নিশ্চয় এ দুনিয়া সুমিষ্ট, সবুজ শ্যামল ও চাকচিক্যময় এবং আকর্ষণীয়। আল্লাহতায়ালা মানুষকে দুনিয়ায় তার প্রতিনিধি নিয়োজিত করেছেন। তিনি দেখতে চান, মানুষ কেমন কাজকর্ম করে। অতএব দুনিয়ার যাবতীয় ফেতনা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। কেননা দুনিয়া ছলনাময় ছাড়া আর কিছু নয়, এর নেয়ামতসমূহ বিলীন হবে ও এর সম্পদসমূহ বিলুপ্ত হবে। ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, সবকিছুই নশ্বর, অবিনশ্বর শুধু আল্লাহ। যিনি মহিমাময়, মহানুভব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেবলমাত্র কিয়ামতের দিনই তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই তো সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়।’ সুরা আলে ইমরান : ১৮৫
দুনিয়ায় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা এমন একটি কর্তব্য, যার জন্য আমানতদারিতা আবশ্যক। আর আল্লাহ মানুষের ওপর সেই আমানতদারিতা অর্পণ করেছেন। যা বহন করতে শঙ্কিত হয়েছে আসমান, জমিন ও পর্বতমালা। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমরা তো আসমান, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা বহন করতে অস্বীকার করল ও তাতে শঙ্কিত হলো, আর মানুষ তা বহন করল; সে অত্যন্ত জালেম, খুবই অজ্ঞ।’ সুরা আল আহজাব : ৭২
আমানতদারিতার জন্য আবশ্যক সততা, পবিত্রতা, নিষ্ঠা, চুক্তি ও ওয়াদাপূরণ, হক আদায় ও দায়িত্ববোধ এবং হারাম বর্জন। এগুলো উন্নত চরিত্রের ভূষণও বটে। পক্ষান্তরে খেয়ানত হচ্ছে, দুর্নীতি এবং তা মুনাফেকির আলামত। কাজেই যদি আমানতদারিতা চলে যায়, আর প্রকাশ্যে দুর্নীতি ও খেয়ানত চলতে থাকে; তখন ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীলতা লক্ষ্যচ্যুত হয় এবং ভালোকে মন্দ আর মন্দকে ভালো হিসেবে বিবেচনা করা হয়! সম্মানহানি ঘটে, অধিকার হরণ হয়, সর্বত্র সম্পদের অপব্যবহার ও লুটপাট হতে থাকে, মূল্যবোধ ও সভ্যতা-সংস্কৃতি বিকৃত হয় এবং জাতি ও সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহ ও তার রাসুলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতের খেয়ানত করো না।’ সুরা আনফাল : ২৭
দুনিয়ায় প্রতিনিধিত্ব করা এমন একটি কর্তব্য, যা দৃঢ় প্রত্যয়, পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ ও সংস্কারকে আবশ্যক করে এবং মূর্খদের নিয়ন্ত্রণ ও বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয় মোকাবিলায় সংগ্রামকে জরুরি মনে করে। কেননা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি শহর ও গ্রামাঞ্চলের সব মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ। তা শস্যক্ষেত্র ও প্রাণী ধ্বংস করে। আর আল্লাহ ফ্যাসাদ ভালোবাসেন না। জমিনে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা পতন ও ধ্বংসের অশুভ লক্ষণ। এ ধরনের অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টির অন্যতম বাহ্যিক লক্ষণ হলো, প্রতারণা ও জালিয়াতি করা, দুর্ব্যবহার করা, ষড়যন্ত্র করা, ঘুষ খাওয়া, আত্মসাৎ ও দুর্নীতি করা, বেআইনি সুবিধাভোগ, অপচয় ও অপব্যবহার করা, ধোঁকা দেওয়া এবং অর্থপাচার করা ইত্যাদি। এগুলো উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বিঘিœত করে এবং জনগণের চাহিদা পূরণে অন্তরায়।
জমিনে প্রতিনিধিত্ব করা একটি পরীক্ষা। এ জন্য আত্মপর্যালোচনা ও আল্লাহর ভয় থাকা আবশ্যক। কেননা কিয়ামতের দিনে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগে কোনো বান্দার পা-দুটি আল্লাহর সামনে থেকে সরবে না। এক. তার জীবনকাল সম্পর্কে, কীভাবে অতিবাহিত করেছে? দুই, তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে তা ক্ষয় করেছে? তিন ও চার. তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে কোথা থেকে তা উপার্জন করেছে এবং তা কী কী খাতে ব্যয় করেছে? পাঁচ. তার ইলম সম্পর্কে, সে তা অনুযায়ী কী কী আমল করেছে?
দুনিয়ার বুকে প্রতিনিধিত্ব করা একটি নেয়ামত, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আবশ্যক। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, পরিমিত ব্যয় ও অপচয় না করা, নেয়ামতসমূহ সংরক্ষণ ও তা নষ্ট না করা। কেননা নেয়ামতের অস্বীকার তা বিলুপ্তি ও বিনাশের কারণ, আর অপচয় হচ্ছে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির শামিল এবং তা অশান্তিরও কারণ। ইসলাম মানুষের ধন-সম্পদের সুরক্ষা দেয়। যা শরিয়তের পাঁচটি উদ্দেশ্যের অন্যতম। সেগুলো হলো জান, মর্যাদা, বিবেক, দ্বীন ও সম্পদের সুরক্ষা। এ জন্যই বিধিবিধান আরোপ করা হয়েছে এবং তা রক্ষায় শাহাদাত বরণেরও অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে ইসলাম গুরুত্বারোপ করেছে। সেগুলো জবরদখল, লুণ্ঠন, অপব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতিকে আত্মসাৎ হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং কেউ অন্যায়ভাবে কিছু আত্মসাৎ করলে, যা সে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করবে তা সঙ্গে নিয়ে সে কিয়ামতের দিন আসবে। তারপর প্রত্যেককে যা সে অর্জন করেছে তা পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।’ সুরা আলে ইমরান : ১৬১
আত্মসাৎ হচ্ছে, এমন কিছু লুণ্ঠন করা যাতে ব্যক্তির কোনো অধিকার নেই। যেকোনো কিছুতে খেয়ানত করল, সেই আত্মসাৎ করল। হজরত উবাদা বিন সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আত্মসাৎ করা থেকে সাবধান থাকো, কেননা এটা তার জন্য কিয়ামতের দিন লজ্জা, অপমান ও কলংকের কারণ হবে।’ মুসনাদে আহমাদ
প্রত্যেক লুণ্ঠিত দ্রব্য, আত্মসাৎকৃত মাল, ঘুষ ও অন্যায় পথে উপার্জন ইত্যাদি এসবই অবৈধ। আর অবৈধ উপার্জনে বেড়ে ওঠা দেহের জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত স্থান। হজরত কাব বিন উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে কাব! হারাম খাদ্যে প্রতিপালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না; জাহান্নামই তার জন্য উপযুক্ত। হে কাব! মানুষের প্রাত্যহিক কর্মপ্রচেষ্টা দুই রকমের হয়, কিছু মানুষ নিজেকে সৎকর্মের মাধ্যমে ক্রয় করে মুক্ত করে নেয়। আর কিছু মানুষ নিজের ধ্বংস সাধন করে।’ সহিহ্ ইবনে হিব্বান
ইসলাম সরকারি কিংবা সর্বসাধারণের সম্পত্তি রক্ষার বিষয়কে মানুষের রক্তের মূল্যের ন্যায় গুরুত্বারোপ করে। এ বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হারামের পরিণাম দেউলিয়াত্ব, এর পরিতাপ বিষাদময়। হজরত খাওলা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কিছু লোক আল্লাহর দেওয়া সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যয় করে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নামের আগুন রয়েছে। সহিহ্ বোখারি
অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করাকে আল্লাহ হারাম করেছেন। যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ বিনষ্ট করবে, তার ওপর আল্লাহ ক্ষতিপূরণ আবশ্যক করেছেন। কারও সম্মানহানি করা হলে তার জন্য কঠোর বিধান দিয়েছেন। অপাত্রে ও ভিন্ন খাতে সম্পদ ব্যয় করতে তিনি নিষেধ করেছেন এবং অপব্যয় করা হারাম করেছেন। সুতরাং মানুষের কর্তব্য হলো, হালাল ও উৎকৃষ্ট উপার্জনের প্রচেষ্টা করা, কোনোভাবে নিকৃষ্ট বস্তুর সন্ধান ও চেষ্টা না করা। যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত উপায়ে সম্পদ অর্জন করবে, সে তাতে বরকত পাবে।
১০ ডিসেম্বর, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।
অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান