রাজনৈতিক দৈন্য ও সামাজিক শিষ্টাচার

সাম্প্রতিক কালে আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু অসংলগ্ন আচার-আচরণ নেটিজেনদের ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছে। একইসঙ্গে যাদের কথাবার্তা বা আচরণের বিষয়গুলো সমালোচিত হয়েছে তাদের প্রায় সবাই ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু জনসম্মুখে আসেনি এমন অনেক ব্যবহার আছে যা শালীনতাবর্জিত ও কোনোভাবেই যে মার্জিত নয়, তা বলাই বাহুল্য। এখন আমরা কিছুদিন পরপরই দুটি বিষয় শুনতে পাই, আর তা হচ্ছে বিভিন্ন পর্যায়ের সেলিব্রেটি বা জনসম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ফোন কল বা অন্য কোনো কনটেন্ট ফাঁস ও তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া। ডিজিটাল দুনিয়ায় যেন কোনো কিছুই আর গোপন করা যাচ্ছে না।

ফোন কল বা কোনো কনটেন্ট ফাঁস হওয়া কতটুকু আইনসংগত বা নৈতিক তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আছে। ফোন কল ও অন্যান্য কনটেন্ট কীভাবে ফাঁস হয় তা নিয়ে সবমহলে প্রশ্ন আছে, কখনো কখনো তা প্রায় সর্বজনীন উদ্বেগও তৈরি করে। আবার পাবলিক ফিগারদের ব্যক্তিগত জীবন ও জনজীবনের সীমানা নির্ধারণ করা জটিল। বলা হয় যারা গুরুত্বপূর্ণ জনসম্পৃক্ত ব্যক্তি তাদের ব্যক্তিগত জীবন সীমিত এবং তারা সবসময় জনগণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। যে কারণে আমেরিকার মতো দেশেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিষয়সমূহ বিভিন্নভাবে সবার সামনে উঠে আসে।

এমনিতেই আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শিষ্টাচার ও সদাচরণের আকাল।  সজ্জন ব্যক্তির বড়ই অভাব প্রায় সবক্ষেত্রেই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা যেন একটু বেশি রূঢ়। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শিষ্টাচার না মানা বা সদাচারণ না করার কারণ এ সম্পর্কে অজ্ঞতা নয় বরঞ্চ জানা বিষয়টাও চর্চায় না থাকা এবং সদাচরণের প্রতি অনীহা। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিষ্টাচার মানাটাও দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয় সামাজিকভাবে। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, ‘ঐ মানুষটা এত ভদ্র যে তার জন্য রাজনীতি করা মানায় না!’

শিষ্টাচারের সবচেয়ে বড় ঘাটতিটা সম্ভবত বেশি দেখা যায় পারিবারিক জীবনে ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। রাজনীতিবিদের অধিকাংশই প্রতিপক্ষের সমালোচনায় বিভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক ভাষার প্রয়োগ করে। বলা হয় এটাই নাকি রাজনীতির নীতি, কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার উপায়। কোনো কোনো সময় ভাষার এমন যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয় যে তা যেমন ভদ্রতাবর্জিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিংসাত্মক, রগরগে কুরুচিপূর্ণ ও পেশিশক্তির ব্যবহারের প্রচ্ছন্ন হুমকিতে ভরা। আর এই সবকিছুরই ফল দেখা যায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র অনাচার ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। কি পারিবারিক জীবন, কি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন সর্বত্র যেন অন্যায়, অসংযত, জোর জবরদস্তির বাড়বাড়ন্ত, ক্ষমতার বাড়াবাড়ি ও ঔদ্ধত্য। সমাজ বিজ্ঞানীদের অনেকেই এমন আচরণকে আগ্রাসী পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলিয়ে থাকেন।

এই ধরনের আচরণ যে শুধু সমাজের কোনো বিশেষ শ্রেণি বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ করছে এরকম একদমই নয়। বরঞ্চ তথাকথিত ভদ্রলোক, যারা সবসময় নিজেদের পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে এক ধরনের পর্দা দিয়ে চলে, তারাও নিজস্ব পরিম-লে যেন বেজায় বেসামাল। একে অপরকে সম্মান না করা, আরেকজনের ওপর কর্র্তৃত্ব করার প্রবণতা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এই সামাজিক বিশৃঙ্খলাকারীরা আবার সবাই একই ভূমিকা পালন করে না। এদের কেউ কেউ একেবারে সামনের সারির ক্যাডার। আবার অনেকেই আছেন যারা অসদাচরণ চর্চা ও প্রয়োগকারীদের নৈতিক সমর্থন দিয়ে থাকে এবং তাদের পক্ষে তত্ত্বগত ভিত্তি তৈরি করে থাকে। যা ক্ষমতা তৈরি ও চর্চার একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়া। আবার অনেকে এটাকেই রাজনীতি বলে থাকে। যদিও প্রয়োগিক দিক থেকে একে রাজনীতি না বলে অপরাজনীতি বলাই ভালো ও বেশি মানানসই। কারণ রাজনীতি হচ্ছে মানব সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার, প্রগতির পথে সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির প্রচেষ্টা। প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কারপূর্ণ চর্চা ধরে রাখার চেষ্টাও এক ধরনের রাজনীতি। কিন্তু আলোচ্য অসদাচরণ চর্চায় নতুনত্ব কিছু নেই, ভাঙাগড়ার খেলা নেই, আছে পুরনো বুলি আওড়িয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা।

শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ হলো আমাদের সবার ব্যক্তিত্বের আবশ্যিক অনুষঙ্গ। শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ একদিনে তৈরি হয় না, দীর্ঘদিনের মানব সংস্কৃতি তৈরির প্রচেষ্টার একেবারে সারাংশটুকু শিষ্টাচার হিসেবে তৈরি হয়। এ যেন সমুদ্র মন্থন করে ননী সংগ্রহ। অনেক সময় সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতির প্রচলন ও চর্চার আলোকে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক শিষ্টাচার তৈরি হয়। যদিও অনেক নিয়মনীতি বর্তমান রক্ষণশীলতা টিকিয়ে রাখার অংশ হিসেবে পরিবার ও সমাজে ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিষ্টাচার-কে দেখেছেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নিয়মনীতি হিসেবে, তিনি নিজের মতো প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্ধত আচরণকে সমর্থন করেননি। ঔদ্ধত্য যেমন তার কাম্য ছিল না একইসঙ্গে মতপ্রকাশের পথকেও তিনি কোনোভাবেই রুদ্ধ করতে চাননি। আর এটাই গণতান্ত্রিক রীতি, যুক্তি ও তর্কের খেলা এবং একই সঙ্গে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

শিষ্টাচার ও সৌজন্যতা এবং আধুনিক সমাজ একে অপরের পরিপূরক। অন্যদিকে আধুনিক সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিকতা। যে সমাজে প্রতিষ্ঠানের প্রভাব যত বেশি সেই সমাজের সৌজন্যতা বোধ তত বেশি তৈরি হয়, মানুষের ঔদ্ধত্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর এই বিষয়গুলোই মানুষের মানসিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যেন একটি চরম বাস্তবতা, যেখানে আইন ও নিয়মনীতি একেকজনের জন্য একেকরকম। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হচ্ছে, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছি কিন্তু অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পাশাপাশি আমাদের সামাজিক উন্নয়নকে খাপ খাওয়াতে পারছি না। বিত্তের সঙ্গে চিত্তের যোগটা ঠিকভাবে হয়নি বলেই সব সমস্যা। সম্ভবত আমরা এখনো সামন্তবাদী প্রভাব বলয়ের সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। একইসঙ্গে পারিনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। আমরা যতই একে অপরের আধিপত্যবাদী আচরণকে কটাক্ষ করি না কেন আমরা কেউই এসব থেকে মুক্ত নই।

এখন পর্যন্ত নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়, মাঝে মাঝে আলোর ঝলকানি আসে ঠিকই কিন্তু এর পরিণত রূপান্তর সীমিত। এখনো পর্যন্ত  আমরা সমাজে সমালোচনার শুদ্ধ সংস্কৃতিটাই তৈরি করতে পারিনি। আমাদের সমালোচনার রীতিটা হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক, যুক্তি খ-ন নয়। যুক্তির পরিবর্তে, শক্তি প্রদর্শন ও শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টাই যেন সব কিছুর নিয়ামক। ফলে সমালোচনা নতুন কোনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে না অধিকন্তু নতুন সমস্যা তৈরি করে। পারস্পরিক সৌজন্যবোধের চর্চা না থাকার কারণেই আমরা এমন দুষ্টচক্র ও অন্ধকার কানাগলিতে আটকে গেছি, যেন এ থেকে কোনো আশু পরিত্রাণ নেই। এখানে যুক্তির প্রাধান্য গৌণ, মুখ্য হিসেবে ধরা দেয় ভাবাবেগ বা আক্রমণাত্মক আচরণ। শিষ্টাচার বা এই অসদাচরণের পরিবর্তন সর্বত্র কাম্য।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

psmiraz@yahoo.com