বিশ্বের অন্যতম ডেটা সেন্টার এখন দেশে

ডেটা সংরক্ষণ ও সুরক্ষা এখন ডিজিটাল বিশ্বের সময়ের দাবি। ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে ডেটা সেন্টারের উদ্বোধন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আপটাইম ইনস্টিটিউট কর্র্তৃক স্বীকৃতপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র ফোর টিয়ার ডেটা সেন্টারটি ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডেটা সেন্টার ডাইনামিক সংস্থা কর্র্তৃক ‘ডিসিডি-এপিএসি অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ অর্জন করে। এ ফোর টিয়ার ডেটা সেন্টার সরেজমিন ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে উঠে আসে অপার সম্ভাবনার এই ডেটা সেন্টারের বাস্তবতার গল্প। গত ১৩ বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তরের গল্প নিয়ে দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি উম্মুল ওয়ারা সুইটির ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘রূপকল্প ২০২১’-এর ঘোষণা দেন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই উদ্যোগ নেয় সরকার। হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার ডেভেলপ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল সেবা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেই সময় উঠে আসে বিশ্বের সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপের। দেশের তথ্য-উপাত্ত নিরাপদে সংরক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন গুণগতমান সম্পন্ন ই-সেবা নিশ্চিতের বিষয়টি মাথায় আসে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় দেশে একটি ফোর টিয়ার জাতীয় তথ্যভাণ্ডার নির্মাণের পরামর্শ দেন। তারই প্রতিফলন বিশাল এই তথ্যভাণ্ডার।

জানা গেছে, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের হাইটেক সিটিতে ৭ একর জমির ওপর এই তথ্যভাণ্ডার বা জাতীয় ডেটা সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডেটা সেন্টারের স্বীকৃতি পেয়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিং ও জি-ক্লাউড প্রযুক্তিতে ডেটা সেন্টারগুলোর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্থাপনা এটি; যার ডাউনটাইম শূন্যের কোঠায় এবং আপটাইম ৯৯ দশমিক ৯৯৫ শতাংশ।

এই ডেটা সেন্টারের ব্যাকআপ হিসেবে যশোরে স্থাপিত শেখ হাসিনা টেকনোলজি পার্কে দুই পেটাবাইট ক্ষমতাসম্পন্ন তিন স্তরবিশিষ্ট ‘ডিজাস্টার রিকোভারি ডেটা সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। যেকোনো কারণে জাতীয় ডেটা সেন্টার দুর্যোগকবলিত হলে সব তথ্য সেখান থেকে উদ্ধার করা যাবে। 

ডেটা সেন্টার কোম্পানির (বিডিসিসিএল) সচিব এ কে এম লতিফুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিজ দেশে নিজেদের তথ্য সংরক্ষণের কারণে বছরে সরকারের ৩৫৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এই তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে এটি বেড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্বমানের এই ডেটা সেন্টার স্থাপনের ফলে বিদেশি ডেটা সেন্টারের নির্ভরতা কমেছে।

লতিফুল কবির এই ডেটা সেন্টারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন, ২ লাখ স্কয়ারফিট বিশিষ্ট তথ্যভাণ্ডারের মূল দ্বিতল ভবন, দুই পাশে দুটি ইউটিলিটি ভবন এবং সামনে একটি অভ্যর্থনা ভবন। ডেটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রিডান্ডেন্সি (দ্বৈততা) রয়েছে। এখানে ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্লাউড ডেক্সটপ, ক্লাউড স্টোরেজ, ডেটা স্টোরেজ ও ব্যাকআপ, ডেটা সিকিউরিটি ও কো-লোকেশন সার্ভিস রয়েছে, যা সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

তিনি জানান, ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নির্বাচন কমিশন, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সরকারের ই-নথি ও এটুআই প্রকল্পসহ সরকারের ১০টি প্রতিষ্ঠান সার্ভিস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং আরও ১২টি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষরের পর্যায়ে রয়েছে।

লতিফুল কবির বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এত বড় ডেটা সেন্টার দেখে বিদেশিরাই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। অনেকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বর্তমানে ডেটা সেন্টারে ওরাকল পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আগামীতে জি-ক্লাউড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই জি-ক্লাউড স্থাপিত হলে তথ্য আরও নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাবে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যও রাখা যাবে।

তিনি বলেন, এখানে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ডিজিটাল কনটেন্ট সংরক্ষণের ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্টগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বীকৃতিও পেয়েছে।

ডেটা সেন্টার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিশালাকার এই ডেটা সেন্টারে আছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৬০৪টি র‌্যাক, ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-সংযোগের জন্য নিজস্ব ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন, জেনারেটর, উচ্চগতিসম্পন্ন ডেটা কানেকটিভিটি, ইন্টারনেট সংযোগ, অত্যাধুনিক রাউটার, সুইচ, ফায়ারওয়াল, স্টোরেজ সার্ভার, ভার্চুয়াল মেশিনসহ প্রিসিশন এয়ার কন্ডিশন সিস্টেমস, অনলাইন ৮ মেগাওয়াট ইউপিএস সিস্টেম, ইনটেলিজেন্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা, ক্লাউডের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ও সিকিউরিটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মতো নানা প্রযুক্তি।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি খাতের তথ্য সংরেক্ষণের জন্য বড় পরিসরে ডেটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই তথ্যভাণ্ডার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ‘ফোর টিয়ার ন্যাশনাল ডেটা সেন্টার’ স্থাপনের কাজটি করা হয়েছে। জনপ্রশাসনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কাজের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো, তথ্য সংরক্ষণ ও জনগণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতেই এ উদ্যোগ।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এতে ডিজিটাল কনটেন্টগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনসেবা উন্নীত হবে। এতে ডিজিটাল কনটেন্টগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জনসেবা উন্নত হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘হাইটেক পার্ক, শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং স্কুল অব ফিউচার’ যদি হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘হাত-পা’, তাহলে এই ‘ডেটা সেন্টার’ হলো ‘মস্তিষ্ক’।

পলক বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি কার্যালয়ের আইসিটি কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত থাকবে। দেশে আধুনিক ডিজিটাল কার্যক্রম, সেবা প্রদান ও ই-বিজনেসের মূলভিত্তি হবে এই ডেটা সেন্টার।

জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, আমরা গভর্নমেন্ট ক্লাউডে (জি-ক্লাউড) যাব। এতে আমাদের তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা অসীম হবে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে আমরা ওরাকল জি-ক্লাউড শুরু করতে পারব। তখন এটি হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় জি-ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম।’

জানা গেছে, রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম, ১১ কোটি জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-নথি, সুরক্ষাসহ ৫৫ হাজার ওয়েবসাইট এই ফোর টিয়ার ডেটা সেন্টারে রক্ষিত আছে। ডেটা সেন্টারের ক্লাউড সার্ভিস থেকে ভার্চুয়াল মেশিন তৈরি করে গ্রাহককে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গ্রাহক যেকোনো স্থান থেকে লগইন করে সেবা গ্রহণ করতে পারে। এতে গ্রাহকের কোনো হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার কেনা বা রক্ষণাবেক্ষণের দরকার হয় না। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করে গ্রাহক সুরক্ষিতভাবে নিশ্চিন্তে ই-সেবা গ্রহণ করতে পারে।

আবার কো-লোকেশন সেবায় গ্রাহকের জন্য বিদ্যুৎ-সংযোগসহ শীতাতপব্যবস্থা, বিশ্বমানের অগ্নিনির্বাপণ, নিরাপত্তা, ইন্টারনেটসহ সব সুবিধাসংবলিত স্পেসের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বমানের অগ্নিনির্বাপণ, নিরাপত্তা, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবস্থাসংবলিত স্পেস দেওয়া হয়ে থাকে। গ্রাহক নিজের পছন্দমতো আইটি যন্ত্রপাতি স্থাপন করে সেবাগ্রহণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে স্থাপিত আইটি যন্ত্রপাতিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা গ্রাহককে করতে হয়।

ডেটা সেন্টারটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড শীর্ষক কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদিত হয়। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড নামে কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। এরপর ‘বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল)’ কার্যক্রম শুরু করে।