ধর্মীয় স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি, মানুষ স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে অথবা যেকোনো আকিদাভুক্ত হতে পারবে। অনুরূপভাবে সে কোনো ধর্ম বা আকিদা গ্রহণ না করেও থাকতে পারবে। অর্থাৎ যেকোনো ধর্ম বা আকিদা অবলম্বন করার বা না করার তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। এতে তাকে কেউ জোর-জবরদস্তি করতে পারবে না। তবে তাকে জান্নাতের আশা ও জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে এবং যুক্তিতর্ক দ্বারা ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে আহ্বান করা যাবে।
ইসলাম একদিকে যেমন মানুষকে কোনো ধর্ম গ্রহণ করা বা না করার স্বাধীনতা প্রদান করেছে, অন্যদিকে যেকোনো মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করারও অধিকার দিয়েছে। কিন্তু জোর-জবরদস্তি করে কাউকে ধর্মে প্রবেশ করানো অবৈধ ঘোষণা করেছে। মদিনার আনসারগণের মধ্যে এক ব্যক্তির দুই ছেলে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। অতঃপর পুত্রদ্বয় যখন মদিনায় আগমন করে তখন তাদের পিতা তাদের বল প্রয়োগ করে ইসলামে প্রবেশ করাতে চাইলে তারা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করে। তখন আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আয়াত নাজিল হয়, ‘দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। কেননা ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথ দিবালোকের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।’ সুরা আল বাকারা : ২৫৬
কেউ কেউ বলেন, উক্ত আয়াতে কারিমার বিধান পরবর্তী সময়ে নাজিলকৃত যুদ্ধের নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে, ‘হে নবী! আপনি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জেহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর নীতি গ্রহণ করুন। তাদের চূড়ান্ত পরিণতি জাহান্নামে এবং পরিণতি হিসেবে তা অত্যন্ত দুঃখময় স্থান।’ সুরা আত তাহরিম : ৯
মূলত যুদ্ধ সংক্রান্ত আয়াতে কারিমা ওইসব লোকের জন্য প্রযোজ্য যারা ইসলামের ক্ষতি সাধন করে। মূল কথা হলো, ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার জন্য কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর ধর্মকে নিয়ে তাল-বাহানা করারও কোনো সুযোগ নেই।
আরব পৌত্তলিকদের মহানবী (সা.)-এর প্রতি চরম নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি তাদের সঙ্গে শক্তি প্রদর্শনের কোনো পন্থাই অবলম্বন করেননি। কেননা তিনি নিজের ও অন্যদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতাই চেয়েছিলেন। যেমন আল্লাহতায়ালা নবী কারিম (সা.) কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, হে নবী! আপনি মুশরিকদের বলে দিন, তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম এবং আমাদের জন্য আমাদের ধর্ম।’ সুরা আল কাফিরুন : ৭
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি পরিষ্কার বলে দিন, এ হচ্ছে সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে, এখন যে চায় সে তা গ্রহণ করুক এবং যে চায় অস্বীকার করুক। আমি (অস্বীকারকারী) জালেমদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত রেখেছি।’ সুরা আল কাহাফ : ২৯
এ সব আয়াতে কারিমা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইমান গ্রহণ বা কুফরি করা মানুষের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য মানুষের এ ইচ্ছা মহান আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। কেননা আল্লাহতায়ালা সব বিষয় ও বস্তুর সৃষ্টিকর্তা। মানুষ তার কৃতকর্মের কারণেই পাপ-পুণ্যের অধিকারী হবে। এক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ যে ধর্ম সত্য, তাতে দলভুক্ত করতে জোর-জবরদস্তি করতে হয় না। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মন জয় করতে পারে। কেননা হক বাতিল হতে সম্পূর্ণরূপে পৃথকভাবে বিরাজমান। সুতরাং শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনই বা কী?
মুসলমানদের ধর্ম ও জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে অন্যদের জীবন ব্যবস্থার কোনোই সামঞ্জস্যতা নেই। যেহেতু এতদুভয়ের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ রয়েছে, তাই এদের সমঝোতা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই ধর্মের প্রচার ও প্রসারতার জন্য জবরদস্তির কোনো প্রয়োজন নেই। ধর্ম গ্রহণ ও বর্জনের ব্যাপারে ইসলামে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এ মর্মে রাসুলে কারিম (সা.) কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের শাসক নন।’ সুরা আল-গাশিয়া : ২১-২২
বাক স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন মানুষের মর্যাদার জন্য অপরিহার্য, তেমনি তা কোনো আদর্শ প্রচারের জন্যও অপরিহার্য। ইসলামের ন্যায় একটি জীবনাদর্শের পক্ষে বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। বস্তুত ইসলাম এই নীতিকে এমন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে, যা পৃথিবীতে অন্য কোনো মতাদর্শে বা ধর্মে দেখা যায় না। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য শক্তি প্রয়োগের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। ইসলাম এ ধরনের কার্যক্রমকে আদৌ সমর্থন করে না। বরং পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উত্তম উপদেশ শুনিয়ে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়।’ সুরা আন নাহল : ১২৫
ইসলাম অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব ও পর্বগুলো পালনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছে। অবশ্য এটা রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের সীমার মধ্যে হতে হবে। এছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসরত অমুসলিমদের সব প্রকার লেনদেন ও কাজ-কারবারের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং অমুসলিমদের কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া যাবে না। অনুরূপভাবে ইসলাম অমুসলিমদের তাদের ব্যক্তিগত ক্রিয়া-কর্ম পালনে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছে। যেমন তাদের বৈবাহিক বন্ধন, তালাক, উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদি।
ইসলামে মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রতিফলন দেখা যায়। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা সুন্দরভাবে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। মুসলমানরা যখনই কোনো দেশ জয় করতেন, তখন অমুসলিমদের তাদের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবার সুবন্দোবস্ত করে দিতেন। মুসলমানরা অমুসলিম বিজয়ীদের ন্যায় পরাজিতদের জোরপূর্বক তাদের ধর্মে দীক্ষিত করবার চেষ্টা কখনো করেননি। ইতিহাসে এর বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।
ভারতে সর্বদাই অমুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তদুপরি মুসলমানরা আটশো বছর ভারত শাসন করেছেন। অন্যদিকে স্পেনে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ লাখ। কিন্তু অমুসলিমদের হাতে স্পেনের শাসনভার চলে যাওয়ার পর এখন সেখানে মুসলমান নেই বললেই চলে। সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময় বায়তুল মোকাদ্দাস জয়ের পর তিনি সব খ্রিস্টানদের সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন। এভাবে মুসলমান কর্র্তৃক বিজিত দেশগুলোর মুসলিমদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধিগুলোর চুক্তিনামা পড়লেই সহজে মুসলমানদের বদান্যতা ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের এ বদান্যতা ও সহনশীলতার দ্বারাই ইসলামের এত বিস্তৃতি লাভ ঘটেছে।
সুতরাং ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অনুসারীরা স্ব স্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে অনুসরণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কাজ করলে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায়। আল্লাহতায়ালা সবাইকে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে কবুল করুন।