে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। যখন অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সংকট দেখা দেয় বা জরুরি অবস্থা দেখা দেয়, মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর একটা বোঝা হয়ে দেখা দিচ্ছে, তখন সরকারের হাতে বিভিন্ন ধরনের ফিসক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট থাকে। সেই ফিসক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টগুলো তখনই ব্যবহার করার সময়। ভর্তুকি বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে কেন এই মুহূর্তে দেওয়া হবে না? না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনেতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। নৈতিকভাবেও সঠিক হয়নি। রাজনৈতিকভাবেও এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০২২ অর্থবছরে প্রক্ষেপণ হচ্ছে বিপিসি থেকে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকার ৭ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা আয় করার কথা লিখেছে। সুতরাং ৭ হাজার দুইশ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার জন্য এই আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করলে আর বাড়তি টাকার প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট সমন্বয় করেই সরকার লোকসানের টাকা সমন্বয় করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জম, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান প্রমুখ।
কভিড-১৯ এর বিরূপ প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধারের পরিপ্রেক্ষিতে, পণ্যটির ‘কৌশলগত’ প্রকৃতির কারণে জ্বালানির দামের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পটভূমিতে, সিপিডি অবিলম্বে ডিজেল এবং কেরোসিনের আগের দামে ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা বিশ্লেষণ করে সংস্থার পক্ষে বলা হয়, গত সাত বছরে এ বাবদ সরকারের লোকসানের চেয়ে মুনাফার পরিমাণ বেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিপিসির বিক্রি এবং সরবরাহ পর্যায়ে শুল্ক প্রত্যাহার করে নিলেই দামবৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের মূল্য নিম্নগামী হবে বলে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন বৈশি^ক সংস্থা তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে। এখন করোনার অভিঘাত থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় জ্বালানির দরবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সাধারণ জনগণ চাপে পড়বে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।