পদে পদে দায়িত্বহীনতা

বরিশাল বিভাগের সব কটি জেলা এবং চাঁদপুরসহ দক্ষিণের বেশ কয়েকটি জেলায় নৌপথ বেশ জনপ্রিয় ও আনন্দদায়ক। ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া এবং এলাকা থেকে শহরে আসতে বেশিরভাগ মানুষই বেছে নেন নৌপথের যান লঞ্চকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে কর্মব্যস্ত জীবনে যাত্রাপথই হয়ে ওঠে তাদের কাছে ভ্রমণের মতো। নিশ্চিন্তে নিরাপদে শিশু, প্রবীণদের নিয়ে লঞ্চের যাত্রা আনন্দঘন হয়ে ওঠে। এখন বরিশালের জেলাগুলোয় বাসে যেতে সময় আরও কম লাগে। আর চাঁদপুরে বাসে যেতে কখনো কখনো গুলিস্তান থেকে উত্তরা যাওয়ার থেকেই কম সময় ব্যয় হয়। কিন্তু তারপরও আড্ডা কিংবা একটু পারিবারিক আবহে যাওয়ার জন্য লঞ্চে চেপে যাওয়াই সবাই পছন্দ করে। ঢাকা থেকে বরিশালের বিভিন্ন জেলায় চালু থাকা লঞ্চগুলোর কেবিনকে অনেকেই লাক্সারিয়াস হোটেল-মোটেলের রুম মনে করে ভাড়া নেন।

কিন্তু গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী ‘এমভি অভিযান-১০’ লঞ্চে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড স্তম্ভিত করে দিয়েছে সবাইকে। আগুনের রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে সব কটি স্তরের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতা। গভীর ঘুম থেকে আগুনের তাপে জেগে ওঠা যাত্রীরা অনেকেই মনে করেছিলেন আর কোনো দিন তাদের সকাল হবে না। তারপরও প্রাণপণ চেষ্টা করে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচেছেন অনেকেই।

প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার বর্ণনা একেকজন একেকভাবে দিয়েছেন। আগুন লাগার উৎস নিয়েও নানা ধরনের বক্তব্য আসছে। ঘটনার পরদিন শুক্রবার সংশ্লিষ্টরা পরিদর্শন করেছেন ঘটনাস্থল। প্রাথমিক তদন্তে আগুনের উৎস ইঞ্জিনরুমের কথা বলা হয়। বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন নিয়েই লঞ্চটি যাত্রা করে। আর নির্দেশনা অনুযায়ী যাত্রী না তুলে দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ যাত্রী নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের এই লঞ্চের যাত্রায় দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল লম্বা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক তদন্তের পর লঞ্চের সুপারভাইজার আনোয়ারসহ লঞ্চের মালিক এবং অনেকেই বলছেন, আগুন লেগেছে ইঞ্জিনরুমের পাশে থাকা ক্যান্টিন থেকে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মহল বলছে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা হত্যাকাণ্ডের মতোই। তারা বলছে, ঘটনার পরপর তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু এসব তদন্ত কমিটি একেবারেই লোক দেখানো। তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। দৃশ্যমান কিছু শাস্তি হয়। এই শেষ। ফলে যারা এই সব অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত তারা কাজগুলো করেই যায়। তারা মনে করেন, এই দুর্ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত হোক, তাদের প্রচলিত নৌ দুর্ঘটনা আইনের পাশাপাশি এতগুলো হত্যাকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

ইঞ্জিনের পাশে কেন ক্যান্টিন এ প্রশ্নে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর আবু জাফর মো. জালাল উদ্দিন গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লঞ্চ ডিজাইনের জন্য যে নীতিমালা রয়েছে, সেই বিধিমালা মোতাবেক ডিজাইন হচ্ছে। আমাদের ৫০টির বেশি ড্রয়িং ডিজাইন হাউজ রয়েছে। তারা ডিজাইন করে। তারপর এক্সপার্ট টিম সেটা কারেকশন করে। এরপরই নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। কাজেই এটা অনুমোদিত ডিজাইন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারপরও আমি বলতে চাই, আমাদের লঞ্চের ডিজাইনটা অনেক প্রিমেটিভ এবং পুরনো ধরনের।’

ইঞ্জিনরুম থেকে আগুন ধরা বা ক্যান্টিন থেকে লাগার বিষয় কোনোটির দায় কর্র্তৃপক্ষ এড়াতে পারে কিনা, এ প্রশ্নে জালাল উদ্দিন বলেন, ‘যেহেতু তদন্ত কমিটি হয়েছে দেখতে হবে কারা জড়িত। তারপরও কোনোভাবে দায় এড়ানো যাবে না। আমরাও দায় এড়াতে পারি না। আগে দেখতে হবে কোথায় দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে। আমার অপরাধ থাকলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করব।’  

দেশের অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনাই তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও বলতে গেলে নেওয়া হয় না। কখনো কখনো দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা কিংবা সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দিয়েই ঘটনার ইতি টানা হয়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনগুলোয় ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে যেসব সুপারিশ করা হয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমে যাবে। নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই সরকারপক্ষ এ দায় এড়াতে পারবে না। এটা হত্যাকা-।’

এ দুর্ঘটনায় এরই মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের পক্ষে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো যথারীতি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শুরু করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে কীভাবে আগুন লাগতে পারে, তা নিয়ে কথা বলেছেন লঞ্চটির মালিক ও কর্মীরা। ইঞ্জিনরুমে অগ্নিকাণ্ড থেকে এমন বড় ঘটনা ঘটতে পারে বলে কয়েকজন লঞ্চকর্মী মনে করছেন। লঞ্চটির মালিক বলছেন, গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়েছিল। তবে সে জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি।

লঞ্চটির মালিক হামজালা শেখ বলেন, আগের ইঞ্জিন দুটিতে ত্রুটি থাকায় গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়। ডকইয়ার্ডে উঠিয়ে ৭২০ অশ^ক্ষমতার দুটি ইঞ্জিন লাগানো হয়। এ ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা, তা জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি লঞ্চের মালিক হামজালা শেখ। ফিটনেস সনদ অনুযায়ী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৬৪ মিটার ও গভীরতা ২ দশমিক ৮০ মিটার। বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরে লঞ্চটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০১-২৩৩৯।

মালিকের এই বক্তব্য কতটা সঠিক এবং এভাবে ইঞ্জিন লাগানো ঠিক কিনা, এ প্রশ্নে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশিদ বলেন, ‘লঞ্চের কাঠামোগত পরিবর্তন বা ইঞ্জিন পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। অভিযান-১০ লঞ্চের ইঞ্জিন পরিবর্তনের আগে আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটিকে তীরে ভেড়ানো সম্ভব হলে প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন, ৩০ বছরে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় ৪০০ থেকে ৫০০ তদন্ত কমিটি হয়েছে। অনেকে রিপোর্ট দিয়েছে, অনেকেই দেয়নি। তবে জমা দেওয়া রিপোর্টে সব সময় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেগুলো যদি সঠিক সময়ে ঠিকমতো বাস্তবায়ন হতো, তাহলেও দুর্ঘটনার মাত্রা অনেক কমিয়ে আনা যেত। এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এ জেড এম জালাল উদ্দিন বলেন, গত বছর পর্যন্ত ৪৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি করে দিয়েছে আদালত। তাই মামলা হয় না, বিচার হয় না এমন একপেশে মতামত দেওয়া ঠিক হবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন লঞ্চ মালিক বলেন, বেশিরভাগ লঞ্চে রিকন্ডিশন্ড বা পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এগুলো মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের জেনারেটর ইঞ্জিন। ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে ও তা না সারাতে পারলে প্রচুর তাপমাত্রা উৎপন্ন হয়।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করি না’ তা ঠিক নয়।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট থেকে বরগুনার উদ্দেশে রওনা হয় এমভি অভিযান-১০ নামের লঞ্চটি। রাত আড়াইটার দিকে ঝালকাঠি শহরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সুগন্ধা নদীতে থাকা অবস্থায় তিনতলা লঞ্চটিতে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। দ্রুতই আগুন পুরো লঞ্চে ছড়িয়ে পড়ে। শীতের রাতে লঞ্চের বেশিরভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪০ জন। শতাধিক যাত্রী দগ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হতাহত যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্তগুলো আলোর মুখ দেখে না : বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন ও তা জমা দেওয়ার পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নানাভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। নৌ-দুর্ঘটনাসংক্রান্ত মামলাগুলোয় অভিযুক্ত প্রভাবশালী নৌযান মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের নৌ-আদালতে যথাযথ সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ জন্য দিনের পর দিন আসামিদের মামলায় উপস্থিত না হওয়া এবং তাদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতাও দায়ী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের ৩ মে মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে নোঙর করা একটি বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে স্পিডবোট ডুবে এর ২৬ জন যাত্রী নিহত হন। ৩০ জন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটটি মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে যাচ্ছিল।

গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি ময়ূর-২-এর আঘাতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ ডুবে গেলে ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার দিনই সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। পরে ওই বছরের ৭ জুলাই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি ২০ দফা সুপারিশ করে। এক বছরেও এসব সুপারিশের বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। মামলার এজাহারভুক্ত সব আসামি গ্রেপ্তার হলেও একে একে জামিনে বেরিয়ে গেছেন।

২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি মোস্তফার’ দুর্ঘটনায় ৭০ যাত্রী নিহত হন। তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কয়েকজনকে দায়ী করার পাশাপাশি ২৪টি সুপারিশ করা হয়।

এর আগে ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাওয়ায় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল পিনাকী-৬’ ডুবে যায়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে নদীতে ডুবে যাওয়া আলোচিত লঞ্চটির ধ্বংসাবশেষও মেলেনি অভিযান চালিয়ে। এ সময় ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। ৬০ জন যাত্রীর খোঁজ মেলেনি। এ দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে দায়িত্বে অবহেলাজনিত বিভিন্ন কারণে বিআইডব্লিউটিএর মাওয়া নদীবন্দরের পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া, পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) শফিকুল হক ও যুগ্ম পরিচালক (নৌ-নিট্রা) রফিকুল ইসলামকে দায়ী করা হয়। ত্রুটিপূর্ণ নকশার ভিত্তিতে লঞ্চটিকে নিবন্ধন প্রদান ও বিধি লঙ্ঘন করে সর্বশেষ ফিটনেস (সার্ভে) দেওয়ায় সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের (বর্তমান নৌপরিবহন অধিদপ্তর) সে সময়ের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলাম ও অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর রহমানকেও দায়ী করা হয়। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ভূঁইয়াকে দুর্ঘটনার পরপরই এবং মির্জা সাইফুর রহমানকে পরে সাময়িক বরখাস্ত করে দায় সারা হয়। অবশ্য লঞ্চটির মালিক আবু বকর সিদ্দিক কালু ও তার ছেলে ওমর ফারুক লিমন গ্রেপ্তার হন। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। লঞ্চের মাস্টার মনিরুল মনি ও কাওড়াকান্দি ঘাটের ইজারাদার আব্দুল হাই সিকদারকে দায়ী করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে গতকাল সকাল ১০টার দিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফায়েল হাসানের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের তদন্তদল ঝালকাঠির লঞ্চঘাট এলাকায় উপস্থিত ছিল। সাবেক মন্ত্রীসহ তদন্ত কমিটির সদস্যরা লঞ্চের ইঞ্জিনরুমসহ বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন। এসময় সাবেক মন্ত্রী বলেন, লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। এদের রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা বুঝতে পারব দুর্ঘটনার আসল কারণ। যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযান লঞ্চের আগুন ক্যান্টিন থেকে নয়, ইঞ্জিনের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। এ ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটি, ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটি পরিদর্শন করেছে।

ঢাকা-বরগুনা নৌরুটে বর্তমানে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট রয়েছে। মেসার্স আল আরাফ অ্যান্ড কোম্পানির এমভি অভিযান-১০ ছাড়া বাকি লঞ্চগুলো হচ্ছে মেসার্স খান ট্রেডার্স ও মেসার্স সুরভী পরিবহনের যৌথ মালিকানায় রাজারহাট-বি, পূবালী-১, শাহরুখ-২ ও রাজহংস-৮, এমভি ফারহান-৮। এমভি ফারহান-৮ লঞ্চটির মালিক জাতীয় পার্টির সাংসদ গোলাম কিবরিয়া।