এমপি পদ হারানোর ঝুঁকিতে মুরাদ

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর পদ হারানোর পর এবার সংসদ সদস্য (এমপি) পদ হারানোর ঝুঁকিতে ডা. মুরাদ হাসান। জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসন থেকে নির্বাচিত এই এমপিকে ইতিমধ্যেই জেলা আওয়ামী লীগের পদ থেকে অব্যাহতি দিতে কেন্দ্রে সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। একই সঙ্গে অডিও কেলেঙ্কারিতে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট করায় মুরাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।

আওয়ামী লীগদলীয় একাধিক মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছেন, জেলা কমিটি এর মধ্যে তাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ ব্যাপারে কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে তারা মুরাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়ে সুপারিশ করবেন। তবে দলীয় সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার বিষয়ে যেকোনো সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

মুরাদের এমপি পদ থাকার বিষয়ে সংবিধানে অস্পষ্টতা রয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কেউ এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ওই দল হতে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে তার আসন শূন্য হবে। এদিকে, সংবিধানের ৬৬(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি এমপি থাকার যোগ্য হবেন নাযদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত হন।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে মুরাদকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে এক ‘জরুরি’ সভায় এই সিদ্ধান্ত হয় বলে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ জানান। এ সিদ্ধান্ত দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো হবে বলে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহামেদ চৌধুরী জানান।

মুরাদের দলে প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল হবে কি না, জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা সেন্ট্রালি (কেন্দ্রীয় কমিটি) সিদ্ধান্ত নেব। পরবর্তী ওয়ার্কিং কমিটিতে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। তা ছাড়া, আমরা গাজীপুরের মেয়র এবং ওই মহানগরের সাধারণ সম্পাদকের ব্যাপারে এভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ছাড়া করার কোনো সুযোগ নেই।’

এমপি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটি পরের ব্যাপার। এ বিষয়ে স্পিকার সিদ্ধান্ত নেবেন। এখন আপাতত যেটা হয়েছে, তিনি একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তাকে সে পদ থেকে সরে যেতে হলো। দলের একটা পদ থেকেও তিনি অব্যাহতি পাচ্ছেন। এমপির বিষয়েও যদি সেরকম গুরুতর কোনো অভিযোগ আসে, সেটা স্পিকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’

মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের দায়িত্বশীল পদে থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশানুযায়ী প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদে পৌঁছেছে। আমি তার সুস্থতা এবং মঙ্গল কামনা করি। তার এই ঘটনাগুলো আসলে দুঃখজনক। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি আমাদের কোনো কাজে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি বরং ডা. মুরাদ হাসান আমাকে সবসময় সহযোগিতা করে এসেছেন। সেজন্য তাকে আমি ধন্যবাদ জানাই।’ তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে তার মধ্যে আমি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। তার কিছু বক্তব্য ও ঘটনা সরকার এবং দলকে বিব্রত করেছে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করার জন্য বলেছেন।’

ডা. মুরাদ বলতেন, ‘তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেই বিভিন্ন মন্তব্য করেন।’-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে কিছু বলেছেন বলে আমার জানা নেই। আমি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি। দল বা সরকার বিব্রত হয় এমন কোনো কথা বা কর্মকান্ড প্রধানমন্ত্রী কখনো কারও জন্যই অনুমোদন করেন না।’

জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান হুইপ নূর-ই-এলাহী চৌধুরী লিটন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতীতের দৃষ্টান্তগুলো ফলো করুন। লতিফ সিদ্দিকীর সময় কী হয়েছিল সেটা দেখুন।’

এর আগে ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। পরে ২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় তাকে। কিন্তু দলীয় পদ হারানোর পরেও তার এমপি পদ বহাল ছিল। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে অতীতে কেউ আর মূলধারায় ফিরতে পারেনি। লতিফ সিদ্দিকী, গোলাম মাওলা রনি, আরিফ খান জয় নিকট অতীতের উদাহরণ। মুরাদ হাসানও তাদের কাতারেই শামিল হতে যাচ্ছেন, ধরেই নেওয়া যায়।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে। তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

সদস্যদের আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (১) কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি (ক) তাঁহার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিতে অসমর্থ হন। তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বে স্পিকার যথার্থ কারণে তাহা বর্ধিত করিতে পারিবেন; (খ) সংসদের অনুমতি না লইয়া তিনি একাদিক্রমে নব্বই বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন; (গ) সংসদ ভাঙ্গিয়া যায়; (ঘ) তিনি এই সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হইয়া যান; অথবা (ঙ) এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। (২) কোনো সংসদ-সদস্য স্পীকারের নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন, এবং স্পীকার কিংবা স্পীকারের পদ শূন্য থাকিলে বা অন্য কোনো কারণে স্পীকার স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ডেপুটি স্পীকার- যখন উক্ত পত্র প্রাপ্ত হন, তখন হইতে উক্ত সদস্যের আসন শূন্য হইবে।’

সম্প্রতি একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে মুরাদ হাসানের ফোনালাপে কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল আলাপের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। একজন প্রতিমন্ত্রীর মুখে এ ধরনের ভাষায় বিব্রত হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে তিনি সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মাধ্যমে ডা. মুরাদকে পদত্যাগের জন্য নির্দেশ দেন।

মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় ছিলেন ডা. মুরাদ। প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয় তাকে। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সূত্রে জানা যায়, তার কিছু পদক্ষেপ এবং কথাবার্তায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও বিব্রত হন। পরে প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ২০১৯ সালের মে মাসে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। এখানে এসেও বিতর্কিত বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন ডা. মুরাদ। সর্বশেষ রাষ্ট্রধর্ম, দেশের রাজনীতি, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নাতনিসহ নানা বিষয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেন তিনি। দলীয় বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে উত্তেজিত বক্তব্য দিয়েও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেন দলের শীর্ষ নেতাদের। বিব্রত হয় তার নির্বাচনী আসন জামালপুর-৪ আসনের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও।

এর বাইরে মঞ্চে উঠে গান গেয়ে দর্শক মাতানো, টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার মতো ঘটনাও ঘটান ডা. মুরাদ। প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে মঞ্চে গান গাওয়া, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হালকাচালের মন্তব্য ও হাস্যরস করার ঘটনায় বিব্রত হচ্ছিলেন দল ও মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরাও। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা থেমে ছিল না। সবশেষে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজের কর্মফলের তিলক পরলেন ডা. মুরাদ। কিন্তু তার কর্মে দল-সরকার, রাজনীতিসহ সব স্তরের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ আর সমালোচনার সাগর তৈরি হলো, তার পানি আর কত দূর গড়ায় তা দেখার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।

নানা বিতর্কিত মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জের ধরে মন্ত্রিত্ব ও দলীয় পদ হারানো ডা. মুরাদ হাসানের শাস্তিটা কম হয়েছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী আরমা দত্ত। মুরাদ হাসান যে জঘন্য অপরাধ করেছেন তাতে তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংরক্ষিত নারী আসনের এই সদস্য। আরমা দত্ত বলেন, ‘ওনার শাস্তিটা আরও বেশি দেওয়া উচিত। ওনাকে ব্ল্যাকলিস্ট করা উচিত সমস্ত কিছু থেকে। ওনার সিটিজেনশিপটাই (নাগরিকত্ব) কেটে দেওয়া উচিত।’

নারীদের প্রতি মুরাদ হাসানের আক্রোশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নারীদের প্রতি তার আক্রোশের কারণ হলো, নারীরা আজকাল অনেক এগিয়ে গেছে। তারা তাদের জায়গাগুলো দখল করে নিচ্ছে। নারীদের বিপরীতে মুরাদ হাসানরা নিজেদের দুর্বল মনে করছে। তাদের মন-মানসিকতা বিকৃত। তারা বিকৃত লোক। তারা জঘন্য। তারা পশুরও অধম। পশুকে, কুকুরকে মারলে কুকুর কামড়াতে আসে। এমনিতে কামড়ায় না। তারা কুকুরেরও অধম।’

মন্ত্রিত্ব ও জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের পদ হারানোর পর  ডা. মুরাদের এমপি পদ নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে ঢাবির এক শিক্ষার্থী গতকাল রাতে শাহবাগ থানায় অভিযোগ করেন। আবার অভিযোগ পেলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডা. মুরাদ হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) হারুনুর রশীদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘কেউ যদি আমাদের কাছে অভিযোগ দেয় তাহলে আমরা তদন্তের জন্য মুরাদ হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করব। উনি যে ডিবির নাম ব্যবহার করেছেন, সেটা কেন করলেন, সেটাও প্রয়োজনে জানার জন্য আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি। পাশাপাশি যাদের সঙ্গে এই ধরনে ঘটনা ঘটেছে, প্রয়োজন হলে তাদেরও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিনেত্রী মাহিয়া মাহি পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে বুধবার দেশে ফিরবেন। এরপর তিনি যদি কোনো মামলা করেন, বা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গতকাল মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ডা. মুরাদ হাসান। ই-মেইলে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। এরপরই সন্ধ্যায় তাকে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। 

দল থেকে বহিষ্কার করলে মুরাদ হাসানের এমপি পদের কী হবে এ প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেডআই খান পান্না বলেন, এখানে সংবিধানের অস্পষ্টতা আছে। তবে নৈতিক স্খলনের জন্য দল যদি তার সদস্যপদ খারিজ করে তাহলে এমপি পদ থাকবে না। মুরাদকে মূলত বহিষ্কার করা হচ্ছে নৈতিক স্খলনজনিত কারণে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংবিধান লিখিত। কিন্তু সবকিছুই তো আর লিখিত নেই। তাই দল যদি মনে করে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য, তাহলে তিনি এমপি থাকতে পারবেন না।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ  সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে আছে, কেউ যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তার এমপি পদ থাকবে না। কিন্তু দল বহিষ্কার করলে তার সদস্যপদ যাবে না। আবার কেউ যদি ফৌজদারি অপরাধে দুই বছরের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত হন তাহলেও তার এমপি পদ যেতে পারে। আমি সবসময় কথা বলার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার বিরুদ্ধে। এটা বাক-স্বাধীনতার পরিপন্থী। আমি যত বাজে কথাই বলি না কেন, যত অপ্রিয় কথাই হোক, এটার জন্য ডিজিটাল আইনে মামলা হচ্ছে বলেই তো আমাদের কথাবার্তা অনেক কমে গেছে। কিন্তু উনি যে কাজটি করেছেন, তার জন্য যার মানহানি হয়েছে, তার জন্য তিনি দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারেন। এ ছাড়া ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। আর উনি মস্তিষ্ক বিকৃত বলে যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা করতে গেলে সরকারি কোনো হাসপাতালে মেডিকেল পরীক্ষার পর চিকিৎসকের সার্টিফিকেট লাগবে যে উনি একটা ‘পাগল’। তাহলে তার এমপি পদ চলে যেতে পারে।’

প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনসুর হাবীবও বলেছেন, ‘উনি (মুরাদ) যার উদ্দেশ্যে বলেছেন, তিনি তো ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। শুধু কটু মন্তব্যের জন্য তার এমপি পদ যাওয়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’

মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘উনি যে অপরাধ করেছেন সেটা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য। সংবিধানের ১১১ ধারা অনুযায়ী উনার আচরণ একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী চাইলে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। আমি চাই উনি পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করুন। তা না হলে উনার বিরুদ্ধে দলের উচিত হবে তাকে সংসদ থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সেটা না করলে জনগণের জন্য দুঃখজনক হবে। তা না হলে সমাজ বা জনগণই হয়ত উদ্যোগ নেবে।’

সাজানো দপ্তরে বসা হলো না মুরাদের : সবেমাত্র সচিবালয়ে নিজের দপ্তরটি গুছিয়ে এনেছিলেন ডা. মুরাদ হাসান। তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে দপ্তরে বসতেন তিনি সেটা ব্যাপক সংস্কার করে সৌন্দর্যবর্ধন করা হচ্ছিল। সাজানো-গোছানোর কাজও প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখনই বিতর্কিত কর্মকান্ড এবং অশালীন বক্তব্য ও কথোপকথনের কারণে মন্ত্রিত্ব হারালেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গতকাল পদত্যাগ করেছেন। হারাতে হয়েছে দলীয় পদও।

গতকাল সচিবালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের সংস্কারকাজ চলছে। এতদিন অন্য কক্ষে বসতেন ডা. মুরাদ। তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পদত্যাগী প্রতিমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারেই তার দপ্তরের সংস্কারকাজ চলছে। কাজ চলবে। এখানে কে বসবেন সে সিদ্ধান্ত পরে হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, গতকাল মন্ত্রণালয়ে আসেননি ডা. মুরাদ। আগের দিন গত সোমবার চট্টগ্রামে যান। সেখান থেকেই তিনি দপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র তৈরি করেন। পরে সেটি তার কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয় এবং তিনি সেখানে স্বাক্ষর করে ই-মেইলে ফেরত পাঠান। পদত্যাগপত্রের কিছু ভুল সংশোধন করে পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়।

প্রথমে ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হন ডা. মুরাদ হাসান। পরে ৬ মাসের মাথায় স্বাস্থ্য বিভাগে নানা ধরনের বিতর্কের কারণে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ২০১৯ সালের মে মাসে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মুরাদ হাসান জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য।

মুরাদ হাসানের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে তার (মুরাদ হাসান) মধ্যে আমি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করেছি। তার কিছু বক্তব্য ও ঘটনা সরকার এবং দলকে বিব্রত করেছে। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করার জন্য বলেছেন এবং সে অনুযায়ী তার স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র তার জনসংযোগ কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিয়ে গেছেন।’ এ সময় তথ্যমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মুরাদ হাসানের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করেন।