কোথা থেকে এসেছে জেসন বর্নের গল্প

ভোর ৫টায় বিস্ফোরণের শব্দ তার কানে এলো। অচেনা এক শহরের অপরিচিত বিছানায় তিনি জেগে উঠলেন। রবার্ট লুডলাম রচিত বিখ্যাত চরিত্র জেসন বর্নের বর্ণনা ভাবলে ভুল করবেন। এটা বরং এমন এক বর্নের কাহিনী, যার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন সুপার স্পাই থ্রিলারের লেখক। সেই গল্প বলেছেন ওয়াহিদ সুজন

থানায় মিসেস বর্ন

১৮৮৭ সালের ২০ জানুয়ারি। রোড আইল্যান্ডের কভেন্ট্রি এলাকার গ্রিন গ্রামে অন্যদিনের মতো সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, কিন্তু স্বস্তি নেই ইসাবেল বর্নের মনে। অবশেষ সব দ্বিধা ঝেড়ে সকাল সকাল হাজির হন থানায়। পুলিশকে জানান, তার ধর্মযাজক স্বামী অ্যানসেল বর্ন তিন দিন ধরে নিখোঁজ। ১৭ জানুয়ারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে বাড়ি থেকে বের হন, কিন্তু কয়েক দিন চলে গেলেও বর্নের বাড়ি ফেরার নাম নেই। একই দিন বিকেলে নিখোঁজের খবরটি প্রকাশ করে স্থানীয় সংবাদপত্র প্রভিডেন্স ইভিনিং বুলেটিন। কিন্তু বর্নের হদিস মেলে না সহসা।

অচেনা শহরে ব্রাউন

পেলভানিভানিয়ার ছোট শহর নরিসটাউনের মন্টগোমারি কাউন্টি। ১৮৮৭ সালের শুরুতে আলফ্রেড জে ব্রাউন নামের কেতাদুরস্ত এক ব্যক্তি ইস্ট মেইন স্ট্রিটে ভাড়াটে হয়ে আসেন। বাড়িটি থাকার ঘর ও দোকান হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। যেখানে খেলনা থেকে শুরু করে আসবাবপত্রসহ নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যেত। বোঝাই যাচ্ছে, নানান ধরনের চাহিদা নিয়ে লোকে হাজির হতো সদালাপী ব্রাউনের কাছে।  তার দুই মাস পরের এক সকালের ঘটনা বলেছিলাম শুরুতে। ১৫ মার্চ ভোরে ব্রাউন চোখ-মুখে তীব্র উদ্বেগ নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে জানতে পারেন তিনি পেনসিলভানিয়ায় আছেন। এ কথা শুনে ভীষণ অবাক হন। কারণ কী?

ঘটনা হলো, সেই ভোরে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙার পর অপরিচিত বিছানায় নিজেকে দেখেন ব্রাউন। এরপর জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকান। আরে! শুধু বিছানা নয় ওই এলাকাটিও তার অপরিচিত। এখানে তিনি কীভাবে এলেন? দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। পাশের ঘরে কারও আওয়াজ পেয়ে ভীষণ জোরে কড়া নাড়তে থাকেন ব্রাউন। সে ঘরে থাকতেন বাড়ির মালিক পিঙ্কস্টন আর্লে। তিনি বলেন, শুভ সকাল মি. ব্রাউন। কিন্তু ব্রাউনের উত্তর, ‘আমি ব্রাউন নই। আমি কোথায়?’ এ প্রশ্ন শুনে ভীষণ অবাক বাড়িওয়ালা। এদিকে নরিসটাউনে আছেন শুনে পুরোপুরি হতভম্ব ব্রাউন।

সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল ব্রাউনের। শান্ত মেজাজের লোকটি কোনো দিন গির্জার প্রার্থনা বাদ দিতেন না। এখন প্রতিবেশীরা শুনতে পেলেন, দিনে কয়েকবার যে লোকের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন, তার নাম ব্রাউন নয়। তাহলে ব্রাউন আসলে কে? ডাক পেয়ে ব্রাউনকে দেখতে আসেন ডা. লুইস ডব্লিউ রিড। পুরোপুরি দুটি মাসের স্মৃতি ফাঁকা শুনে তিনি বলেন, এটি অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য গল্প।

কী সেই অবিশ্বাস্য গল্প

বুঝতেই পারছেন, জে ব্রাউনের প্রকৃত নাম আনসেল বর্ন। অদ্ভুত এ কাণ্ডের পর তিনি তোলপাড় তোলেন। তার চিকিৎসা করেন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও যুক্তরাষ্ট্রের দর্শনের জনক-খ্যাত প্রয়োগবাদী ধারার প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম জেমস। বলে রাখা ভালো, এটা শুধু নিছক স্মৃতি হারানোর ঘটনা নয়। ব্রাউন বা বর্নের রয়েছে রহস্যময় অতীত।

ব্রাউন বলেন, সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারির ঘটনা মনে আছে তার। ওইদিন রোড আইল্যান্ডের কভেন্ট্রির বাড়ি থেকে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে বের হন। ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন, কিছু বিল পরিশোধ করেন ও ভাতিজার দোকানে যান। এসব কাজ শেষে বোনের বাড়ির দিকে যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত স্মরণ করতে পারেন। এরপর থেকে কোনো মুহূর্তের ঘটনা বর্নের মনে পড়ছে না। আরও দাবি করেন, তার বয়স ৬১ বছর। পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি ও ইভাঞ্জেলিক্যাল ধর্মপ্রচারক। দ্বিতীয় স্ত্রী ইসাবেলকে স্মরণ করতে পারেন। জানান, তার বিবাহিত দুই মেয়ে বসবাস করছে নিউ ইয়র্কে।

ডা. রিড সবকিছু জানিয়ে বর্নের ভাতিজা অ্যান্ড্রু হ্যারিসকে টেলিগ্রাম করা হয়। অ্যান্ড্রু দ্রুত চিঠির উত্তর দেন। জানান, চাচাকে নিতে আসছেন তিনি। ১৮ মার্চ চাচা-ভাতিজার দেখা হয়। এরপর তারা বাড়ি ফিরে যান। পরদিন ফিলাডেলফিয়া ইনকুয়ারারে এই ‘ভারাক্রান্ত পুনর্মিলনের’ খবর ছাপানো হয়। যেখানে জানানো হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন সত্ত্বেও বর্নের কেন হদিস মেলেনি। কারণ নিখোঁজের খবরে পত্রিকার বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, তার লম্বা ধূসর দাড়ি রয়েছে। অন্যদিকে ব্রাউনের দাড়ি ছাঁটা ছিল।

বর্নের রহস্যঘেরা অতীত

আনসেল বর্ন যে সে ব্যক্তি ছিলেন না। ধর্মপ্রচারক হওয়ার আগে তার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিশ্বাস ও জীবনধারা। আচমকা এক ঘটনা তাকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়। রেভারেন্ড বর্ন এর আগে নিজেকে ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবেই বর্ণনা করেন। ২৫ বছর আগে হঠাৎ করে তিনি বোবা-কালা-অন্ধ হয়ে যান। সে ঘটনার উত্তরণের পর হয়ে যান ‘পরিব্রাজক ধর্মপ্রচারক’। এ বিষয়ে বর্ন একটি ছোট পুস্তিকাও প্রকাশ করেন, নাম ‘ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্কস অব গড’। এখানে মূলত তার কথোপকথন স্থান পায়। সেখানে বলেন, এক দশক জুড়ে তিনি ছিলেন কট্টর ঈশ্বরবিরোধী। ১৮৫১ সালের ২৮ অক্টোবর বাসা থেকে বেরিয়ে ওয়েস্টালি গ্রামের দিকে হাঁটছিলেন। পথে এক ক্রিশ্চিয়ান চ্যাপেলের ওপর চোখ পড়তেই তিনি নিজেকে বলেন, ওইখানে যাওয়ার আগে আমি যেন চিরতরে বোবা-কালা হয়ে যাই। এ ভাবনার পরপরই তিনি জ্ঞান হারান। তারপর ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে আসা হয়। জ্ঞান ফেরার পর বর্ন আবিষ্কার করেন, তিনি বলতে, শুনতে বা দেখতে পারছেন না। ভীষণ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি বুঝতে পারেন, তার এই অভিজ্ঞতাই হলো ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ।

সৃষ্টিকর্তা ও প্রার্থনার ঘর নিয়ে আমার্জিত এ আচরণের জন্য তিনি ক্ষমা চান। কিছুদিনের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান বর্ন এবং আস্তে আস্তে সব ইন্দ্রিয় সজাগ হয়। তবে রাতারাতি সব হয়ে যায়নি। যতক্ষণ না বর্ন ওই চার্চে প্রকাশ্যে প্রবেশ না করেন ততক্ষণ বাকশক্তি রহিতই থেকে যায়। পরে একটি স্লেটে স্বীকারোক্তি (কনফেশন) লেখেন তিনি। চ্যাপেল সবার উপস্থিতিদের স্বীকারোক্তিটি পড়ে শোনানো হয়। এরপর বর্ন ইন্দ্রিয়গুলোর কার্যক্ষমতা ফিরে পান। সবাই এ ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ বার্তা হিসেবে প্রত্যক্ষ করে। তার এ স্বীকারোক্তি মুদ্রিত হয়ে অসংখ্যবার বিতরণ হয়। এরপর অতীতের ভুল সংশোধনের জন্য ভবিষ্যৎ উৎসর্গের সিদ্ধান্ত নেন আনসেল বর্ন। এভাবে অবিশ্বাসী জীবন থেকে বিশ্বাসে ফিরে আসার পুরো ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন। পুস্তিকাটি প্রকাশ হয় ১৯৫৮ সালে। একসময় ওয়েস্টালি গ্রাম ছেড়ে কভেন্ট্রিতে থিতু হন। তত দিন প্রথম স্ত্রী মারা গেছে। গির্জায় পরিচয় হওয়া ইসাবেলকে বিয়েও করেন তিনি।

কী ঘটেছিল বর্নের মনে

বর্নের কেসটিকে মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে যুক্ত হয়। ‘বর্ন আইডেনটিটি’ হয়ে গেল প্রথম নথিবদ্ধ ডিসোসিয়েটিভ ফুগু নামে পরিচিতি বিরল ব্যাধির উদাহরণ। ফুগু সম্পর্কে হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেনিয়েল শ্যাক্টার বলেন, এটি এমন এক পরিস্থিতি যখন কোনো ব্যক্তি নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। তিনি কে বা অতীত সম্পর্কে সব তথ্য হারিয়ে ফেলেন। নতুন এক পরিচয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবনযাপন করতে থাকেন, যেন এভাবেই তিনি সব সময় ছিলেন। সাফোক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ মোসের ম০েত, আঘাতজনিত ঘটনা দ্বারা ডিসোসিয়েটিভ ফুগু পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সাধারণত শারীরিক আঘাতের সঙ্গে অনেক মানসিক চাপ থাকে। সেই সময়ে তারা স্মৃতিভ্রংশের স্বীকার হতে পারে। এমন একটি অবস্থায় ভুক্তভোগী পুরোপুরি স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে, অথচ সে অতীতের কিছুই জানে না।

থ্রিলার উপন্যাসের জেসন বর্নকে দিনের পর দিন নিজের আসল পরিচয়ের জন্য ঘুরপাক খেতে হয়েছে ইউরোপের একাধিক শহরে। ‘ফুগু’ অবস্থায় কোনো সন্দেহ না হলেও বাস্তব আনসেল বর্ন দ্রুতই নিজের পরিচয় ও পরিবার খুঁজে পান। মোসের মতে, সাধারণ স্মৃতিভ্রংশের বিপরীতে ডিসোসিয়েটিভ ফুগুর শিকার ব্যক্তিরা আলঝাইমার বা মাথায় আঘাতের শিকার ব্যক্তিদের তুলনায় সহজে অতীত জীবন স্মরণ করেন। তবে এর কেতামাফিক সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। শুধু কিছু স্মৃতি খুঁজে বের করতে হবে, যা তাদের অতীতে ফিরে যেতে ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ফুগু স্টেজ কয়েক মাস স্থায়ী হয়। যদি ট্রিগার হিসেবে কোনো স্মৃতি হাজির না হয়, তবে স্মৃতিহীনতা সারা জীবন চলতে পারে। কিন্তু জেসন বর্নের মতো কোনো সূত্র খুঁজে পেলে সে নিজেই সেই স্মৃতি অনুসরণ করে অতীতে ফিরতে পারবে।

বর্ন ও ব্রাউনের পাশাপাশি বাস

আনসেল বর্নকে নিয়ে গবেষণা করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দার্শনিক উইলিয়াম জেমস ও সোসাইটি ফর সাইকিক্যাল রিসার্চের রিচার্ড হগসন। তারা আনসেলকে সম্মোহিত করে তথ্য আদায়ের চেষ্টা করেন। সেখান থেকে জানা যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্ন বা ব্রাউন নিজেকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় হলো, দুটি সত্তাই নিজেকে নিয়ে সচেতন হলেও দুটি আলাদা ব্যক্তিত্বের সহাবস্থান নিয়ে কোনো ধারণা করতে পারে না।

১৮৯০ সালের বসন্ত ও গ্রীষ্মের অনেকগুলো দিন কেমব্রিজে উইলিয়াম জেমস ও তার সহকর্মীদের সহচার্যে কাটান বর্ন। প্রতিদিন তাকে সম্মোহিত করা হতো, ১৯৮৭ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত ঘটনাবলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করা হতো। এ সময় রোড আইল্যান্ডের পাওটকেট থেকে ট্রেনে চেপে নিউ ইয়র্ক ও পরে নিউআর্কে আসার কথা জানান, এরপর যান ফিলাডেলফিয়ায়। কোথায় কোথায় থেমেছিলেন বা থেকেছিলেন তাও জানান। পরে বর্নের তথ্য যাচাই করে সত্যতা পাওয়া যায়।

ব্রাউন হিসেবে বর্ন নিজের সঠিক জন্মতারিখ জানান। তবে জন্মস্থান নিয়ে ভুল তথ্য দেন। আরও জানান, জীবনে তিনি অনেক বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং সম্প্রতি তার স্ত্রী মারা গেছেন। তবে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে ১৭ জানুয়ারি পাওটকেট আসার আগে কী ঘটেছিল তা স্পষ্ট করে জানাতে পারেননি ব্রাউন। সবকিছু গুলিয়ে ফেলেন তিনি। একটাই কথা বলছিলেন, দূরে কোথায় যেতে চেয়েছিলেন কারণ তার বিশ্রাম দরকার ছিল।  ৩১ মে বর্নকে সম্মোহিত করেন জেমস, জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার নাম কী? বর্ন, নাকি অন্যকিছু?’ তিনি বলেন, ‘না, আমি ব্রাউন’। বর্ন জেগে উঠলে জেমসের সহকর্মীরা আবার সম্মোহিত করলে একই প্রশ্নে আগের উত্তরটি দেন। ব্রাউন জানান, তিনি বর্নের কথা শুনেছেন কিন্তু কখনো তাদের দেখা হয়নি। এমনকি প্রথম স্ত্রী প্রয়াত সারাহ বর্নকেও ছবিতে চিনতে পারেননি।

‘দ্য প্রিন্সিপলস অব সাইকোলজি’ বইয়ে পুরো কেসটির বর্ণনা দেন উইলিয়াম জেমস। তার মতে, ব্রাউন হলো বর্নের সংকুচিত, হতাশাগ্রস্ত ও স্মৃতি হারানো ব্যক্তিত্ব। নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনের সমস্যা কাটানো ও বিশ্রাম ছাড়া কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তার। সম্মোহনের সময় বর্নকে জাগ্রতের চেয়ে বেশি বুড়োটে দেখাচ্ছিল ও তার মুখ ঝুলে পড়েছিল। তার কণ্ঠ ধীর ও দুর্বল হয়ে যায়। ব্রাউনের হিসাবে বসবাসের দুই মাসের ঘটনার আগে ও পরে মনে করতে গিয়ে সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল। উইলিয়াম জেমস দুই ব্যক্তিত্বের একত্র করে স্মৃতির বহমানতা আশা করলেও সেই চেষ্টা বৃথা যায়। সবশেষে একই খুলির তলে দুই ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি আছে বলে সমাপ্তি টানেন তিনি।

দ্বৈত সত্তা নিয়ে বিতর্ক

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে ডিসোসিয়েটিভ ফুগু নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সহযোগী অধ্যাপক মোসে জানান, পুরো রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে অনেক মানুষই সন্দেহ পোষণ করে থাকেন। কারণ এটি ভুয়াও হতে পারে। স্কট লিলিয়েনফেল্ডের মতো মনোবিজ্ঞানীও এ দলে আছেন। কারণ এ ধরনের ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি যত্ন ও উৎকণ্ঠার খামতি দেখেছেন তিনি, যা ‘লা বেলে ইন্ডিফারেন্স’ নামে পরিচিত। তবে মোসের মতে, এমন একটি গুরুতর পরিস্থিতির প্রতি উদাসীনতা প্রমাণ করে ওই ব্যক্তি ‘প্রকৃত স্নায়ুবিক সমস্যা’য় ভুগছেন। আর লিলিয়েনফেল্ড বিশ্বাস করেন, উদাসীনতার অর্থ অন্যকিছু হতে পারে। কারণ, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো সমস্যায় পড়ে ভুয়া মনোবৈকল্যের কেস সাজাতে পারে। লিলিয়েনফেল্ড জানান, তিনি অনেক হাসপাতালে কাজ করেছেন, হাজার হাজার রোগী দেখেছেন। কিন্তু আমি কখনো ফুগুর মতো এমন ঘটনা শোনেননি বা দেখেননি।

জেসন বর্ন কি বর্ন থেকে অনুপ্রাণিত

বলা হয়ে থাকে, রবার্ট লুডলামের উপন্যাসের জেসন বর্ন চরিত্রটি আনসেলের অভিজ্ঞতা থেকে ধার করেছেন। শুধু স্মৃতিভ্রংশের প্লটই নয়, নামের মিল কাকতালীয় হতে পারে না। তবে একাধিক মিডিয়ায় এমন অনুমান প্রকাশ হলেও বিষয়টি নিয়ে লেখক কখনো মন্তব্য করেননি। এখন যেহেতু লুডলাম জীবিত নেই, তিনি আর উত্তরও দিতে পারবেন না!

১৯৮০ সালে প্রকাশ হয় সিরিজের প্রথম বই ‘দ্য বর্ন আইডেনটিটি’। সেখানে এমন এক ব্যক্তির গল্প তুলে হয়, যাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সমুদ্র থেকে উদ্ধার করেন জেলেরা। জ্ঞান ফেরার পর অবাক হয়ে তিনি নিজের পরিচয় জানতে চান। বিপরীতমুখী স্মৃতিভ্রংশের স্বীকার জেসনের রয়েছে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা। এরপর তিনি নিজের পরিচয়ের খোঁজে বের হন। এই বইয়ের জনপ্রিয়তার পর প্রকাশ হয় ‘দ্য বর্ন সুপ্রেমেসি’ ও ‘দ্য বর্ন আলটিমেটাম’। সিরিজটি এতই জনপ্রিয়তা পায় যে লুডলামের মৃত্যুর পর এরিক ভন লাস্টবাডার ১১টি সিক্যুয়েল লেখেন। সিনেমা ও টিভির জন্য সিরিজটি একাধিকবার রূপায়িত হয়। এর মধ্যে ম্যাট ডেমন অভিনীত সিনেমাগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়। আয় করে নেয় শত শত কোটি ডলার।

বর্নের মৃত্যু

আনসেল বর্নের স্ত্রী ইসাবেল ১৯১০ সালের ১৪ এপ্রিল মারা যান। তাকে দ্বিতীয় স্বামী জন ডব্লিউ পটারের পাশে সমাহিত করা হয়। এর পরপরই নিউ ইয়র্কে পরিবার নিয়ে থাকা ছেলে আলোঞ্জোর কাছে বলে যান চলে যান বর্ন। সেখানে ১৯১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান বর্ন, প্রথম স্ত্রীর সারাহর কবরের পাশে সমাহিত হন। আনসেল বর্নের মৃত্যুর কবর স্থানীয় দ্য মেদিনা ট্রিবিউনে প্রকাশ হলেও তার বিখ্যাত সেই স্মৃতিভ্রংশের ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি এতে। ওয়েস্ট শেলবির বয়স্ক ও শ্রদ্ধাভাজন বাসিন্দা হিসেবে তার পরিচয় দেওয়া হয়।