মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকে ২০০৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা ঠিক করতে বিভিন্ন দলের মধ্যে মাসের পর মাস আলোচনা, দরকষাকষি সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর থেকে চলছে নানামুখী জল্পনা। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
আঠারো বছরের যুদ্ধ
বিগত আঠারো বছরে বাদশাহ হারুনুর রশীদ ও তার স্ত্রী জোবেদা খাতুনের বিপুল সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সাজানো বিদ্যাপীঠ ও জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র বাগদাদ জ্বলে-পুড়ে শ্মশানে পরিণত হয়েছে। ১৮ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল ও ডেনমার্ক থেকে আসা আরও অনেক সেনা। যুদ্ধের ভয়াবহতা, বোমা ও মিসাইলের আঘাতে ইরাকের মাটি বিদীর্ণ হওয়ার মর্মন্তুদ ঘটনা সম্পর্কে কমবেশি বিশ্ববাসী অবগত। এতসব হত্যাযজ্ঞ ‘সুচারুরূপে’ সম্পন্ন হওয়ার পর এখন বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক আইনে এই আক্রমণ ছিল অপরাধ।
ইরাক যুদ্ধে নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এক এক সূত্র এক এক রকম তথ্য-উপাত্ত দেয়। তবে ইরাকে যুদ্ধাবস্থার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি এখনো হয়নি। দেশটিতে অবস্থান করছে বিদেশি সেনারা। ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের খোঁজ এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের লক্ষ্যে শুরু হওয়া হামলার ব্যাপকতা কমলেও পরে আবার তা গতি পায়, আইএসের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমাবর্ষণে। বলা হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি ভারী কামানের গোলা ব্যবহার করা হয় আইএসের বিরুদ্ধে ইরাকের মাটিতে। আইএস মারতে গিয়ে সে দেশের শুধু মসুল শহরে চল্লিশ হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যত মানুষ মরেছে, তার চেয়ে বেশি আহত হয়েছে এই দীর্ঘ সময়ে। ইরাক সরকারের তথ্যানুসারে ২০ লাখ ইরাকি বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছে।
আর জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশন ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, লাখ লাখ ইরাকি গৃহহীন ও উদ্বাস্তু হয়েছে। দুই লাখ ইরাকি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য জর্দান ও সিরিয়ায় পাড়ি দিয়েছে। জর্দান শান্ত থাকলেও সিরিয়া গোলযোগপূর্ণ। সে দেশে খাদ্য, পানীয় ও আশ্রয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে পুরুষরা অর্থের জন্য, সোজা কথায় বাঁচার জন্য মারণঘাতী যুদ্ধে যোগদান করছে। মেয়েরা শিবিরে শিবিরে খাবারের জন্য ভিক্ষা করছে। সিরিয়ায় রয়েছে যুদ্ধের হাহাকার, ইরাকে রয়েছে যুদ্ধের বিভীষিকা। যুদ্ধের কারণে হাজার হাজার শিশু যারা শুরুতে জন্ম নিয়েছিল, তারা মূর্খ হিসেবে যুবক বয়সে উপনীত হয়েছে। এখন অস্ত্র হাতে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াটা তাদের পেশা বা নেশা, নয়তো দৈনিক শ্রম বিক্রয় নতুবা ভিক্ষাবৃত্তিই সম্বল। এককালের সভ্য জাতির বিদ্যাপীঠে এখন অশিক্ষিত মানুষের আনাগোনা! যুদ্ধ ইরাকিদের কোথায় নামিয়েছে তা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু আফসোসের কথা হলো, বিশ্ববাসী তা কখনো শুরুতে চায়নি। বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচ, তেল বাজার দখল ও অস্ত্র বিক্রির নতুন ক্রেতার সন্ধানে শুরু হওয়া যুদ্ধের পরিণতিতে ইরাক শ্মশানে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
২০০৩ সাল থেকে ইঙ্গ-মার্কিন সহায়তাপুষ্ট সরকার বাগদাদের ক্ষমতায়। সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে কয়েক দফা ‘পুতুল’ সরকার গঠিত হয়েছে বটে, তবে দেশটিতে এখনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো নানা সময়ে ও বাঁকে দেখা দিয়েছি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা। এরই মধ্যে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্টরা নানা দলে বিভক্ত হয়েছে। একাধিক দল ও উপদল সৃষ্টি হয়েছে।
ইরাকে স্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত অক্টোবর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এখনো সরকার গঠিত হয়নি। ১৬ অক্টোবর দেশটির নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করে। ইরাকের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ভোট পুনঃগণনার আবেদন পাওয়ার পর অক্টোবরের শেষে পুনঃগণনা শুরু করে। অবশেষে ৩০ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কয়েকটি শিয়া গ্রুপ অনিয়মের অভিযোগ আনার পর ভোট পুনঃগণনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। কমিশন বলছে, পরাজিত শিয়ারাই এসব অভিযোগ এনেছে, যা শুরুতে কমিশন প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এসব অভিযোগ প্রামাণ্য নয় বলে বর্ণনা করে। মোট ১৩০০ অভিযোগ দায়ের হয়। ১৮টি অভিযোগের বিষয়ে প্রামাণ্য দলিল পাওয়ার পর ২৭ অক্টোবর ২৩৪টি কেন্দ্রে ভোট পুনঃগণনা শুরু করে কমিশন।
পেছনের কথা
২০১৯ সালের অক্টোবরে ইরাকে জীবনমানের উন্নতি ও কর্মসংস্থানের দাবি এবং দুর্নীতির অভিযোগে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর জেরে আদেল আবদুল মাহদি সরকারের পতন হলেও বিক্ষোভকারীরা তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর অংশ হিসেবে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের প্রায় দুই মাসের মাথায় এ নির্বাচন হয়। আফগানিস্তান ও ইরাক বলতে গেলে এক সূত্রে গাঁথা। ৯/১১ এর জেরে ২০০১ সালে আমেরিকা আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। পতন হয় তালেবান সরকারের। আর ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে হটাতে ইরাকে আগ্রাসন চালায় আমেরিকা। সম্প্রতি তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করে ২০ বছর পর আফগানিস্তান ত্যাগ করে আমেরিকা। ইরাক থেকেও আমেরিকার বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি ওঠে, সে লক্ষ্যে সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এসব বিবেচনায় ইরাকে বা আফগানিস্তানে মার্কিন মদদে গণতন্ত্র কার্যত সোনার পাথরবাটি। একে বলা হয়, আমেরিকার ‘ধামা ধরা গণতন্ত্র।’ আফগানিস্তানে এই রীতির গণতন্ত্রই চলেছে বিগত ২০ বছর। সেই গণতন্ত্রের অবসান হতে দেখেছে বিশ্ব গত আগস্টে তালেবানের পুরো দেশ দখলের মধ্য দিয়ে। তালেবানের কাছে কাবুলের দায়িত্ব দিয়ে আমেরিকা পাততাড়ি গুটিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, যাদের কুড়ি বছর ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল তারা আসলে দেশটির জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। ইরাকের গণতন্ত্রের অবস্থাও অনেকটা সেই রকমই।
নির্বাচনী ফলাফল
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, আগের বিজয়ী দল শিয়া ধর্মীয় নেতা মুকতাদা আল সদরের সদরিস্ট মুভমেন্ট আগের অবস্থান ধরে রেখেছে। আগেকার ফল অনুযায়ী ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আল-সদরের দল একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ ৭৩ আসন পেয়েছিল, এখনো তাই আছে। ইরাকের ৩২৯ আসনের পার্লামেন্টের ৩১১টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আল ফাতাহ অ্যালায়েন্স পরাজয়ের ধারাতেই আছে এবং আগেকার ফলের অনুরূপ ১৭ আসন পেয়েছে। রিকাউন্টিং তাদের কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি। বর্তমান পার্লামেন্টের স্পিকার সুন্নি নেতা মোহাম্মদ আল-হালবুসির তাতাদ্দুম বা প্রগ্রেসিভ পার্টিও আগের ফলের অনুরূপ ৩৭ আসন পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির স্টেট অফ ল’ পার্টি পেয়েছে ৩৩টি আসন, যা গতবারের চেয়ে দুটি কম। এছাড়া কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) ৩১ আসন ও প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অফ কুর্দিস্তান (পিইউকে) ১৮টি আসন পেয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলে ভোটদানের হার ৪১ থেকে বেড়ে ৪৪ শতাংশ হয়েছে।
সরকার গঠনে অনিশ্চয়তা
নির্বাচনী ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে এখন ফাতাহ অ্যালায়েন্সকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা এ ফলাফল মেনে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করবে নাকি ফলাফল আগের মতো প্রত্যাখ্যান করবে। এদিকে আল সদরকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে ব্যর্থতার ঝুঁকি ও একটি শক্তিশালী বিরোধী গ্রুপ তৈরি হবে জেনেও তিনি একটি সংখ্যাগুরু সরকার গঠনের বিষয়ে অন্য দলগুলোকে সম্মত করাতে কাজ করবেন, না বর্তমান অবস্থাকে মেনে নিয়ে একটি কোয়ালিশন মেনে নেবেন।
বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এটা নিশ্চিত যে, ইরাকে একটি নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী পেতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া খুব মসৃণ নয়। কিন্তু তোড়জোড় চলছে নানাজনের মধ্যে। যেমন, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে মুকতাদা আল সদর এক বিরল সফরে নাজাফ থেকে রাজধানীতে এসে মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে ফাতাহ অ্যালায়েন্স প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদির সঙ্গে কথা বলেছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ আল হালবুসি ও ন্যাশনাল উইসডম মুভমেন্ট নেতা আম্মার আল হাকিমের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আবাদির সঙ্গে কথা বলেন। মুকতাদা আল সদর সাধারণত নাজাফ শহরের পশ্চিমে আল-হানানা শহরে তার বাসভবনেই এসব রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা করে থাকেন। সরকার গঠনের ব্যাপারে একটি ভিত্তি রচনা করতেই আল সদর রাজধানীতে এসেছিলেন।
মুকতাদা আল সদর শিয়া মতাদর্শী হলেও শিয়া অন্য দলগুলো তার প্রতিপক্ষ। নানা পক্ষ থেকে শিয়াদের মধ্যে সমঝোতার কথা বলা হলেও তা সঠিক নয়। বরং তাদের দুই পক্ষের মধ্যে একটি নীরব অথচ বিধ্বংসী প্রতিযোগিতা রয়েছে। ভেতরে ভেতরে রয়েছে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বাসনা। এরই মধ্যে আল সদরের দল একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানপন্থি শিয়া দলগুলোর আসন উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে। বলতে গেলে ১০ অক্টোবরের নির্বাচন ছিল ইরানপন্থি দলগুলোর জন্য বিপর্যয়কর। তারা ব্যাপক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এমতাবস্থায় মার্কিন পক্ষ, প্রতিবেশী ইরান এবং উদীয়মান মুসলিম শক্তি তুরস্ক এসব বিষয়ে কোন অবস্থান গ্রহণ করে সেটাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে বৈকি। ইরাকের সরকার গঠনে প্রত্যয়ী রাজনৈতিক দলের নেতাদের এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে নিজ নিজ গ্রুপ, দল, গোষ্ঠী ও সমর্থকদের পক্ষে রেখে সন্তর্পণে এগুতে হচ্ছে।
আরেকটি বিষয়, ইরাকে আগামীতে অন্তরালে লড়াই হবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। কারণ এ প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের কোনোটাই চাইবে না ইরাকে তার প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রিত সরকার থাকুক। সে কারণে সরকার গঠনের লড়াইটা হবে খুবই জোরাল।
কার কত আসন
ইরাকে নির্বাচনী ফল চ্যালেঞ্জ নতুন কিছু নয়, ২০১০, ২০১৪-তেও এমন চিত্র দেখা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফাতাহ গ্রুপ আসন হারালেও সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় এখনো তাদের অনেক কিছু করার রয়েছে। যেমন, সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের জন্য সংরক্ষিত ৫টি আসনের ৪টি লাভ করেছে ব্যাবিলন মুভমেন্ট নামের খ্রিস্টান গ্রুপ। এটি ফাতাহর ঘনিষ্ঠ ও প্রয়োজনের সময় ফাতাহর জন্য বাড়তি সুবিধা আনতে পারে। ইরাকে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৬৫ আসন। সেটা জোগাড় করা কষ্টসাধ্য বলেই এতসব আলোচনা। নির্বাচনে খামিস আল কানজুরের দল আজেম অ্যালায়েন্স, শাসওয়ার আবদুল ওয়াহিদের এনজিএম, আলা আল রাকিবির দল এমতিদাদ ১০টিরও বেশি করে আসন পেয়েছে। এছাড়া ইশারাকেত কানুন, তাসমিন, আকেদ ওয়াতানি, এএনএসএফ, ইয়েকগার্ত ও ছোট আরও ৩টি দল মিলে ৩০টির মতো আসন পেয়েছে এবং নির্দলীয় প্রার্থীরা ৪০টি আসনে জয়ী হয়েছেন।
সাদ্দাম উৎখাত ও ২০০৩ সালে মার্কিন দখলদারি কায়েমের পর গত ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন ছিল ইরাকের ৬ষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন। ভোটার ছিল আড়াই কোটি। ৩২৯ আসনের পার্লামেন্ট হলেও সরাসরি নির্বাচন হয় ৩১১ আসনে। বাকি আসনগুলো সংরক্ষিত। ২০১৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বিভিন্ন দলের আন্দোলনের মুখে নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মুকতাদা সদরের জোটের পরই আসন সংখ্যায় এগিয়ে থাকা (৩৭ আসন) তাকাদ্দুম জোটবদ্ধ হচ্ছে। নুরি আল-মালিকির স্টেট অব ল’ জোট ৩৩ আসনে জিতে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সদরিস্ট মুভমেন্ট, কেডিপি ও তাকাদ্দুম দল মিলে যে জোট সরকার গঠনের চেষ্টা চলছিল, এটা হলে তুরস্কের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
মুকতাদা এ বিষয়ে বলেছিলেন, তিনি ইরাকে নতুন সরকার গঠন করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একত্রে কাজের জন্য প্রস্তুত। ১৬ অক্টোবর এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেন তিনি। তিনি আশা করছেন, নতুন পার্লামেন্টে নির্বাচিত ২৬৫ জনই নতুন, তারা গণতন্ত্রে একটা পরিবর্তন আনতে কাজ করবেন।
মুকতাদা আল সদর
ইরাকের জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মনে করা হচ্ছে, নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা থাকবে। কেউ কেউ বলছেন, তিনি কিংমেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
২০০৩ সালে মার্কিনিদের ইরাক দখলের পর আলোচনায় আসা আল সদর এক সময়ে ইরাকের রাজনীতিতে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যান। ২০১৮ সালের দিকে তিনি ফিরে আসেন স্বরূপে। বলা হয়, ইরাকি জনগণের অসন্তোষকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে মুকতাদার মতো দক্ষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা দেশটিতে আর নেই বললেই চলে। তিনি একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানবিরোধী। ইরাকে এই দুই দেশের আধিপত্য ও প্রভাব মেনে নিতে তিনি কখনোই প্রস্তুত নন। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় মুকতাদা তার অনুগত লোকজনকে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। আবার সম্প্রতি তিনি ইরাকে দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। ২০১৬ সালের সমর্থকরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুর করেছে সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে। ইরাকে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোটাররা তাই মুকতাদা সদরের মনোনীত প্রার্থীদেরও তুলনামূলক বেশি ভোট দিয়েছে। এর ফলে মুকতাদা নির্বাচনে আশাতীত সাফল্য পেয়েছেন।
২০০৩ সালের পর দেশটিতে হওয়া পঞ্চম সংসদীয় ভোট নিয়ে সাধারণ ইরাকিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহও দেখা গেছে। এই নির্বাচনে ১৬৭টি দল ও তিন হাজার ২শ’র বেশি প্রার্থী লড়েছেন। এবারের নির্বাচন দেশটিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরীক্ষা হিসেবে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ফলাফল নিয়ে জটিলতা ও সরকার গঠনে বিলম্ব হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভোট ইরাক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আনবে না। ইরাকে এখনো শান্তি সুদূর পরাহত বিষয়। তারপরও অনেকেই আশাবাদী। যে আশা থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন বিপুলসংখ্যক প্রার্থী। তার ওয়াদা করেছেন ইরাকে শান্তি প্রতিষ্ঠার। শান্তির অন্বেষায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগও করেছেন। ইরাকিদের সেই আশা কতটা আলোর মুখ দেখে তা সময়ই বলে দেবে।