মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধের হুংকার নিয়াজির

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সহকর্মীদের নিয়ে সদ্যমুক্ত যশোর পরিদর্শন করেন। বিপুলসংখ্যক লোকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তাদের অভ্যর্থনা জানায়। ১২ ডিসেম্বরের বিদেশি পত্রিকায় এই খবর খুব গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়। 

‘দি সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার অপর এক খবরে বলা হয়, গত শুক্রবার (১০ ডিসেম্বর) মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর মারফত গভর্নর ড. মালিকের প্রস্তাব ঢাকায় নিয়োজিত জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে পেশ করা হয়। এগারো ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজি হঠাৎ ঢাকা বিমানবন্দরে হাজির হয়ে দম্ভভরে ঘোষণা করেন, তিনি পালিয়ে যাননি। তার মৃত্যুর পূর্বে ঢাকার পতন হবে না।

১২ ডিসেম্বর বিকেলে লন্ডনের হাইড পার্ক এলাকার স্পিকার্স কনারের কাছে প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী বাঙালির এক গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমের স্বীকৃতির দাবি করা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি করা হয়।

রণাঙ্গনে এই দিন সকাল ৮টায় নরসিংদীতে পাকিস্তানিদের পতন হয়। বিকেলের দিকে ভারতের আরও একটি ইউনিট ডেমরা ঘাট থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এসে হাজির হয়। ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার আগে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্যারাসুট ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে ঢাকা অভিযানের সর্বাপেক্ষা ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়।

১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে এক বিশেষ জনসভা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা করায় মার্কিন প্রশাসনের হুমকির জবাব দিতেই এই জনসভা করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী সেদিন ভারতের জনসাধারণকে ‘আসন্ন বিপদ’ ও ‘দীর্ঘতর যুদ্ধের সম্ভাবনা’ সম্পর্কে সচেতন করেন। ওইদিনই জাতিসংঘের মহাসচিব উ থানকে এক বার্তায় তিনি জানান যে, ভারত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারতীয় সৈন্য স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত, এর একমাত্র শর্ত হচ্ছে পাকিস্তান যেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় পৌঁছাতে সম্মত হয় এবং পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে।

এই দিনে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের লোকজনকে রয়্যাল এয়ারফোর্স এসে নিয়ে যায়। ঢাকায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা চলে। ওদিকে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা ঢাকায় তখন ঘোষণা করেছে কারফিউ। ওই সময়ের ঢাকার অবস্থা জানা যায় সুফিয়া কামালের লেখায় : ‘ঢাকার বাড়িঘর অধিকাংশ শূন্য। ভয়াবহ নীরবতা আতঙ্ক-আশঙ্কায় মানুষ শ্বাস রোধকারী আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমার ভয় নেই শঙ্কা নেই। আল্লাহ আছে। চাটগাঁ বিচ্ছিন্ন। কোথাও থেকে কারুর কোনো খবর পাচ্ছি না। ফোনও মৃত’।

(সূত্র : মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন; ডেইলি টেলিগ্রাফ ডিসেম্বর ১২ ও ১৩, ১৯৭১)