বদমেজাজ বলতে বোঝায় সামান্য বিষয়ে রাগারাগি, বকাঝকা ও গালাগাল করা। বদমেজাজি ব্যক্তি যা বলে সেটাই করে। যার মধ্যে কারও মতামত শোনা কিংবা আপস-মীমাংসার মনোভাব থাকে না। তারা হয় অহংকারী, উদ্ধত, রুক্ষ, নির্দয় ও একগুঁয়ে স্বভাবের। এই স্বভাবের মানুষের ঘর-সংসার নরকসম। বদমেজাজি মানুষ শুধু নিজেই অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকে তা নয়, এই স্বভাবের মানুষের চারপাশের লোকদের মানসিক কষ্ট-যাতনা ও অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দাম্পত্য জীবন থেকে ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও সুসম্পর্ক বিদায় নেয়। সর্বদা ঝগড়াঝাঁটি ও বিবাদ-কলহ লেগে থাকে। এমন লোকের কারণে সমাজে প্রচুর সমস্যা ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে এই স্বভাবের মানুষ বন্ধু ও সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করে কোরআনে কারিমের এক আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছিলে। যদি তুমি রূঢ় কঠোরচিত্ত হতে, তাহলে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত...।’ সুরা আলে ইমরান : ১৫৯
বদমেজাজি অহংকার থেকে উদ্ভূত। এ ধরনের মানুষ আল্লাহর কাছে ঘৃণিত, মানুষের কাছেও ঘৃণিত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘...নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ সুরা লোকমান : ১৮
হাদিসে এসেছে, হজরত হারিস ইবনে ওয়াহাব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০১
হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কি জাহান্নামিদের কথা বলব না? তারা হলো, যারা অনর্থক কথা নিয়ে বিবাদ করে, আর যারা বদমেজাজি অহংকারী।’ মিশকাত : ৫১০৬
হজরত জারির (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, যাকে কোমলতা ও নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিশকাত : ৫০৬৯
একবার হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘কোমলতা নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও এবং কঠোরতা ও নির্লজ্জতা থেকে নিজেকে বাঁচাও। কারণ যাতে নম্রতা ও কোমলতা থাকে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়। আর যাতে কোমলতা থাকে না, তা দোষণীয় হয়ে পড়ে।’ সহিহ মুসলিম : ২৫৯৪
নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কালো দাগ হয়ে গেছে। রোজা কখনোই ছাড়েননি, যৌবন আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত পর্দা করে আছেন মাশাআল্লাহ। এত ইবাদতের পরও হাশরের ময়দানে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়ে যেতে পারেন শুধু বদমেজাজি ও অশ্লীলভাষী হওয়ার কারণে! স্পষ্টভাবে হাদিসে এসেছে, বদমেজাজি ও অশ্লীলভাষীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জান্নাত নম্র ও বিনয়ী মানুষদের জন্য। তবে ‘আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব ও আল্লাহর জন্য শত্রুতা’ এই নীতির আলোকে মেজাজ প্রয়োগ করা যাবে। যেমন কেউ আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে, ইসলামের অকাট্য বিষয় নিয়ে বেয়াদবি করলে সে ক্ষেত্রে রাগ প্রযোজ্য। কোনো জালেমকে দুর্বলের ওপর জুলুম করতে দেখলে সে ক্ষেত্রে মেজাজ প্রয়োগ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তার সহচররা কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল...।’ সুরা ফাতহ : ২৯
সুতরাং কারও ভালো কিংবা মন্দ কথায় হুট করে রেগে না যাওয়া, চিল্লাচিল্লি না করা। রাগী আচরণ কোনো সমাধান নয়, সুন্দর ও কোমল ভাষায় শান্তভাবে কথা খুব কঠিন কিছু নয়। দরবেশ আলেমরা বলেছেন, মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করুন, দুনিয়ায় মেজাজ দেখিয়ে জান্নাত হারাবেন না। একজন মুমিন কখনো বদমেজাজি ও অশ্লীলভাষী হতে পারে না। নবী করিম (সা.)-এর হাদিসটি মনে রাখুন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘...তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতি হবে। এক প্রকার মানুষ তারা, যারা রাষ্ট্রীয় কর্ণধার, ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী এবং নেক কাজের তাওফিক লাভে ধন্য। দ্বিতীয়ত, ওইসব মানুষ, যারা দয়ালু এবং আত্মীয়স্বজন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি কোমলচিত্ত। তৃতীয়ত, ওই শ্রেণির মানুষ, যারা পূতপবিত্র চরিত্রের অধিকারী, যাচ্ঞাকারী নয় এবং সন্তানাদি সম্পন্ন লোক।’ সহিহ মুসলিম : ৭০৯৯