রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে হাসানুল হক ইনুর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ইসি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
গতকাল বুধবার জাসদ নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি এ সহযোগিতা কামনা করেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রেস অনুবিভাগের উপ-প্রেস সচিব মুন্সী জালাল উদ্দিনের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
নতুন ইসি গঠনে দেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নেওয়ার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ পায় ইনুর জাসদ। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার পর বঙ্গভবনে যায় জাসদের ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল। সেখানে রাষ্ট্রপতিকে এই প্রস্তাব দেন জাসদ নেতারা।
ইসি গঠন নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ শেষে হাসানুল হক ইনু তাদের দেওয়া প্রস্তাবগুলো সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। এর আগে বিকেল ৪টা থেকে এক ঘণ্টার বেশি সময় তারা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করেন। গত সোমবার জাতীয় পার্টি প্রথম দল হিসেবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নসহ তিন দফা প্রস্তাব দেয়।
হাসানুল হক ইনু বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনি কাঠামোর অনুপস্থিতিতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠন তুলনামূলক ভালো উদ্যোগ এবং এ উদ্যোগকে তারা সমর্থন করেন। তিনি সার্চ কমিটিতে সাংবিধানিক সংস্থাগুলো থেকে সদস্য নেওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মত দেন। ইনু বলেন, ‘এমন লোককে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যাদের মধ্যে সততা, নিষ্ঠাগুণ ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।’
ভবিষ্যতের জন্য আইন করার উদ্যোগ নিতে তারা রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেছেন উল্লেখ করে সাবেক মন্ত্রী ইনু বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে প্রতি ৫ বছর পর পর বিব্রতকর অবস্থা হয়। তার থেকে স্থায়ী সমস্যার সমাধান করতে রাষ্ট্রপতি যেন ভূমিকা গ্রহণ করেন। ভবিষ্যতে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করার জন্য উনি যেন সরকারকে উপযুক্ত পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেন।’
‘আইন করে সংসদ, রাষ্ট্রপতির কাছে কেন এই প্রস্তাব’ এমন প্রশ্নে ইনু বলেন, ‘আইন সংসদই করবে। সরকারই করবে। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের রক্ষক। সংবিধানের নির্দেশনা বাস্তবায়নে উনি ভূমিকা রাখতে পারেন। এজন্য সরকারকে পরামর্শ দিতে অনুরোধ করেছি। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে যেন সরকার উদ্যোগ নেয়। এজন্য সব মহলকে বিব্রত হওয়া থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি ভবিষ্যতের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে উদ্যোগ নেবেন।’
সার্চ কমিটি সাংবিধানিক সংস্থা থেকে হওয়া বাঞ্ছনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আপিল বিভাগের বিচারপতি, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধানসহ সার্চ কমিটি গঠন করতে বলেছি। এজন্য আমরা কোনো নাম প্রস্তাব সমীচীন মনে করিনি। একজন নারী এবং একজন অধ্যাপক পর্যায়ের দুজন সার্চ কমিটিতে থাকার কথা। সেক্ষেত্রেও আমরা নাম প্রস্তাব করিনি। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপতি এই দুজন মনোনয়ন দেবেন। নাম প্রস্তাব করে আমরা এক্ষেত্রে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।’
সার্চ কমিটি নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে জাসদ সভাপতি বলেন, ‘গত কয়েকটি নির্বাচন কমিশন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে হয়েছে। কখনো বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কখনো বিতর্ক দেখা দেয়নি। আমরা সংলাপে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যতদূর সম্ভব একটি দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করতে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগকে সহযোগিতা করা বাঞ্ছনীয় মনে করেছি।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি বলেছেন, উনি অবিলম্বে সার্চ কমিটি গঠন করবেন। সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে যদি কোনো নাম চায় তাহলে সেখানে আপনারা (জাসদ) সহযোগিতা করবেন। সার্চ কমিটি দুজন করে নাম দেবে, তার থেকে উনি (রাষ্ট্রপতি) চূড়ান্ত করবেন। আমরা অনুরোধ করেছি, আপনি যে দক্ষতার মানুষই দেন না কেন, তিনি যেন ম্যান অব দ্য ইন্টিগ্রেটি হন। কোন পেশা থেকে এলেন বা কোন মতের লোক, সেটা বড় কথা নয়। যদি সৎ, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মানুষ হন। নির্বাচন কমিশন ভালো নির্বাচন উপহার দেবে।’
জাসদ প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠনই যথেষ্ঠ নয়, নির্বাহী বিভাগ যাতে নির্বাচন কমিশনের কাজে সার্বিক সহযোগিতা করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা নির্বাচন কমিশন গঠনে স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেন।
সার্চ কমিটির মধ্য দিয়ে আসা নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্ন থাকায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন পেতে বিভিন্ন মহল থেকে আগে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে। সেই দাবি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গত সোমবার এই সংলাপ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
সংলাপে জাসদের প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে আরও ছিলেন শিরীন আখতার, রবিউল আলম, মীর হোসাইন আক্তার, মোশারফ হোসেন ও রেজাউল করিম তানসেন।
জাতীয় পার্টি ও জাসদ ছাড়াও আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে সংলাপের শিডিউল হয়েছে। এদের মধ্যে ২৬ ডিসেম্বর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, ২৭ ডিসেম্বর তরিকত ফেডারেশন ও খেলাফত মজলিস, ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে সংলাপ করবেন রাষ্ট্রপতি। অন্যান্য দলের সঙ্গে শিডিউল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।