বদরুদ্দীন উমর এখন নব্বই

বদরুদ্দীন উমর সম্পর্কে আমার আগ্রহ তার রাজনৈতিক পরিচিতি নিয়ে নয়, আমি সে রাজনীতির অনুরক্তও নই। আমার কাছে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক, সমাজ ও রাষ্ট্র সমীক্ষক এবং ঐতিহাসিকও। সংস্কৃতির সংকট, ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার রাজনীতি, এমার্জেন্স অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র তার স্মরণীয় রচনা। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো সরকার ও সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তি করতে তাকে দেখা যায়নি। হালুয়া-রুটি, পদ, খেতাব, প্লট ইত্যাদি বাগিয়ে নেননি। বিগলিত মেরুদন্ড নতজানু ব্যক্তির বুদ্ধিজীবী দাবিদার হওয়ার সুযোগ নেই। বদরুদ্দীন উমর অবশ্যই ব্যতিক্রম, তিরিশে যেমন ছিলেন, নব্বইতেও তা-ই।  এ লেখাটির প্রায় পুরোটাই বদরুদ্দীনের উমরের অরাজনৈতিক স্মৃতি নিয়ে। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের যে বাড়িতে বদরুদ্দীন উমরের জন্ম তা এক ইংরেজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বর্ধমানের জমিদার বংশগোপাল ক্ষেত্রী কিনেছিলেন। হাত ঘুরে সে বাড়ির মালিকানা বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিমের নানা নবাব আবদুল জব্বারের মেজ মেয়ে নসিবা খাতুনের ওপর বর্তায়। পার্কাস রোডের এই বাড়িটি স্মৃতিময় এবং ঐতিহাসিক। উমর লিখেছেন :

‘বাড়িটি এক সময় ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হাসপাতাল। বিদ্যাসাগর অনেকদিন বর্ধমানে ছিলেন। তখন সেখানে একবার ম্যালেরিয়া ব্যাপকভাবে দেখা দিলে কিছুদিনের জন্য তিনি সেই হাসপাতাল করেছিলেন। বিদ্যাসাগর নিজেও থাকতেন পার্কাস রোড থেকে বের হওয়া একটি গলিতে, তাঁর এক বন্ধুর বাসায়। তাঁর কাছে সে বাসায় অনেকেই আসতেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও সেখানে একবার এসেছিলেন বিদ্যাসাগরের কাছে। বিদ্যাসাগর খুব ভালো রাঁধতে জানতেন। তিনি নিজের হাতে তাকে রেঁধে খাইয়েছিলেন।’ তার বাবার নানা আবদুল জব্বার রামতনু লাহিড়ীর ছাত্র এবং বঙ্কিমচন্দ্রের সহপাঠী। দু’জনই বিএ পড়ার সময় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পেয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন, আবদুল জব্বারের আর তা করা হয়নি। গ্রামের মুক্ত আরণ্যক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন, গ্রামীণ বালকের মতোই। ‘গ্রামের প্রকৃতি গাছপালা রাস্তাঘাট বনজঙ্গল এসবের মধ্যে আমরা ঘুরতাম। ফড়িং ধরতাম, গুবরে পোকা ধরতাম, লাল ভেলভেটের মতো এক রকম পোকা ধরতাম, ধরে শিশিতে পুরে রাখতাম। ঝোপঝাড়ে গজিয়ে ওঠা বৈচী গাছ থেকে বৈচী ফল, করমচা ইত্যাদি খেতাম।’

স্কুলে অতিরিক্ত ভাষা উর্দু শিখতে হতো, বাড়িতে এসে উর্দু পড়াতেন মৌলবি আবদুল মালেক। ছোটখাটো মানুষটি যৌবনে তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে বিহারের গয়া থেকে বর্ধমানে চলে এসেছিলেন। এখানেই কেটেছে তার বাকি জীবন। কখনো ফিরে যাননি। কিন্তু তিরিশ বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশে থেকে তিনি এতটুকু বাংলাও শেখেননি। উমরকে তার সঙ্গে উর্দুতেই কথা বলতে হতো। একবার লেখক ও সম্পাদক কাজী মহম্মদ ইদরিস বর্ধমানে তাদের বাড়িতে এলে মৌলবি মালেকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং এতদিনেও তিনি বাংলা না শেখায় তিনি বিস্মিত হন। মৌলবি মালেক একই সঙ্গে স্নেহপরায়ণ ও রাগী মানুষ। পড়ার সময় চড়থাপ্পড় মারতে দ্বিধা করতেন না। যদিও তিনি নিজের ডেরায় থাকতেন তবুও তিনি তাদের বৃহৎ পরিবারের একজন বলেই বিবেচিত হতেন।

বদরুদ্দীন উমর শৈশবে আবৃত্তি করতেন, নাটকে অভিনয় করতেন। শান্তিনিকেতনের সাবেক শিক্ষক সত্যেন ঘোষাল তার স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর স্কুলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড অনেক বেড়ে যায়। স্কুল জীবনে তিনি শেকসপিয়র ও বার্নার্ড শ-র নাটক করেছেন। ১৯৪৭-এ রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৪৪ সালে ক্লাস সেভেনে থাকার সময় ক্লাসের হাই বেঞ্চগুলো লো বেঞ্চের ওপর কাত করে রেখে চলে এসেছিলেন। দারোয়ান এ অবস্থা দেখে ক্লাস টিচার ধর্মদাস বাবুর কাছে অভিযোগ করেন, কিন্তু অপরাধী শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু খারাপ সম্পর্কের কারণে অপর একটি ছেলে এই দুষ্কর্মের দায় অবন্তী নামের একটি ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে ধর্মদাস বাবু অবন্তীকে দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বকাবকি করতে শুরু করলে বদরুদ্দীন উমরের নিজের ভেতর একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এটা অবন্তী করেনি, আমি করেছি।’ ধর্মদাস বাবু অবন্তীকে ছেড়ে দিলেন কিন্তু প্রকৃত অপরাধীকে কিছু বললেন না কারণ তিনি মনে করলেন উমর অপরাধ স্বীকার করে নৈতিক সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।

সে সময় বর্ধমান কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান। কখনো ছাত্ররাজনীতি না করলেও উমর পার্টির কিছু ক্লাসে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙার এবং বিনয় চৌধুরী। দুজনই ভূমি সংস্কার ও বর্গাচাষির অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রবক্তা। বর্ধমান রাজ কলেজের স্মৃতিতে উঠে এসেছে তখনকার ছাত্র শিল্পী কামরুল হাসান এবং কবি হাবিবুর রহমানের নাম। এ দুজন এবং তার ফুপাতো ভাই মইজ মিলে ‘আবীর’ নামে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বের করতেন। লেখা জোগাড় করতেন হাবিবুর রহমান আর পত্রিকা অলঙ্করণ করতেন কামরুল হাসান ও মঈজ। মুসলমানের সন্তান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি কায়দায় ‘হাতে তখতি’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার পড়াশোনার শুরু। রেহেলের ওপর রাখা কোরআন শরিফ থেকে মৌলবি সাহেব কোনো আয়াত পড়তেন তারপর শিক্ষার্থীকে কাগজে দু’একটি আরবি হরফ লিখতে হতো। ‘হাতে তখতি’-র সময় উমর শেরওয়ানি-পাজামা এবং মাথায় টুপি পরেছিলেন। বাড়ির বৈঠকখানায়, কাশিয়াড়া স্কুলের মৌলবি সাহেব তার হাতে তখতি দিয়েছিলেন। তবে আরবি ও উর্দু পড়াতে যে মৌলবি সাহেব আসতেন তাকে ফাঁকি দিতে যা যা করা দরকার সবই তিনি করতেন।

সেকালে বাসিভাত (একালে পান্তাভাত) খাওয়ার দাওয়াত হতো এ বাড়ি ও বাড়ি। বাসিভাতের সঙ্গে দেওয়া হতে বেগুন, পটোল, ডাল, পোস্তো, ছোলার ছাতু, বড়া, মাছ ও মাংসের একাধিক ভর্তা, সঙ্গে লাল মরিচ পোড়া, গোটা গোটা পেঁয়াজ এবং আম ও কুলের মিষ্টি আচার ও টক দইও দেওয়া হতো। ১৯৪৬ সালে নাজিমুদ্দীন মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রামের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে বাসিভাত খাইয়েছিলেন তার পিতা আবুল হাশিম। প্লেটে নয়, চীনা মাটির জামবাটিতে বাসিভাত খাওয়া হতো। শহীদ সাহেব ও তার দলবলকে আপ্যায়ন করার মতো এত জামবাটি না থাকায় কৃষকদের বাড়ি থেকে অনেক কাঁসার জামবাটি আনা হয়েছিল। বারোদুয়ারীর লম্বা বারান্দার মেঝেতে এক বিরাট দস্তÍরখানায় বসে অতিথিরা বাসিভাত খেয়েছিলেন। সে ছবি কলকাতার ইংরেজি স্টেটসম্যান পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ছিল বর্ধমান হাউজ, পরবর্তীকালের বাংলা একাডেমি। সে সময় আধুনিক ঢাকা বলতে বোঝানো হতো নবাবপুর রেলক্রসিং পার হয়ে গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। পুরান ঢাকার তুলনামূলকভাবে আধুনিক এলাকা ছিল ওয়ারী এবং পুরানা পল্টন। বদরুদ্দীন উমর তখনকার কয়েকটি রেস্তোরাঁর কথা লিখেছেন : ঠাঁটারী বাজারের মাথায় নবাবপুর রোডের ওপর ছিল ‘ক্যাপিটাল’ নামে একটা ছোট রেস্তোরাঁ। সেখানে রাজনৈতিক কর্মীদের আড্ডা হতো। এছাড়া নবাবপুর রোডের ওপর জেলা জজ কোর্টের উল্টোদিকে ছিল ‘ও কে রেস্তোরাঁ’ নামে তুলনামূলকভাবে সামান্য বড় এক ‘আধুনিক’ রেস্তোরাঁ। সেখানে চপ-কাটলেট বানাত ভালো। শরাবের ব্যবস্থাও সেখানে থাকতই, কেউ কেউ সেখানে ঐ জন্যই যেত। তবে ছাত্রদের শরাব খাওয়ার অভ্যাস তখন ছিল না, এ জন্য চপ-কাটলেট খেতেই ছাত্ররা যেত সেখানে। সদরঘাটের ছোট দুই একটা রেস্তোরাঁ ছিল, সেখানে ছাত্ররা আড্ডা দিত, চা খেত। তবে পুরান ঢাকার চকবাজার ছিল কাবাব-পরোটা ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত। সেখানে একাধিক পুরনো স্টাইলের রেস্তোরাঁয় পরোটা বাখরখানি ইত্যাদির সঙ্গে কাবাব খাওয়া যেত। এসব দোকান এখনো আছে। এসব ছাড়া ঢাকা রেস্ট হাউজের উল্টোদিকে এখন যেখানে গুলিস্তান চত্বর তার পাশেই একটা বিল্ডিং ছিল যেখানে ‘রিৎজ’ নামে একটি আধুনিক রেস্তোরাঁ ছিল। ‘ও কে রেস্তোরাঁ’র মতো সেখানেও কাঁটা, ছুরি, চামচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া যেত।

বদরুদ্দীন উমর পিতৃভূমি বর্ধমান ছেড়ে ১৯৫০ সালে যখন ঢাকায় আসেন তখন তিনি যে ক’টা সিনেমা হল পেলেন সেগুলো হচ্ছে সদরঘাটের রূপমহল, জেলা জজ কোটের সামনে মুকুল, ইসলামপুর পাটুয়াটুলীতে লায়ন, আরমানিটোলা মাঠের পাশে নিউ পিকচার হাউজ, বংশালে মানসী আর পল্টন ময়দানের কাছে ব্রিটানিয়া। তখন স্থানীয় সিনেমাশিল্প গড়ে না ওঠায় হলগুলোতে ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শিত হতো আর ব্রিটানিয়া দেখাত কেবল ইংরেজি মুভি। টেক্সট বইয়ের চেয়ে বাইরের বই-ই স্কুলজীবনে অধিকতর প্রিয় হয়ে ওঠে। বদরুদ্দীন উমরের বেলাতেও তাই ঘটল। ইউরোপীয় লেখকদের বিখ্যাত বইগুলো সে সময় সযত্নে সংক্ষেপে বাংলায় ভাষান্তর করে বাজারে ছাড়া হতো। ‘আজকাল ঢাকার বাজারে এ ধরনের কিছু বইপত্র পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলোর মধ্যে যতেœর অভাব খুব স্পষ্ট। দেখেই মনে হয়, ছোটদের শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে সংস্কৃতির চেতনা সৃষ্টির পরিবর্তে টাকা-পয়সা রোজগারই এগুলো বাজারে ছাড়ার মূল উদ্দেশ্য।’ ‘লে মিজারেবলস’, ‘এ টেল অব টু সিটিজ’, ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’, ‘কাউন্ট অব মন্টেক্রিস্টো’, ‘প্রিজনার অব জেন্দা’, ‘অলিভার টুইস্ট’, এসব বইয়ের সঙ্গে এ সময় তিনি পড়তে শুরু করলেন ডিটেকটিভ বই। শার্লক হোমস অনুসরণ করে কিরিটি রায়ের লেখা রোমাঞ্চকর টিকটিকিগিরির কাহিনীর প্রতি আকর্ষণ উত্তরোত্তর বেড়ে যেতে শুরু করল। আফ্রিকায় গুপ্তধনের জন্য অভিযান, আসাম ও মণিপুরের আদিবাসীদের উপাখ্যান, মন্দিরে নরবলি এসব কাহিনী তাকে আকৃষ্ট করত। ডিটেকটিভ ও রোমাঞ্চ তাকে সরবরাহ করতেন স্কুলের সহপাঠী ও বন্ধু কামাখ্যা মুখোপাধ্যায়, তার ডিটেকটিভ বইয়ের বেশ সমৃদ্ধ মজুদ ছিল। কিন্তু এসব বই খুব বেশিদিন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। তবে আগাথা ক্রিস্টি তিনি ছাড়েননি। ইউনিভার্সিটি জীবনেও পড়েছেন কারণ তিনি মনে করেন ক্রিস্টির ভাষা ও কাহিনী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে লজিকের ব্যবহার এবং কাহিনী বর্ণনার মধ্যে সাহিত্যের উৎকর্ষতা রয়েছে। সুকুমার রায়ের আবোল-তাবোল প্রায় পুরোটাই ছিল তার মুখস্ত। সঞ্চয়িতা (রবীন্দ্রনাথ), সঞ্চিতা (নজরুল) থেকে ও ইংরেজি কবিতার বই থেকে আবৃত্তি করতেন।

বর্ধমান টাউন স্কুলে পড়ার সময়ই একবার টাইফয়েডে আক্রান্ত হলেন। তখন পর্যন্ত টাইফয়েডের ওষুধ বাংলার বাজারে আসেনি। টাইফয়েডে মৃত্যুই পরিণতি এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিল অনেকেরই। টানা ৫৫ দিন ভুগে বদরুদ্দীন উমর সেরে উঠলেও এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো এবং হাঁটা চলার শক্তি তার ছিল না। এতদিন ডাবের পানি, ছানার পানি এসবই ছিল পথ্য। ডাক্তার শৈলেন মুখার্জি যেদিন তাকে ভাত খাওয়ার অনুমতি দিলেন সেটি ছিল তার জন্য উৎসবের দিন। কেবল এক বেলা, দুপুরে খুব নরম ভাত আর শিং মাছের পাতলা সুরুয়া। আর খাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে উপস্থিত হলেন তার দাদির আপন মামা আবদুর রাজ্জাক আনসারী যাকে তিনি ডাকতেন বড় বাপ। ঠিক খাবারের সময় তার উপস্থিতির হেতু যেন প্রথম দিন টাইফয়েড থেকে ওঠা রোগী বেশি না খেয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ বেশি খেলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। ‘১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় এরকম ঘটনা কখনো কখনো ঘটত। আমাকে খুব অল্প পরিমাণে ভাত দেওয়া হলো। সেটা খাওয়ার পর আমি আরও খেতে চাইলে বড় বাপ একেবারে সেটা নিষেধ করলেন এবং ভাত তরকারি যা ছিল সব সরিয়ে নেওয়া হলো।’

সিগারেট স্মৃতি

উমর আর সুহৃদ টুলুর সৃজনশীল ইচ্ছে খড়ের ডগা কেটে তার মাথায় আগুন দিয়ে বড়রা যেমন করে সিগারেট টানেন সে কাজটাই করবেন। পরিকল্পনা সফল করতে এক বাক্স দেয়াশলাই জোগাড় করলেন। যখন টানতে থাকলেন, তাদের অজ্ঞাতে খড়ের গাদায় আগুন লেগে গেল; আগুন নিয়ন্ত্রণের সাধ্য তাদের নেই বুঝতে পেরে সংলগ্ন একটি মুরগির ঘরে গিয়ে লুকালেন। আগুনের উত্তাপ সেখানে তাদেরও স্পর্শ করছে। দাউ দাউ আগুন নেভাতে চারদিকে থেকে লোকজন ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনে এবং মুরগির ঘর থেকে দুই অপরাধীকে টেনে বের করে। তাদের এই লুকিয়ে থাকাই প্রমাণ করে যেভাবেই হোক অপকর্মটি তাদেরই কীর্তি।

সাফল্যের সঙ্গে প্রথম সিগারেট খাওয়ার কাহিনীও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। দুপুরের দিকে দু’প্যাকেট সিগারেট কিনে ময়দানের উত্তর প্রান্তে গাছপালা ঘেরা বসার জায়গা নির্ধারণ করলেন। পুরো দুই প্যাকেটই শেষ করতে হবে। একটা পর একটা সিগারেট খাওয়া চলল। ‘দেখা গেল আমিই সব থেকে বেশি সিগারেট টানলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা কয়জন মিলে দুই প্যাকেট শেষ করতে পারলাম না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। এ জন্য বাকি কয়েকটা সিগারেট আমরা সেখানে ফেলে দিয়ে মাঠের ওপর দিয়ে বাড়ির রাস্তা ধরলাম। কেউ সিগারেট খাওয়ার কথা কাউকে না বলে এটা আগেই ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু মুখে সিগারেটের গন্ধ। সেজন্য আমরা ঠিক করলাম পান খেতে হবে। কাজেই ফিরে এসে আবার বটতলার এক দোকান থেকে কিনে আমরা পান খেলাম।’

(আগামীকাল দ্বিতীয় কিস্তিতে সমাপ্য)