শাবনূর থাকবেন বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে: মানিক

শাবনূর বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুণী অভিনেত্রী। জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর আজ জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তাফিজুর রহমান মানিক।

মানুষের এক জীবনে তার আশেপাশে অনেকগুলো নাম আর চরিত্রের সমাবেশ ঘটে। তার মধ্যে কিছু থেকে যায় অপ্রয়োজনীয় আর অনুল্লেখযোগ্য হিসেবে আর কিছু হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য। আমার চলচ্চিত্র জীবনে শাবনূর তেমনি একটি নাম। আমার অধিকাংশ কাজ তাকে নিয়ে। প্রায় এক যুগে তার সঙ্গে কেটেছে আমার অনেক সময়।  সেই সঙ্গে তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক অনেক স্মৃতি। আসলে শুধু আমার জন্যই নয়; সমস্ত চলচ্চিত্রের জন্যই শাবনূর নামটি এতই বর্ণাঢ্য, এতই অপরিহার্য ও এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তাকে নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করাটা তাকে  ছোট করারই শামিল। তাই আমি শুধু তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিছু স্মৃতির কথা বলব।

সময়টা ২০০২ সাল। অনেকেই জানেন চলচ্চিত্র দুনিয়ায় প্রবেশের অনেক আগে থেকেই আমি শাবনূরের মহাভক্ত। শাবনূরের এমন কোন ছবি নেই আমি তিন চার বার করে দেখিনি। এমন কোন ভিউ কার্ড নেই যা আমি কিনিনি। শাবনূরকে নিয়ে প্রচ্ছদ বা নিউজ করেছে এমন কোন ম্যাগাজিন কিংবা পত্রিকা নেই যা আমার সংগ্রহে ছিল না। সেই আমাকে যখন প্রথম দিন অনেক কথাবার্তা বলার পর আমার শ্রদ্ধেয় গুরু জাকির হোসেন রাজু বললেন চলো মানিক আমার সঙ্গে। আমি বললাম স্যার কোথায়? তিনি বললেন ‘‘শাবনূর শুটিং করছে তিন নম্বর ফ্লোরে। ওখানে যাব। ‘ভালোবাসা কারে কয়’ ছবির শিডিউল নেওয়ার ব্যাপারে কথা বলব।’’ এ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শাবনূরকে দেখব এই আনন্দে আনন্দিত হয়ে গিয়েছিলাম। এমনকি শাবনূরের সামনে যাওয়ার ভয়ে আমি ভীত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আজ আর তা বোঝাতে পারব না। স্যার এর সঙ্গে আমি গেলাম। স্যার শাবনূরের সঙ্গে কথা বলছেন। আমি দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছি। আমি আমার স্বপ্নের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি নিস্তব্ধ, নির্বাক ও অনুভূতিহীন হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম পুরোটা সময়। সেই কথা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কেউ বুঝবে না। তারপর রাজু স্যার এর সঙ্গে শাবনূর এর কাছ থেকে আমি চলে এলাম। সঙ্গে নিয়ে এলাম আমার চলচ্চিত্র জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মৃতিটি। যা আমাকে আজীবন আন্দোলিত করবে।

সময়টা ২০০৪ সাল। আমার প্রথম ছবি ‘দুই নয়নের আলো’র প্রথম দিনের শুটিং হবে। মানিকগঞ্জে শুটিং। সরিষা খেতে শাবনূর আর ফেরদৌস এর কিছু শট নিব। বিপত্তি হলো ঔই দিনেই আমার বিবিএ সেকেন্ড সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষার সময় বেলা ২টা। আমি পড়লাম মহাবিপদে। শুটিং করব নাকি পরীক্ষা দিব। দুটোই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুটিং করতে গেলে আমি পরীক্ষা দিতে পারব না এটা নিশ্চিত। কারণ শাবনূর সব সময়ই শুটিং স্পটে একটু দেরি করে যান। এটা আমি জানি। মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দুটোর মধ্যে পরীক্ষা হলে পৌঁছা কি সম্ভব হবে? এই প্রশ্ন যখন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন আমি ঠিক করলাম শাবনূরকে বিষয়টা বলি। আমি তাকে বললাম। তিনি বললেন তোমার শট নিতে কতক্ষণ লাগবে। আমি বললাম এক থেকে দেড় ঘণ্টা। শাবনূর বললেন তুমি আটটার মধ্যে ইউনিট মানিকগঞ্জে পাঠিয়ে দিবে। আমি মেকআপ, গেটআপসহ সাড়ে আটটার মধ্যে রেডি থাকব। তুমি আমাকে একটু নিয়ে যেও। আর আমি ফেরদৌসকেও বলে দিচ্ছি। শাবনূরের কথায় আমি খুশি হলাম কিন্তু পুরোপুরি আশ্বস্ত হলাম না।‘শাবনূর সাড়ে আটটার মধ্যে রেডি হয়ে মানিকগঞ্জ যাবেন’-এটা  আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। এই সব ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ফোনের রিংটোনের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। দেখি শাবনূরের কল। সময় সকাল আটটা। আমি ফোন ধরলাম। শাবনূর বলল, কই তুমি? আমি রেডি। আমি শাবনূরকে নিয়ে মানিকগঞ্জ গেলাম। শুটিং শেষ করার পর দেখি ঘড়িতে ১২টা বাজে। শাবনূর আমাকে বলল গাড়িতে ওঠো। আমি বললাম না আমি ইউনিট এর সঙ্গে যাব। তিনি বললেন আমি তোমাকে ভার্সিটিতে দিয়ে আসব। তাহলে সময় মতো পৌঁছাতে পারবে। শাবনূর আমাকে সময় মতো পৌঁছে দিলেন। আমার শুটিংও ঠিকমতো হলো, পরীক্ষাও দেয়া হলো।

‘দুই নয়নের আলো’ ছবির ‘পূর্ণিমার চাঁদ নও’ গানটির শুটিং করতে কক্সবাজার গেলাম। শাবনূর-ফেরদৌস তখন কক্সবাজারে ‘যত প্রেম তত জ্বালা; ছবির শুটিং করছেন। শাবনূরের সঙ্গে দেখা হতেই বললেন মানিক তোমার ছবির গানগুলো শুনব। আমি শুটিং শেষ করে তোমাকে ফোন দিলে একটু গানগুলো নিয়ে এসো। শাবনূর ফোন দিলেন রাত ১১টায়। আমি শৈবাল হোটেলে শাবনূরের রুমে গেলাম। পাঁচটি গান শোনা শেষ হলে সুখের পাখি গানটি বাজতে শুরু করল। এটি শোনার পর শাবনূর বললেন আবার বাজাও। আমি আবার বাজালাম। শেষ হওয়ার পর শাবনূর বললেন আবার বাজাও। সে বারবার গানটি শুনতে লাগল। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম। সবাই আমার জন্য রুমে অপেক্ষা করছে। এইভাবে বিশ বারের বেশি শাবনূর গানটি শুনলেন। আমার দৃষ্টি হঠাৎ শাবনূরের চোখের দিকে গেল। দেখি তার চোখ ছলছল করছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে? এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে শাবনূর দুহাত মুখে দিয়ে কান্না শুরু করলেন। বললেন মানিক আমি কখনো বিয়ে করব না। বিয়ে করলে আমার মা ভাই বোনকে কে দেখবে। আমি বুঝলাম গানের কথা শাবনূরের জীবনের সঙ্গে মিলে যাওয়াতে শাবনূর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। এই গানটির শুটিং করতে গিয়েও শাবনূরের এই আবেগ অব্যাহত ছিল।

আমার মনে আছে প্রখর তাপ উপেক্ষা করে শাবনূর নিজের গাড়িতে না গিয়ে ইউনিট এর বাসে চড়ে রাস্তায় রাস্তায় খালি পায়ে শুটিং করেছেন। গানটির শেষ অংশে শাবনূর মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যাবেন। ‘কাল হো না হো’ ছবিতে একটি গানের পর শাহরুখও পড়ে যান। আমি শাবনূরকে শাহরুখের ওই দৃশ্যটি দেখতে বললাম। শাবনূর আমাকে বললেন, ‘মানিক তুমি কি বিশ্বাস করো না আমি শাহরুখ খানের চেয়ে ভাল অভিনয় করি। আমি কিছু বললাম না। কিন্তু পরের দিন ওই শটগুলোতে শাবনূর যা অভিনয় করেছে তাতে আমি শুধু বিশ্বাসই করিনি বিস্মিতও হয়েছি।

‘মন ছুঁয়েছে মন’ ছবির একটানা শুটিং হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৭ই ডিসেম্বর শাবনূরের জন্মদিন চলে এলো।  আমি সেই দিন কেক আনলাম। উদ্দেশ্য শুটিং শেষে সবাই মিলে আমরা কেক কাটব। হলোও তাই। কেক কাটার আয়োজন চলছে। পাশের ফ্লোর থেকে শাকিব খান, অপু বিশ্বাসসহ আরও যারা ছিলেন সবাই এলেন শাবনূরকে শুভেচ্ছা জানাতে। কেক কাটার পর শাবনূর একে একে সবাইকে কেক তুলে দিচ্ছিলেন। সিনিয়র লাইটম্যান রুহুল আমিনকেও কেক তুলে দিলেন। শাবনূর তাকে ওস্তাদ বলে ডাকতেন। কিন্তু রুহুল আমিন বললেন উনি কেক খাবেন না। আমি বললাম ওস্তাদের মন খারাপ। কোন এক প্রযোজক উনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। শাবনূর বললেন, ওস্তাদ আমি উনার হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি কেক না খেলে আমিও খাব না। শাবনূরের কথা শুনে রুহুল আমিনের চোখ ছলছল করতে লাগল। বললেন তুমি এমন কইরা কথা কইয়ো না মা। দাও কেক দাও। শাবনূর রুহুল আমিনকে কেক খাইয়ে দিলেন। আমি সেই দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখলাম। কী মায়াবী সেই দৃশ্য।

সবেমাত্র ‘দুই নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রটির জন্য শাবনূর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। এর পরেই ঘুরে ফিরে শাবনূরের জন্মদিন চলে এলো। শাবনূরের জন্মদিন আমার কাছে সব সময়ই স্পেশাল ছিল। অন্যরকম ছিল। আমি শাবনূরকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম জন্মদিনে কি দিবো তোমাকে? শাবনূর বললো কি দিবা? তুমি তো দিয়েই দিয়েছো আমার জন্মদিনের সবচেয়ে দামী গিফট। আমি বললাম কি দিলাম? শাবনূর বললেন, ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’, দুই নয়নের আলো’। এর চেয়ে দামী আমার কাছে আর কিছুই নাই। আমি শাবনূরের কথা শুনে চুপ হয়ে গেলাম।ফোন রেখে চিন্তা করলাম, শাবনূর নামটির সঙ্গে যদি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না থাকত তাহলে কী আফসোসই না থেকে যেতো। অথচ অনেকগুলো চলচ্চিত্রের জন্যই শাবনূর এই পুরস্কারের দাবীদার ছিলেন, যোগ্য ছিলেন। কিন্তু পাননি। তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। তাই কখনো কখনো মন খারাপ হয়। আবার যখন চিন্তা করি তিনি যা পেয়েছেন তা খুব কমসংখ্যক অভিনেত্রীর কপালেই জুটেছে। বছরের পর বছর তিনি ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। তাকে ঘিরে আগ্রহ উন্মাদনা এক বিন্দুও কমেনি এখনো। তার অভিনয়কে ভালোবাসেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ, মা-বোন সবার প্রিয় শাবনূর। এমন সার্বজনীন জনপ্রিয়তা শেষ কবে কে পেয়েছিল তা খুঁজে বের করা কঠিন। তাই শাবনূর ছিলেন, শাবনূর আছেন, শাবনূর থাকবেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে। জন্মদিনে এই ক্ষণজন্মা অভিনেত্রীকে জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা।