পাঁচ মাসে আমদানি ঋণপত্র বেড়েছে ৫৪%

করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমার পর পণ্য আমদানিতে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মাত্র প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৯২ লাখ (৩৫ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। রেকর্ড পরিমাণ এলসি খোলার প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুনরুদ্ধার হিসেবে বিবেচিত হলেও করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’ তাতে ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

সবশেষ নভেম্বর মাসে ৮১০ কোটি ৭০ লাখ (৮ দশমিক ১০ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক মাসে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে এত বিপুল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা ব্যয় হয়নি। এর আগে গত অক্টোবর মাসে ৭৪২ কোটি ১৬ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। নভেম্বরের আগে এটিও একক মাস হিসেবে ছিল সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের এই পাঁচ মাসে গড়ে ৭ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে দেশে। আর এলসি খোলার এই হিড়িকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভেও টান পড়েছে।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে ২৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই পাঁচ মাসে দেশে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয় ২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্য আমদানির জন্য ৬ হাজার ৭০৪ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খুলেছিলেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে শুরু করায় সেসব দেশের মানুষ আগের মতো পণ্য কেনা শুরু করেছিল। দেশের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে আসায় অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বাড়তে শুরু করে। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সব ধরনের পণ্যের চাহিদার বিষয়টি মাথায় রেখেই দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানি বাড়িয়ে দেন। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ অন্য সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এলসি খুলতে বেশি অর্থ খরচ হয়েছে বলে জানান তারা।

মূলত চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে তৈরি পোশাক শিল্পের সুতা, কাপড়সহ অন্যান্য পণ্য আমদানিতে সবচেয়ে বেশি এলসি খোলা হয়েছে। এছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য, সার, জ¦ালানি তেল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের এলসি খোলা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের কারণে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ কমতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবার এলসি খোলার সর্বশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে জুলাই-নভেম্বর সময়ে এলসি খুলতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়েছে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল কাপড় ও অন্য পণ্য আমদানিতে, যা ছিল ৫০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ৪৬ শতাংশ বেশি। সুতা আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ২০৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫১ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। তুলা, সিনথেটিক ফাইবার আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ১৪৬ কোটি ১৭ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি।

রাসায়নিক দ্রব্য ও সার আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ২১২ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৫ শতাংশ। এছাড়া ওষুধের কাঁচামালের এলসি খোলা হয়েছে ৪৮ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের; প্রবৃদ্ধি ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ২৩৬  কোটি ৩৬ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার; যেখানে প্রবৃদ্ধি ৫২ শতাংশ। অন্যান্য শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৯৪৯ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া জ্বালানি তেল আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ১৭০ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ে চেয়ে ১১৪ শতাংশ বেশি। খাদ্যপণ্যের মধ্যে চাল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৩২ কোটি ৫ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ হাজার ৭৭৯ শতাংশ বেশি। গম আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৯৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। চিনি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। ভোজ্যতেল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৭১ কোটি ডলারের, যা বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।