ভুল স্বীকার সংশোধনের পথ দেখায়

মাত্র সপ্তাহ দেড়েক আগে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসকরা জন্মের পর থেকে জোড়া লাগা দুই বোন লাবিবা-লামিসাকে অস্ত্রোপচার করে সফলভাবে আলাদা করতে সক্ষম হন। এর আগেও ২০১৭ সালে তোফা-তহুরা এবং ২০১৯ সালে রাবেয়া-রোকাইয়া নামের আরও দুই জোড়া লাগা যমজ বোনকে অস্ত্রোপচারে সফলভাবে আলাদা করেছিলেন একই হাসপাতালের চিকিৎসকরা। কিন্তু ঢাকায় লাবিবা-লামিসাকে আলাদা করার অস্ত্রোপচারের ঠিক আগের দিন ১১ ডিসেম্বর ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেকটি অস্ত্রোপচারের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। ফরিদপুরের অস্ত্রোপচারটি ছিল ১৯ বছরের তরুণী মনিরা খাতুনের পেট থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা মিডিয়াম সাইজের একটা আর্টারি ফরসেপ বা কাঁচি বের করে আনার জন্য। এ ঘটনার ৬৪৩ দিন আগে একই হাসপাতালে একটি সিস্ট অপসারণে অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের অজ্ঞাতসারে ওই কাঁচিটি মনিরার পেটের ভেতর রয়ে যায়। মনিরার প্রথম অস্ত্রোপচারটি হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ মার্চ। কিন্তু সেলাই শুকিয়ে গেলেও মনিরা সুস্থ না হওয়ায় আর তার পেটে ক্রমাগত ব্যথা বাড়তে থাকায় পরবর্তী চিকিৎসার একপর্যায়ে বিষয়টি ধরা পড়ে এবং অস্ত্রোপচার করে কাঁচিটি বের করে আনা হয়। মনিরা এখনো হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন। তার অবস্থা স্থিতিশীল হলেও গুরুতর সমস্যা নিয়ে মনিরা কবে নাগাদ সেরে উঠতে পারবেন তা জানাতে পারেননি চিকিৎসকরা।

তরুণী মনিরার জীবনে ঘটে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এ ঘটনা সংবাদমাধ্যমের বরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। আর এখন সমালোচনা হচ্ছে এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে। কেননা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনিরা খাতুনের পেটে কাঁচি রেখে সেলাইয়ের ঘটনায় কারও গাফিলতি চিহ্নিত হয়নি। ফলে কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেনি এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি। হাসপাতালটির পরিচালক সাইফুর রহমান আরও জানিয়েছেন, ‘বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের সময় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্জারি ইউনিট ২-এর দায়িত্বে নিয়োজিত সহযোগী অধ্যাপক মোল্লা সরফউদ্দিনের অধীনে মনিরা খাতুনের অস্ত্রোপচারে আরও তিন-চার চিকিৎসক অংশ নেন। কার গাফিলতিতে এটি হয়েছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে অস্ত্রোপচারের সময় একজন নার্সকে যন্ত্রপাতির দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারে যুক্ত সবাইকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার সুপারিশ করেছে। এদিকে এ ঘটনায় মনিরা খাতুনের পরিবারকে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ফরিদপুরের সিভিল সার্জনসহ ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের এ নোটিস পাঠানো হয়। ১৫ ডিসেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. শাহিনুজ্জামান ও সৈয়দা নাসরিন এ নোটিস পাঠান।

মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারেন। চিকিৎসকরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। অস্ত্রোপচারের সময় এ ধরনের ভুলের ঘটনা দেশ-বিদেশে আরও অনেক হয়েছে এ কথা সত্যি। কিন্তু কে বা কারা সেজন্য দায়ী তা জানা যাবে না কেন? সংগত কারণেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার ভুল সেটা চিহ্নিত করা গেল না কেন? কিংবা যে চিকিৎসক ও সহযোগীরা ওই অস্ত্রোপচারে যুক্ত ছিলেন তাদের কাউকেই কোনো শাস্তির আওতায় আনা হলো না কেন? এসব প্রশ্ন যেমন উঠছে তেমনি প্রশ্ন উঠছে যে, প্রথম অস্ত্রোপচারের পর ৬৪৩ দিন পেরিয়ে গেলেও পেটে কাঁচি রয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ল না কেন? পেটে কাঁচি/গজ/ছুরি থেকে যাওয়ার ঘটনা ভুলবশত ঘটতে পারে বটে। কিন্তু পৌনে দুই বছরেও এটা ধরা না পড়া নিশ্চয়ই দেশের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আর এটাও স্মরণ রাখা দরকার বিশে^র অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই পুরো অস্ত্রোপচারের ভিডিও ধারণ করার রীতি প্রতিষ্ঠিত। ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল বা অপরাপর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো কি এই চর্চা অনুসরণ করছে না?

এটা মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসক ঘাটতি বাংলাদেশে এখনো বিপুল। রোগী-চিকিৎসক কাম্য হারের হিসাবে সেটা প্রায় ৭০ শতাংশ। তথাপি দেশের চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। নানা জটিল রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি দুরূহ অস্ত্রোপচার এবং কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বাংলাদেশের চিকিৎসকরা দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন। টিস্যু ব্যাংকের সুবিধা নিয়ে গত ১২ বছরে দেশে দুই লাখ মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে মাথার খুলি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ৩৪৭টি। এসব দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতিরই ফসল। কিন্তু চিকিৎসকদের অবশ্যই সেবাপরায়ণতার পাশাপাশি ভুল স্বীকারের মানসিকতা দেখাতে হবে। ভুল স্বীকারই সংশোধনের পথ দেখায়।