মানুষের কথা ও ব্যবহার

মানুষের চেহারা যেমনই হোক, তার মনের রং প্রকাশ পায় কথায়। তাই জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন হয় সত্য ও সুন্দর। কেননা, ইসলাম সত্য ও সুন্দরের কথা বলে। কিন্তু, মানুষের অন্তর অপকর্ম ও প্রাচুর্যের দম্ভে হারিয়েছে সত্য ও সুন্দর বাক্য ব্যয়। অহংকারের বশীভূত হয়ে, মানুষের সঙ্গে তিক্ত ও উপহাসপূর্ণ বাক্য বিনিময় করে। ইসলাম মানুষের সঙ্গে নম্র ও মধুর বাক্য বিনিময়ের শিক্ষা দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ইমানের পর মন্দ নাম কতই-না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না, তারাই তো জালেম।’ -সুরা হুজরাত : ১১

আল্লাহতায়ালা জিহ্বা দিয়েছেন তার দ্বীনের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, সত্য ও সুন্দর কথা প্রচার করে মানুষদের ইসলামের পতাকাতলে শামিল করতে। কিন্তু নিজেকে কি কখনো প্রশ্ন করেছি? কী বলার কথা কী বলছি! নাকি ভুল তথ্য ও কথা মানুষের কাছে বলে নিজের ইহকাল ও পরকাল ধ্বংস করছি?

ইসলামের শিক্ষা হলো, মিথ্যা, গুজব ও মানুষের অন্তরে চিড় ধরে কিংবা আত্মসম্মানে আঘাত করে এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকা। এমন কিছু মানুষ আছে, যারা কোনো কিছু না বুঝে হুজুগে নানা গুজব প্রচার করে, আবার অনেকেই সেই কথার ওপর ভরসা করে কাজ করতে শুরু করে। কথা সত্য কিংবা মিথ্যা যাচাই-বাছাই করার ধৈর্য ও সময় কোনোটি নেই। এমন অভ্যাস নিন্দনীয়। হজরত সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ সাকাফি (রা.) বলেন, একবার আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার জন্য যে জিনিসগুলো ভয়ের কারণ বলে আপনি মনে করেন, তার মধ্যে সর্বাধিক ভয়ংকর কোনটি? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের জিহ্বা ধরলেন এবং বললেন, ‘এটা (জিহ্বা)।’ -জামে তিরমিজি : ২৫৬৬

ইসলামের সৌন্দর্য হলো- স্বচ্ছতা, সততা ও অল্পভাষী হওয়া। কিন্তু বর্তমান সময়ে মিথ্যা কথা মুহূর্তে তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের ফলে ছড়িয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণে মানুষের অন্তর প্রকম্পিত হয়, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধা সৃষ্টি করে। যার মধ্যে দিয়ে একটি বিশেষ মহল তাদের অপকর্মের উদ্দেশ্য হাসিল করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত কোরো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন কোরো না।’ -সুরা বাকারা : ৪২

গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালে দুর্ঘটনার মুখে পতিত হয়। জিহ্বা অনিয়ন্ত্রিত হলে অন্তর পাপের রাজ্যে পরিণত হয়। অপকর্ম উৎপাদনের কারখানা হলো- জিহ্বা। কারখানার পণ্য হলো- গিবত, পরনিন্দা, চোগলখোরি, ঝগড়া, অশ্লীল বাক্যব্যয়, ব্যঙ্গ করা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা, অহেতুক কথা বলা, হারাম জিনিসের স্বাদ গ্রহণ করা, মিথ্যা বলা, অনর্থক আশ্বাস ও প্রশংসায় ভাসানো, গাল-মন্দ করা, নারীর রূপরস নিয়ে আলোচনা করে সুখ অনুভব করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, গোপনীয় কথা ফাঁস করা। সাহাল ইবনে সায়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই উরুর মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান) হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।’ -সহিহ বোখারি : ৬৪৭৪

প্রত্যেক মুমিনের উচিত জিহ্বা যেন লাগামহীন না হয় সে বিষয়ে লক্ষ রাখা। কারণ কেয়ামতের দিন প্রত্যেকটি অঙ্গ তার কৃতকর্মের চেহারা বর্ণনা করবে। ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে আনতে সব সময় অন্তরে আল্লাহর ভয় রাখতে হবে, বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়া, অহেতুক কথা বলা পরিহার করা, ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, আল্লাহর কাছে দোয়া করা, জাহান্নামে আগুন ও জান্নাতের কথা স্মরণ করা। হুজুর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ইমান রাখে সে সর্বদা শুধু ভালো কথা বলবে, নয়তো চুপ থাকবে। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

‘তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং মন্দ উপনামে ডেকো না’