নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হয়নি সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের নির্মাণকাজ। জেলার ১১টি উপজেলার ৪৬টি হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনুমোদিত ৭০২ প্রকল্পের মধ্যে অনুমোদন হয়েছে মাত্র ২৪৭টির। এর মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৩৬টি প্রকল্পের; অর্থাৎ প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। ১৫ ডিসেম্বর থেকে কাজ শুরু করে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ায় আবারও ফসলহানির শঙ্কায় কৃষকরা।
কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরে একসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতি। পরে বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই নীতিমালায় বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করা হয়। বাঁধের কাজে সরাসরি যুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। উপজেলা কমিটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বাঁধের কাজের প্রকল্প গ্রহণ ও পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন করে পাঠায় জেলা কমিটিতে। জেলা কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এবার প্রাথমিকভাবে ৭০২টি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে ১০-২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প গঠন ও অনুমোদনের নির্দেশনা এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধের কাজ শুরুর কথা থাকলেও ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২৪৭টি প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এর মধ্যে মাত্র ৩৬টির কাজ শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলার ৪৬টি হাওরে প্রায় ৫২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। এতে সরকার প্রাথমিক বরাদ্দ দিয়েছে ১১৭ কোটি টাকা। তবে পিআইসি গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার লোকজনসহ একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা সুবিধা নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী হাওরে গিয়ে গণশুনানি করে প্রকল্প গ্রহণ করার কথা থাকলেও সেটা করা হয়নি। ফলে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পসহ অযোগ্য লোকজন প্রকল্প কমিটিতে চলে আসছে। এতে সরকারের বিপুল বরাদ্দ লোপাটের আশঙ্কা করছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ৩৬টি প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা বলা হলেও কৃষকরা জানিয়েছেন, কাজের উদ্বোধন ছিল কেবলই লোক দেখানো। চলতি মাসে কাজ শুরু করার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা আরও জানান, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে পিআইসি গঠন বিলম্ব হয়েছে। বাঁধের কাজ বিলম্ব এবং বৃষ্টির সময় বাঁধের কাজ শুরু হলে পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণের ধাক্কায় ভেঙে গিয়ে ফসলহানির আশঙ্কা দেখা দেয়।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওর এলাকার স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, ‘হাওরে বোরো চাষাবাদ শুরু হয়ে গেছে, অথচ এখনো কোনো বাঁধে একটু মাটিও পড়েনি।’
‘হাওর বাঁচাও আন্দালন’-এর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যথাসময়ে কাজ শুরু এবং শেষ করা। স্থানীয়ভাবে গণশুনানির মাধ্যমে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠন করতে হবে। কিন্তু এটা যথাযথভাবে হয় না। দ্রুত কাজ শুরু না হলে বাঁধ নড়বড়ে ও বন্যাঝুঁকিতে থাকে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর বিভাগ-১) মো. জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাওরে বাঁধ নির্মাণের জরিপকাজ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন হাওরে পানি থাকায় প্রকল্প নির্ধারণের কাজ চলমান আছে। তবে প্রকল্প ও বরাদ্দ দুটোই বাড়বে। যেসব হাওর থেকে পানি ধীরে নামছে, সেখানে কাজ কিছুটা বিলম্বে শুরু হবে। তবে সবগুলো প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করার চেষ্টা করব।’