ষড়যন্ত্র কি না খতিয়ে দেখছে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্বের নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রসহ অনেক ইস্যুতেই নানা সূচকে দেশটি অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং দেশকে নিষেধাজ্ঞায় ফেলে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে সেটি তুলে নেয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইস্যু, নির্বাচন এবং রাজনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে এবং সমালোচনাও করেছে। সম্প্রতি দেশের নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণের কথাও বলেছে। আবার বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসাও করে আসছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের ভূয়সী প্রশংসাও করেছে দেশটি। সম্প্রতি করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

তবে এবারই প্রথম র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র। হঠাৎ করে কোনো ধরনের আগাম সমালোচনা বা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই একটি বিশেষ ফোর্সের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের এ নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার ঘটনায় সরকারের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি কতটা হলো? পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে? আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে, চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে যাওয়ার কারণেই কি যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তা দিল? সে ক্ষেত্রে সদ্য যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হওয়া দুদিনের গণতন্ত্র সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার মতো বাংলাদেশের আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

দেশ যখন স্বাধীনতার ৫০ বছরের উৎসবের আমেজে ঠিক তখনই এ ধরনের ঘোষণা কিছুটা অস্বস্তিকর বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে এতে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে  না। অন্যদিকে ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে ‘তৃতীয়পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে’ দাবি করে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার এবং বন্ধু দেশগুলোর কাছে সব বিষয়ে ‘সঠিক তথ্য’ তুলে ধরার পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা।

কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে মানবাধিকারের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে। যাদের মাধ্যমে তারা তথ্য নেয় সেই তথ্য অনুযায়ী দেশটি প্রতিবেদন তৈরি করে। আবার তাদের কিছু রাজনৈতিক মোটিভ থাকে। সেই অনুযায়ী তারা কাউকে চাপে বা প্রভাব তৈরির চেষ্টা করে। এবার ঠিক কোন কারণে এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না। এটা যে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় এটা পরিষ্কার। তবে কেন যুক্তরাষ্ট্র এরকম আচরণ করছে সেটি সরকারকে কূটনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করার পরামর্শ দেন তারা।

এদিকে সরকারপক্ষও এ নিয়ে বসে নেই। হঠাৎ করে কোনো আগাম সতর্কতা বা আলোচনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের এ নিষেধাজ্ঞায় প্রথমে কিছুটা বিস্মিত হলেও ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। গত শুক্রবার রাতেই ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। শনিবার সকালে দেশটির রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে তলব করে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। এতেই বসে নেই সরকার। ঘটনার কারণ জানতে রবিবার সকালেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেন। গতকাল সোমবার বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানান বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা ও একাধিক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব দেবে। বিষয়টি কূটনৈতিকভাবেই মোকাবিলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ধারণা করা হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে এবং বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াতেই এ ঘোষণা। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক মন্ত্রী বলেন, আমরা বিষয়টি দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরী সম্পর্ক নেই। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব নীতিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। আলোচনার মাধ্যমে জানা যাবে কী হচ্ছে। তবে কেন হঠাৎ করে তারা এ নিষেধাজ্ঞা দিল এর কারণ জানতে হবে। দেশের মধ্যে থেকে কোনো বিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্র করতে পারে, সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক মন্ত্রী ও এমপিরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানো এবং একই সময়ে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা ‘ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের’ প্রতিফলন ছাড়া আর কী হতে পারে? তারা বলছেন, দেশের ভেতর থেকেও এটা ষড়যন্ত্র হতে পারে। আবার ক্ষমতাসীন ১৪ দল বলছে, ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে ফাটল ধরাতে তৃতীয়পক্ষের কোনো কারসাজি হতে পারে এটি। গতকাল এক ভার্চুয়ালি আলোচনা সভায় জোট নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণে এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘সারা বিশ্ব যখন জঙ্গিবাদ আলোড়িত একটি বিষয়, সেই সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা হয়েছে। জঙ্গি নির্মূলে যেই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবদান সেই সংস্থাকে আঘাত করা হচ্ছে কেন আমাদের বোধগম্য নয়। এখানে তৃতীয় কোনো শক্তি আমাদের সম্পর্কের মধ্যেই ফাটল ধরানো বা এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই দেশের জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করার কোনো প্রয়াস আছে কি না বা তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে কি না? যে বাহিনী নারী পাচার রোধ, মাদক চোরাচালান রোধসহ জঙ্গিবাদ নির্মূলে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে তাদের বিষয়ে কেন এমন সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে তলিয়ে দেখা উচিত। তাদের সিদ্ধান্ত বদলানো উচিত।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশের সরকারকে পছন্দ না করে বা তার ইচ্ছা অনুযায়ী সরকার পরিবর্তন করতে চায়, তখন তাদের ওপর বিভিন্ন দোষারোপ করে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা হলেও বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে পিছিয়ে গেছে। বাইডেন কিন্তু ঘোষণাই দিয়েছেন তিনি বিশ্ব নেতৃত্বে ফিরতে চান। এজন্য বিভিন্ন দেশকে তাদের বলয়ভুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এ অঞ্চলেও তারা প্রভাববলয় সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। গণতন্ত্রের সম্মেলনে দাওয়াত না দেওয়া সেই ভূরাজনীতির কাজ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার কী? সেখানে বর্ণ-লিঙ্গ বৈষম্যও প্রকট। সেখানকার জনগণ লড়াই করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন মানবাধিকারের কথা বলে বিশ্ব তখন তা বিশ্বাস করে না।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এ বিজয়ের মাসে কতিপয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এটা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য। সংবিধানের বিধান সমুন্নত রেখেই র‌্যাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে থাকে। র‌্যাব-পুলিশসহ সব বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও যদি কোনো বাহিনীর সদস্যই বিধান ও আইনের বাইরে গিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড করে তাকে সাজা দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জে সাত হত্যাকান্ডের সঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিচারে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে।’

সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘এভাবে ব্ল্যাকমেইল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাবু করা যাবে না। উনি যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন তা মোকবিলা করে সামনে এগিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের সম্মেলনে দাওয়াত দেয়নি এটা তাদের ব্যাপার।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সঠিক তথ্য-উপাত্ত বা আলোচনা ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছে ঢাকা। কেন দেশটি এমন সিদ্ধান্ত নিল তার সঠিক কারণ জানতে চায় ঢাকা। তবে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো ধরনের তিক্ততা চায় না বাংলাদেশ। বরং দেশটির সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির ইতি টানতে চায়। শুধু তাই নয়, যদি এ নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কারণে হয়ে থাকে তাহলে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে অটল থাকবে ঢাকা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) শাব্বির আহমেদ চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলে। তবে একেবারে নাম ধরে একটা প্রতিষ্ঠানের এতগুলো লোককে নিষেধাজ্ঞা দেওয়াটা প্রথম। আমরা কিছুটা বিস্মিত হয়েছি। হঠাৎ করে কেন করল, এটাই আমাদের প্রশ্ন। তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারত। তা আমরা তাদের প্রতিনিধিকে ডেকে উষ্মা প্রকাশ করেছি। এটা নিয়ে একেকজন একেক কথা বলবে, তবে আমরা চাই এর মূল কারণ জানতে। তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইব। আমরা চাই এ ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক। সম্পর্কে তিক্ততা আসুক সেরকম কিছু চাই না। আমরা সংলাপে বিশ্বাসী। সংলাপের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের সমস্যা সমাধান করতে চাই।’

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে পৃথকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দপ্তর। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ রয়েছেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। বেনজীর আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। একই সঙ্গে তিনি দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন।

এছাড়া র‌্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. আনোয়ার লতিফ খানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট।

এ নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর শুক্রবার রাতেই ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট আর্ল মিলারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করা হয়। ফোনে তাকে জানানো হয়, নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে সকালেই তাকে ডেকেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। ফোন পেয়ে সকালে পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাতে মন্ত্রণালয়ে আসেন রাষ্ট্রদূত মিলার। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তার কাছে হতাশা, অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত মিলার নিজেই বিস্মিত হয়েছেন বলে পররাষ্ট্র সচিবকে জানান। এরপর ওইদিনই রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক অনুষ্ঠান শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় জানান, র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূতকে ডেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন ঢালাও অভিযোগে উষ্মা প্রকাশ করেন ড. মোমেন।

এরপর দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পররাষ্ট্র সচিব যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই একতরফাভাবে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় হতাশা, অসন্তোষ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র সচিব দুঃখ প্রকাশ করে রাষ্ট্রদূতকে বলেন, কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য র‌্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিভিন্ন সময়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেটা শুধু (সংশ্লিষ্ট ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থার জন্য) মার্কিন প্রশাসনের কাছে নয়, একাধিকবার জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার কাছেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যে বিষয়গুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে সেগুলো সক্রিয় আলোচনার অধীনে রয়েছে।

এছাড়া এ ঘটনায় শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমাদের সিস্টেমে কেউ ইচ্ছা করে ক্রসফায়ার বা গুলি করতে পারে না। ক্রসফায়ারের পেছনে যথাযথ কারণ আছে। এসব ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশে এগুলো চলছে এবং চালু আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর গণমাধ্যমে কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয় এবং অন্যদের ওপর তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা একপেশে ও অকার্যকর।

সরকারের তিন শীর্ষ মন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন রবিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা একপেশে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই দিন এ বিষয়ে কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, এটা দুঃখজনক যে, কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ না দিয়েই এমন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় দফায় বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনায় কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরকারকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এটা যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে করে থাকে।’ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় সেজন্য আগে তাদের পুলিশকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া উচিত। প্রতি বছর সেখানে এক হাজারের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়। এছাড়া আমাদের উপমহাদেশের অনেক দেশেই এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়। আমাদের চেয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আরও বেশি হয়। তাদের তো ডাকার সাহস নেই। এটা সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। তবে মনে রাখতে হবে যে, কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কাম্য নয়। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলে, অথচ তাদের নিজেদের দেশেই গণতন্ত্র নেই।’

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘এটা নতুন কিছুই নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। আবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেটা তুলেও নিল এবং এখন তো বড় বন্ধু হয়ে গেল। আমি মনে করি এগুলো হলো রাজনীতির অংশ। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশও হতে পারে। কারণ কিছুদিন আগে যেহেতু আফগানিস্তান থেকে রীতিমতো পালিয়েছে, সেজন্য পৃথিবীকে কিছু একটা দেখাতে হবে, কিছু করে তো দেখাতে হবে তাই গণতন্ত্র বা মানবাধিকার এগুলো সামনে নিয়ে আসছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরও কিন্তু তা করেছে। যখন পালিয়ে গেল তখনো গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে চিৎকার করল। চীনের পেছনে লেগেছে। কোনো একটা রাজনীতি আছে। পৃথিবীকে দেখাল মানবাধিকার লঙ্ঘন।’