দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর তারেক

সম্প্রতি খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অব্যাহতি দিয়েছে বিএনপি। কাছাকাছি সময়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মনিরুল হক সাক্কুকেও সরানো হয় দলের পদ থেকে। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। এদের মধ্যে সাক্কুকে বহিষ্কারের পর কুমিল্লায় বিএনপির রাজনীতিতে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব না পড়লেও মঞ্জুকে অব্যাহতির ঘটনায় খুলনা বিএনপিতে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। ইতিমধ্যে খুলনা মহানগর ও পাঁচ থানার সাত শতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন। সারা দেশে নতুন উদ্যমে মাঠে নামার প্রাক্কালে বিভাগীয় পর্যায়ের এই অস্থিরতার প্রভাব জাতীয় পর্যায়েও পড়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। তবে দলটির খুলনা মহানগর ও কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, বিএনপির কাছে সব সময় দল বড়, ব্যক্তি কোনো ফ্যাক্টর নয়। তাই কারও পদত্যাগে দলের কর্মসূচিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।

খুলনার নেতাদের পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির সেøাগান হচ্ছে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখানে ব্যক্তি কোনো ফ্যাক্টর নয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান প্রাধান্য দিচ্ছেন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায়। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সে যত বড় নেতাই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

দলের পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ছাত্রদলের কমিটি গঠনে বয়সসীমা তুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনরত ১২ নেতাকে তাদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের দলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও নেই বললেই চলে।

এ ছাড়া গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় সাক্কুকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও সাক্কু যোগ দেননি। যোগ না দেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে সে সময় তাকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠির জবাবে সাক্কুর উত্তর ছিল সেদিন তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক ছিল। এতে দলের হাইকমান্ড সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তা কার্যকর করা হয় গত ১৪ ডিসেম্বর।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনেক উদার। অপরাধ করলেও তিনি মাফ করে দিতেন। তবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ততটা উদার নন। যেকোনো মূল্যে তিনি দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান। তিনি মনে করেন, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। নেতাকর্মীদের সেই বার্তা দিতেই শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

তবে মঞ্জুকে অব্যাহতির ঘটনায় খুলনার মহানগর ও তৃণমূলে উল্টো বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। খুলনা বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নয়া মেরুকরণ। খুলনা বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা, চলছে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ। দলত্যাগের হিড়িকে উদ্যম হারাচ্ছেন নেতারা। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে অনেকে পিছিয়ে আসছেন। এক কথায় গত কয়েক দিনেই অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ছে খুলনা বিএনপির রাজনীতি।

দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জানান, আকস্মিকভাবে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে যে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে দলের দুর্দিনের কাণ্ডারি খ্যাত সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ও কেসিসির সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে রাখা হয়নি।  

এর কারণ হিসেবে তারা বলেন,  চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বরে মহানগর বিএনপির সহসভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্তজার নেতৃত্বে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রতিপক্ষ গ্রুপ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে দেখা করেন। এরপরই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার। গত ৯ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির কমিটি ভেঙে দিয়ে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। তাতে জানানো হয়, অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনাকে আহ্বায়ক, তরিকুল ইসলাম জহিরকে ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ও মো. শফিকুল আলম তুহিনকে সদস্য সচিব করে খুলনা মহানগর বিএনপির আংশিক আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদিত হয়েছে।

এই ঘটনার পরই মঞ্জুর সমর্থকরা প্রতিবাদ স্বরূপ বিএনপি ছাড়তে শুরু করেন। নগর কমিটির বিদায়ী কোষাধ্যক্ষ ও খালিশপুর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক এসএম আরিফুর রহমান মিঠু বলেন, বিএনপির কতিপয় নীতিনির্ধারক খুলনার ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করেছে। তারই প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেছেন।

মহানগরীর ২২নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদ কামাল টিটো বলেন, দল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মাধ্যমে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অসম্মান করা হয়েছে। তারই প্রতিবাদে আমরা পদত্যাগ করেছি।

সার্বিক বিষয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুলনা বিএনপির একটি গ্রুপের চক্রান্তে কোনো আলোচনা ছাড়াই আকস্মিকভাবে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ গ্রুপটি সত্য গোপন করেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অন্ধকারে রেখেছে।’

মঞ্জু বলেন, ‘এই কথাগুলোই গত ১৪ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি, কোনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি, দলের নেতৃত্বের প্রতি কোনো অবজ্ঞা ছিল না। শুধু নতুন কমিটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি করা হয়েছিল।’

মঞ্জুর ভাষ্য, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে তিন মাস আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে ২৯ পাতার একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে অঞ্চলটির দলের পুনর্গঠনে যে অনিয়ম হয়েছে, স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে তার প্রতিকার চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদনের কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। উল্টো দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যা বিএনপির প্রকৃত কর্মী-সমর্থকদের আঘাত দিয়েছে। তারা পদত্যাগ করছেন। 

তবে খুলনা মহানগর বিএনপির সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘রাজনীতি ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি রাজনীতি না করতে না চায়, সেটা তার অনুভূতির ব্যাপার। কেউ পদত্যাগপত্র দিলে আমরা গ্রহণ করব না এমন কোনো কারণ নেই। ১৪ বছর খুলনায় বিএনপির সম্মেলন নেই। আমরা সম্মেলন করার দায়িত্ব পেয়েছি। সুষ্ঠু একটি সম্মেলন দিয়ে আমরা বিদায় নিতে চাই।’

নেতাকর্মীদের পদত্যাগ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এতে দলের কিংবা সামনের আন্দোলন-সংগ্রামে কোনো প্রভাব পড়বে না।’