ইউপি নির্বাচনে হত্যার হুমকি

দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রথম থেকে চতুর্থ ধাপে মোট ২ হাজার ৯৮৫টি ইউপির অনানুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে ইসি। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৭৪টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা এবং ১ হাজার ২৫১টি ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বলে দলীয় সূত্রগুলি বলছে। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, চার দফার নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতর সংখ্যাও রেকর্ড গড়েছে। পঞ্চম ধাপে আরও ৭০৭টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। বিনা ভোটে নির্বাচিত এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিগত চার ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় এ পর্যন্ত দেশজুড়ে সংঘাতে ৭০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সহিংসতা থামাতে না পারার জন্য যেমন নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা হচ্ছে তেমনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্য হুমকি-ধমকি নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু এত সহিংসতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অনুসারীদের হুমকি থামছে না।

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘১০টা মার্ডার করা লাগলে করবেন, আমি বাকিটা দেখব’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সহিংসতার হুমকির সবশেষ দৃষ্টান্ত। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, কুমিল্লার চান্দিনায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৩ নম্বর জোয়াগ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুল আউয়ালের উঠান বৈঠকে কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্যে প্রয়োজনে দশটা হত্যার হুমকি দিয়েছেন তার ছেলে মিজানুর রহমান খান। গত বৃহস্পতিবার তার এ বক্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তুমুল সমালোচনা হয়। ভিডিওতে দেখা যায় মিজানুর বলছেন, ‘মাইর খেয়ে আসা যাবে না, মাইর দিয়ে আসতে হবে। তার জন্য যদি ১০টা মার্ডারও করা লাগে তাই করবেন। আমি বাকিটা দেখব ইনশাআল্লাহ।’ মিজান এ বক্তব্য দেওয়ার সময় সেখানে তার বাবা আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুল আউয়ালও উপস্থিত ছিলেন। উসকানিমূলক ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মিজান হুমকি দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না জোয়াগ ইউনিয়নসহ চান্দিনার মানুষ। ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওর কমেন্টে ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়ে মিজানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অনেকেই।

এই ধরনের হুমকি এই দফাতেই প্রথম নয়। কিছুদিন আগে নাটোর সদর উপজেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় ‘নৌকা প্রতীকের ভোটার ছাড়া অন্য ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হবে না বলে’ এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমের বরাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়েছিল। এই প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মাসুদুর রহমান মাসুদ। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, বিরোধী দলের অংশগ্রহণহীন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কেন এমন হুমকি দিতে হচ্ছে? যেখানে দেখাই যাচ্ছে যে,  নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে মূলত আওয়ামী লীগের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারীদের মধ্যেই। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবের চেয়ে স্থানীয়ভাবে সমাজের প্রভাবশালীরাই এসব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন একদিকে যেমন দলীয় প্রতীকে মনোনয়ন চলছে তেমনি আরেকদিকে এই নির্বাচন হয়ে পড়েছে বিরোধী দলের অংশগ্রহণহীন। অন্যদিকে, তৃণমূলের নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে কোন মাত্রায় পৌঁছেছে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাধিক্যই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। এমনকি বেশ কিছু জায়গায় কাউকেই মনোনয়ন না দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উন্মুক্ত রাখতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে।

উপরোক্ত পরিস্থিতি একদিকে যেমন টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার পরিচায়ক তেমনি তা তৃণমূলের রাজনীতি এবং দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির জন্যও বড় ধরনের অশনি সংকেত। কেননা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন বেপরোয়া সহিংসতা পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশ্ন হলো দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কি একচেটিয়া ভোটের পরিস্থিতিতেও এমন নির্বাচনী সহিংসতা থামানোর চেষ্টা করছে কিংবা এ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে? নেতাদের বক্তব্যে কিন্তু সেটা মনে হচ্ছে না। অথচ, ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রায় এককেন্দ্রিক শাসনকাঠামোয় কিছুটা হলেও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করত। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ক্ষমতাসীন দলের একটি বর্ধিত সংস্করণে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা যেমন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব তেমনি তা দেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব। সরকার এ বিষয়ে নীরব থাকতে পারে না।