মানব পাচারকারীদের টার্গেটে বেকার যুবক

মানব পাচারকারীদের নিশানায় পরিণত হয়েছে বেকার শিক্ষিত যুবকরা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে পাচারকারী চক্র। রীতিমতো এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে তাদের। পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে শুধু টাকা খোয়ানোই নয়, কারও কারও জীবনে নেমে আসছে করুণ পরিণতি।

ভারতের পাসপোর্টে ও ভিসার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে যাচ্ছে অনেককে। সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। র‌্যাবের অভিযান ও তদন্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মানব পাচারের ঘটনায় ৩৮৮টি অভিযান পরিচালনা করেছে সংস্থাটি। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ জন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ৬৮ জন ভুক্তভোগীকে। আর শুধু গত এক বছরে সারা দেশে ৯৪টি অভিযান চালিয়ে ৪৩৪ মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩৯ জন ভুক্তভোগীকে। তাদের একটি বড় অংশই শিক্ষিত বেকার যুবক।

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১০ জুলাই মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও ঢাকা থেকে মানব পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রের বাংলাদেশি এজেন্ট ‘রুবেল সিন্ডিকেট’-এর প্রধান সমন্বয়ক ‘ইউরো আশিক’সহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা ইউরোপে মানবপাচার করে আসছিল। এরপর ১৬ আগস্ট রাজধানীর পল্লবী এবং মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আলোচিত মা-মেয়ে পাচারকারী চক্রের প্রধান কাল্লু ও সোহাগসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরা এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা লিটন ওরফে ডা. লিটন ও আজাদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ৩০ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও এবং চুয়াডাঙ্গা থেকে বিদেশে পাচার হতে যাওয়া ২৩ জন নারী ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানে দুটি পাচার চক্রের হোতাসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ভুক্তভোগীদের একজন লালমনিরহাট সদর থানার জসিম উদ্দিন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন তিনি। গত শনিবার জসিমের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানান, ২০২০ সালের শেষের দিকে ফেইসবুকের একটি গ্রুপে স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশ পাঠানোর বিজ্ঞাপন দেখে ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জসিম। কানাডা যাওয়ার আগ্রহের কথা জানান তাদের। পরে তাকে রাজধানীর উত্তরার এইচ এম প্লাজার ১৫ তলার অফিসে যেতে বলা হয়। সেখানে গেলে তাকে বোঝানো হয় বাংলাদেশ থেকে কানাডা যাওয়া কঠিন। প্রথমে ভারত যেতে হবে। সেখান থেকে ভারতীয় পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে কানাডা পাঠানো হবে। এজন্য লাগবে মোট ১২ লাখ টাকা।

জসিম আরও জানান, ভারত যাওয়ার আগে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া জন্য বলা হয় তাকে। আর সেখানে যাওয়ার পর দিতে হবে অবশিষ্ট টাকা। তাদের কথায় বিশ্বাস করে ৫০ হাজার টাকা দেন তিনি। কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন এরা একটি প্রতারক চক্র। পরে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেন জসিম। তার আরেক বন্ধুও প্রতারক চক্রটির ফাঁদে পড়ে টাকা খুইয়েছেন বলে তিনি জানান।

আরেক ভুক্তভোগী রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মঈন হোসেন। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি) পড়ার সময় মানব পাচার চক্রের ফাঁদে পড়েন। মঈন হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লন্ডনে পড়ালেখার স্বপ্ন ছিল আমার। ২০১৯ সালে বিইউবিটি তে পড়ার সময় ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে এক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রথম পর্যায়ে পাসপোর্ট করার কথা বলে বেশ কিছ টাকা নেয় তারা। পরে তাদের কাজকর্ম সন্দেহজনক হলে আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিই। তারা আমাকে ম্যানেজ করতে ইউনিভার্সিটি ও বাসা পর্যন্ত এসেছে। কিন্তু আমি রাজি হইনি।’

একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর পল্লবী ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। গ্রেপ্তাররা হলেন মল্লিক রেজাউল হক ওরফে সেলিম (৬২), মো. বুলবুল আহমেদ মল্লিক (৫৫) ও নিরঞ্জন পাল (৫১)।

এ ঘটনায় রূপনগর থানায় মো. জাহাঙ্গীর গাজী নামের এক ভুক্তভোগীর করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর রূপনগর থানাধীন ৬ নম্বর সেকশনের ৯ নম্বর রোডের সি ব্লকের ৫ নম্বর বাসায় জাহাঙ্গীর গাজীর সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে মল্লিক রেজাউল হকের কথা হয়। ৩২ লাখ টাকায় জাহাঙ্গীরকে অস্ট্রেলিয়া ও তার ভাগিনা মো. আকাশ মাতব্বরকে স্টুডেন্ট ভিসায় নেদারল্যান্ডসে পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। এর মধ্যে সাড়ে ২৩ লাখ টাকা দিয়েছেন জাহাঙ্গীর ও তার ভাগিনা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে দুজনকে ভারতে নিয়ে টর্চার সেলে আটকে আরও টাকা দাবি করে মল্লিক ও তার লোকজন। এর মধ্যে জাহাঙ্গীর কৌশলে পালিয়ে দেশে চলে এলেও তার ভাগিনা আকাশ এখনো চক্রের হাতে ভারতে বন্দি।

জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক আত্মীয়ের মাধ্যমে এই চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছি। আমার ভাগিনা আকাশ মাতুব্বর শরিয়তপুরে একটি কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। আকাশের সঙ্গে গত ৬ মাস কোনো যোগাযোগ নেই আমাদের। র‌্যাব ও পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছি। আসামি গ্রেপ্তারও হয়েছে। কিন্তু এখনো আমার ভাগিনাকে ফেরত আনা যায়নি।’

র‌্যাব অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, এ চক্রটি অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয়। পরে ভারতে নিয়ে দিল্লি ও কলকাতার টর্চার সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। চক্রের সদস্য ভারতের নাগরিক রাজিব খান ও মানিক কলকাতায় এবং রবিন সিং দিল্লিতে টর্চার সেলে ভুক্তভোগীদের আটক রাখে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতারণামূলক ফাঁদে ফেলে উচ্চ বেতনে লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারে জড়িত রয়েছে কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’ তিনি বলেন, যারা অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন, তাদের এই যাত্রাপথ নিরাপদ হচ্ছে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বনে-জঙ্গলে, অর্ধাহারে-অনাহারে কিংবা মানবপাচারকারী চক্রের কাছে জিম্মি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করে তারা। এদের অনেকেই নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ে।