প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মো. মুরাদ হাসান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তার পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পৌঁছায়। পরে এ বিষয়ে সারসংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। এরপর সেটি বঙ্গভবনে গেলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। পরে রাতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে অসৌজন্যমূলক বক্তব্য দেওয়ায় এবং নারী সেলিব্রেটিকে অশালীন প্রস্তাব দেওয়ার অডিও ফাঁস হওয়ার প্রেক্ষাপটে মুরাদ হাসানকে গতকালের মধ্যে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নির্দেশনার পর পদত্যাগ করেন তিনি।
সম্প্রতি তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমান ও নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে বর্ণ ও নারীবিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেন। তার বক্তব্য নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলার মধ্যেই মুরাদের একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়। সেখানে তিনি অশালীন ভাষায় চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য বলেন। চিত্রনায়ক ইমনকে প্রতিমন্ত্রী চিত্রনায়িকা মাহিকে ঘাড় ধরে তার কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ফোনে তিনি মাহিকে হুমকিও দেন। বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে মুরাদের শাস্তির দাবি ওঠে।
তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ‘নারী বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্য দল বা সরকারের নয় বলে সোমবার সকালে জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরপর বিষয়টি নিয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগের বার্তা পৌঁছে দেন ওবায়দুল কাদের।
২০১৯ সালের ১৯ মে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মুরাদ হাসানকে। কিন্তু তিনি তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন ২০২১ সালের ১৯ মে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ উল্লেখ করা সালটি সঠিক নয়। তার পদত্যাগপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন।
এই তথ্যবিভ্রাটের পাশাপাশি আরও দুটি অসংগতি রয়েছে। পদত্যাগপত্রের শুরুতেই মুরাদ উল্লেখ করেছেন ‘স্ব-শ্রদ্ধেয় সালাম’। এখানে ‘সশ্রদ্ধ সালাম’ যুক্তিযুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পদত্যাগপত্রে ‘অব্যহতি’ লেখা হয়েছে। বাংলা একাডেমির বানান অভিধান অনুযায়ী শব্দটি ‘অব্যাহতি’।
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেশাগত জীবনে চিকিৎসক মুরাদকে প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিলতে না পারার কারণে তার দপ্তর বদলানো হয়। দেওয়া হয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে। দুই মন্ত্রণালয়ে দুজন ডাকসাইটে মন্ত্রী থাকায় মুরাদ তার কোনো ‘মুরোদ’ দেখাতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নৈতিক স্খলনজনিত কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন। নৈতিক স্খলনের দায়ে দ-িত হলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে সংসদ সদস্য থাকা সম্ভব না। এছাড়া মামলার ভয় তো রয়েছেই। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোক দিয়ে নায়িকাকে হোটেলে নিয়ে আসার হুমকিও বিষয়টিকে আলোচনায় টিকিয়ে রাখবে।
মুরাদের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না এ প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ সদস্য জনগণের নির্বাচিত। তাই চাইলেই বাদ দেওয়া যায় না। তিনি আরও জানান, গত কয়েক মাস ধরে তিনি মুরাদ হাসানের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছিলেন। তিনি মুরাদ হাসানের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করেন। তাকে সব সময় সহযোগিতা করেছেন জানালেও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মুরাদ তার বক্তব্যে সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন তথ্যমন্ত্রী।